শিক্ষাঙ্গনে সংঘাত

বৈরী ছায়া সরুক, সহাবস্থান নিশ্চিত হোক

২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ক্যাম্পাসে প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্র সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনায় আমরা নিরুদ্বিগ্ন থাকতে পারি না। তাতে শুধু শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমেই প্রতিকূলতার ছায়া পড়েনি, বিদ্যমান পরিস্থিতি আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে অতীতের প্রেক্ষাপটও। ৫ আগস্ট দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে ৪ আগস্ট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ চার ক্যাম্পাসে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে দুপক্ষের অন্তত শতাধিক নেতাকর্মী আহত হন। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার সময়ও হামলা এবং পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের আরও বার্তা মিলেছে সংবাদমাধ্যমে। ৩ আগস্ট বেগম রোকেয়া বিশ^বিদ্যালয় শাখা শিবিরের জুলাই প্রদর্শনী অনুষ্ঠান থেকে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের শুরু হয়, এও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেরই ভাষ্য।

আমরা লক্ষ্য করছি, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কলেজ পর্যায় পর্যন্ত ক্রমেই বৈরী ছায়ার পরিসর বিস্তৃত হচ্ছে, শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক রেষারেষি বাড়ছে। একটি বিশ^বিদ্যালয়ের ছাত্রদলের এক নেতা বলেছেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে রাজনীতির চেষ্টা করলেও বিভিন্ন ক্যাম্পাসে একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হল দখল শুরু করেছে।’ অন্যদিকে রাজধানীর বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসা চত্বরে হলের সিট নিয়ে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষে রক্ত ঝরেছে। আলিয়া মাদ্রাসা ছাত্রশিবিরের সভাপতি অভিযোগ করেছেন, ‘ওই দিন দুপুরে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা হলে ঢুকে শিবিরের নেতাকর্মীদের মারধর করে হলের বেশ কয়েকটি রুমে তালা দেয়। এরপর তারা ছাত্রদল নেতাকর্মীদের ধাওয়া দিয়ে হল থেকে বের করে দেন। পরে ছাত্রদল আবার দলবল নিয়ে এলে শিবিরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়।’ অন্যান্য শিক্ষাঙ্গনের উভয় পক্ষের নেতাদের বক্তব্যও এমনই পরস্পরবিরোধী।

আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, খণ্ড খণ্ড সংঘাত-সংঘর্ষ থেকেই বড় ধরনের অনভিপ্রেত ঘটনা ঘটে। এমতাবস্থায় আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই, অস্থিতিশীলতা নিরসনে হস্তক্ষেপ করুন। আমরা চাই, শিক্ষাঙ্গনে সুস্থধারার রাজনীতির আলো ছড়াক, শিক্ষার পরিবেশ থাকুক প্রশ্নমুক্ত। শিক্ষাঙ্গনে সাম্প্রতিক রক্তক্ষয়ী সংঘাত, আধিপত্য বিস্তারের অশুভ প্রতিযোগিতা শুভবোধসম্পন্ন সবাইকে উদ্বিগ্ন করেছে। আমাদের অভিজ্ঞতায় আছে, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্র সংগঠনের মধ্যে সংঘর্ষ, অস্ত্রের ব্যবহার এবং অস্থিরতা শিক্ষার পরিবেশ কীভাবে বিপন্ন করে তুলেছিল। আমরা কোনোভাবেই চাই না এর পুনরাবৃত্তি ঘটুক। আমরা মনে করি, রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিনির্ধারকরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেবেন এবং ছাত্রসংগঠনের নেতারা শিক্ষাঙ্গনে স্থিতিশীল পরিবেশ নিশ্চিত করতে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেবেন। শিক্ষাঙ্গনে সহাবস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের সহনশীল ও গণতান্ত্রিক আচরণের অনুশীলনে মনোযোগ বাড়াতে হবে। সার্বিক স্বার্থ ও প্রয়োজনে লেজুড়বৃত্তিক বা জবরদস্তিমূলক রাজনীতির পরিবর্তে শিক্ষাঙ্গনে সুস্থ ধারার ছাত্রকল্যাণমুখী কর্মকাণ্ডের ভূমি উর্বর করতে হবে। ক্ষমতার পটপরিবর্তনে দেশের শিক্ষাঙ্গনে আধিপত্য বিস্তারের অশুভ প্রতিযোগিতা শুরু হয়, এও আমাদের তিক্ত অভিজ্ঞতার অনুষঙ্গ হয়ে আছে। বিশেষত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানপ্রধানকে জোরপূর্বক পদত্যাগ করার অঘটনগুলো শিক্ষাঙ্গনের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখা গেছে এবং এর বিরূপ প্রভাব দেখা গেছে। শিক্ষাঙ্গনে এক সংগঠন অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টার বিপরীতে অন্য সংগঠনের অবস্থান পোক্ত করার চেষ্টার ফলে বিগত সময়ের দখলদারত্বের রাজনীতির প্রত্যাবর্তনের শঙ্কাই ফিরে ফিরে জাগিয়ে তুলেছে এবং এর পরিণাম কোনো কোনো ক্ষেত্রে খুব মর্মস্পর্শী। মনে রাখা বাঞ্ছনীয়, অতীতে দখলদারত্বের রাজনীতি শুধু সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনই বিষিয়ে তোলেনি, বহু সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীর জীবনও কেড়ে নিয়েছে।

আমরা প্রত্যাশা করি, শিক্ষাঙ্গন থেকে বৈরিতার ছায়া সরাতে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল সবাই যথাযথ ভূমিকা পালন করবেন। আমরা আরও চাই, রাজনৈতিক স্বার্থে শিক্ষাঙ্গন দখলে রাখার হীন মানসিকতা পরিত্যাজ্য হোক, সব সংগঠনের শান্তিপূর্ণ তৎপরতার পরিবেশ গড়ে উঠুক। সব ছাত্র সংগঠন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বিশেষত শিক্ষাজীবন ব্যাহতকারী রাজনীতি পরিহারের অঙ্গীকার করেছিল। এর যেন ব্যত্যয় না ঘটে। ছাত্ররাজনীতির নামে অপরাজনীতির পথ যেন আর উন্মুক্ত না হয় এবং আত্মঘাতী-ভ্রাতৃঘাতী অনভিপ্রেত কিছু যাতে না ঘটে, তা নিশ্চিত করার দায় সব পক্ষেরই।