ফের পারমাণবিক অস্ত্র-বোমার আতঙ্ক

আজ ৬ আগস্ট। হিরোশিমা দিবস। হিরোশিমা জাপানের অন্যতম বড় নগর ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। বাণিজ্য ও সংস্কৃতিচর্চার ঐতিহ্যবাহী নগর। কিন্তু বিশ্বে এর পরিচিতি যুদ্ধ ও আগ্রাসনের নির্মম ও নির্দোষ শিকার হিসেবে। ৮ দশক পূর্বে তথা ১৯৪৫ সালের এই দিনে স্থানীয় সময় সকাল সোয়া ৮টায় হিরোশিমা নগরের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ‘লিটল বয়’ সাংকেতিক নামের পারমাণবিক বোমা ফেলে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার পূর্বেই মারা যান হাজার হাজার নিরীহ লোক। ১৯৪৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মারা যান ১ লাখ ৪০ হাজার লোক। এর তিন দিন পর ৯ আগস্ট বেলা ১১টা ২ মিনিটে হিরোশিমা থেকে ৪২১ কিলোমিটার দূরে নাগাসাকি শহরে ‘ফ্যাট ম্যান’ সাংকেতিক নামে আরও একটি পারমাণবিক বোমা ফেলে একই শক্তি। এতে ৭৪ হাজার লোক মারা যান। আর এ দুই শহরের পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় মারা যান আরও ২ লাখ ১৪ হাজার লোক। বিকিরণে সৃষ্ট বিভিন্ন রোগে হিরোশিমায় ২ লাখ ৩৭ হাজার ও নাগাসাকিতে ১ লাখ ৩৫ হাজার লোকের মৃত্যু ঘটে। দুই লাখ মানুষ চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে যান। ৬ লাখ ৫০ হাজার মানুষ হন বিস্ফোরণ আক্রান্ত। এদের জাপানি ভাষায় বলে হিবাকুসা, যারা দীর্ঘমেয়াদি অনেক শারীরিক জটিলতা নিয়ে বেঁচে ছিলেন। বিকিরণের দরুন এদের পরবর্তী বংশধররাও বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। যদিও দুটি শহরের ওপর আঘাত হানা হয়; কিন্তু বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম পারমাণবিক বোমা ফেলার ন্যক্কারজনক ও ঘৃণ্য ঘটনার স্মরণে ‘হিরোশিমা দিবস’ সারা বিশ্বে পালন করা হয়। যে দেশ এ ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটায় সে দেশের যুদ্ধবাজবিরোধী লোকজনও দিবসটি পালন করেন।

একজন পরিবেশ গবেষক ও উন্নয়ন অধ্যয়নের ছাত্র হিসেবে এসব সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রাণঘাতীর বাইরে পরিবেশ ও প্রতিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির ওপর কিছুটা আলোকপাত করছি। বিস্ফোরণের আগুনের লেলিহান শিখা ও তীব্র তাপে গাছগাছরা ও প্রাণিকুলের কিছুই অবশিষ্ট থাকেনি; নিমিষেই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। বিস্ফোরণের সময় ও এর অব্যবহিত পর তাপমাত্রা ছিল ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস। লোহার গলনাঙ্ক হলো দেড় হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি। ফলে হিরোশিমার শতকরা ৯২ ভাগ ভবন মাটির সঙ্গে মিশে যায়। বিস্ফোরণস্থলের দুই কিলোমিটার এলাকা পুরোপুরি ধ্বংস ও ৬০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত কম্পন হয়। তেজস্ক্রিয়তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে বায়ুমণ্ডলকে বিষাক্ত করে তোলে। সেই বায়ুদূষণ দীর্ঘকাল সক্রিয় থাকে। তেজস্ক্রিয়তার কারণে হিরোশিমার মাটি এবং ভূগর্ভস্থ পানি দীর্ঘকাল ধরে মারাত্মকভাবে বিষাক্ত হয়ে পড়েছিল। প্রাণী ও অণুজীব ধ্বংস হয়ে যায়। ছাইসহ বিভিন্ন বিষাক্ত পদার্থে মাটি ঢেকে যায়। ছাই ভস্ম ও বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থে পানি দূষণ মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে।

কৃষি ও মৎস্য খাত পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। ভেঙে পড়ে পুরো খাদ্য শৃঙ্খল তথা বাস্তুতন্ত্র বা ইকোসিস্টেম। তেজস্ক্রিয়তায় উদ্ভিদ ও প্রাণীকূলের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের দরুন এদের জিনগত পরিবর্তন দেখা দেয়। ব্যাহত হয় এদের স্বাভাবিক বিকাশ ও বৃদ্ধি। পরিবেশের তাৎক্ষণিক ধ্বংসযজ্ঞ ছাড়াও এর প্রভাব প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর বিরাজমান। বিস্ফোরণের পর কিছুদিন বায়ুম-লের ধোঁয়া এবং ধুলোর আস্তরণে সূর্যের আলো ভূপৃষ্ঠে পড়তে বাধা পায়। ফলে তাপমাত্রা কমে স্থানীয় জলবায়ুর পরিবর্তন ঘটায়।

প্রতি বছর হিরোশিমা দিবস যুদ্ধের ভয়াবহতার পাশাপাশি শান্তির প্রয়োজনীয়তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয় যুদ্ধ মানে প্রাণের ধ্বংস। যুদ্ধ মানে মানবতার পরাজয়, সভ্যতার বিনাশ। একটি মাত্র কর্মযজ্ঞ যেখানে বিজয়ী বা পরাজিত উভয় পক্ষই শেষ পর্যন্ত ক্ষতবিক্ষত হয়। মানুষের পাশাপাশি ধ্বংস হয় প্রাণ-প্রকৃতির। মানুষ ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি সংখ্যায় তুলে ধরা সম্ভব হলেও পরিবেশ ও প্রতিবেশের ওপর এর প্রভাব পরিমাপ দুঃসাধ্য। একটা সময় যুদ্ধ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু যুদ্ধজনিত পরিবেশ ও প্রতিবেশ পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসতে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ লেগে যায়; এমনকি কোনো ক্ষেত্রে কখনো তা পূর্বের অবস্থায় ফিরে আসে না। মানুষ্য সৃষ্ট যুদ্ধে মূল্য দেয় নিরপরাধ প্রাণ-প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য। হিরোশিমা ঘটনার পর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে। পুরো বিশ্বব্যবস্থা বিভক্ত ও বদলে যায়। বিশ্বরাজনীতিতে সূচনা হয় স্নায়ুযুদ্ধের। জাপান প্রতিজ্ঞা করে ভবিষ্যতে আর যুদ্ধে জড়াবে না। পারমাণবিক অস্ত্র নিবৃত্ত ও নিরস্ত্রীকরণের ধারণারই কেবল জন্ম হয়নি; অনেক রাষ্ট্রকে কার্যত উদ্যোগ নিতে দেখা যায়। পারস্পরিক সৌহার্দ্য, শুভেচ্ছা বিনিময় ও আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর ওপর বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরি হয়। যাত্রা শুরু করে জাতিসংঘ। অথচ এরই মাঝে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ৮৫ লাখ লোক নিহত ও ২ কোটি ১০ লাখ লোক আহত এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দেড় লাখ লোক নিহত ও কোটির কাছাকাছি আহত হয়। যুদ্ধ বা বোমা বর্ষণ কেবল একটি শহর বা রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে না; এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম মানুষের জীবন, প্রকৃতি ও মানবতাকে ক্ষতবিক্ষত করে।

কিন্তু প্রশ্ন জাগে এরপরও যুদ্ধ কি থেমেছে? কাক্সিক্ষত শান্তি কি এসেছে? উত্তর হতাশার। কারণ হিরোশিমা ঘটনার পর বিশ্ব কোরীয় যুদ্ধ (১৯৫০-১৯৫৩), ভিয়েতনাম যুদ্ধ (১৯৫৫-১৯৭৫) এবং উপসাগরীয় যুদ্ধ (১৯৯০-১৯৯১) ছাড়াও ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ (১৯৬৫), বাংলাদেশ-পাকিস্তান যুদ্ধ (১৯৭১), ইরান-ইরাক যুদ্ধ (১৯৮০-৮৮), সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ (১৯৭৯-১৯৮৯), দ্বিতীয় কঙ্গো যুদ্ধ (১৯৯৮-২০০৩) এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ (২০২২-)সহ অনেক বড় বড় সশস্ত্র সংঘাতের নির্মম সাক্ষী হয়েছে। তাহলে হিরোশিমা দিবসের শিক্ষা কী? অথচ প্রতি বছর ঘটা করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হয়। আজ বিভিন্ন জোট, সংস্থা, রাষ্ট্র, ব্যক্তি যুদ্ধ ও হিংসা বাদ দিয়ে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা তথা মানবতার জয়গানকে সামনে রেখে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ঘোষণা করবেন। অপরদিকে একই সঙ্গে ফিলিস্তিন, ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ, রাশিয়া-ইউক্রেনে চলছে যুদ্ধ। মানবতার জয়গানের বিপরীতে দয়া, মায়া ও মনুষ্যত্ব হারিয়ে একটি ভীতির বিশ্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যখন এই লেখাটি পড়ছেন তখনো বিশ্বের কোথাও না কোথাও যুদ্ধে প্রাণ যাচ্ছে নিরপরাধ ব্যক্তি; ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্য প্রাণ-প্রকৃতি। বস্তুত যুদ্ধের ভয়াবহতার দরুন হিরোশিমা ও নাগাসাকি বোমা হামলার পরের বছর থেকেই প্রতি বছর যুদ্ধমুক্ত শান্তিময় বিশ্ব গড়তে তথা মানবতার জয়গানে বিশ^ব্যাপী দিবসটি পালন করলেও যুদ্ধ কিন্তু থামেনি। মানুষের প্রাণহানির বাইরে এসব সশস্ত্র সংঘাতে কী পরিমাণ জীবজন্তুর প্রাণ গেছে তার কোনো জরিপ হয়নি। যুদ্ধে বাস্তুচ্যুত লোকজনের বাসস্থানের জন্য বন ও কৃষিজমির ওপর ব্যাপক চাপ পড়েছে। পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহৃত না হলেও মিসাইল, ড্রোন ও রকেট হামলায় বিশ্ব আজ ক্ষতবিক্ষত। পারমাণবিক যুদ্ধের আতঙ্কে আছে পুরো বিশ্ব। কেউ যুদ্ধ থামানোর কার্যকর উদ্যোগও নিচ্ছেন না। বিভিন্ন স্বার্থের জালে বন্দি বিশ্বব্যবস্থায় দুর্বল রাষ্ট্রের পাশে কেউ নেই। মুসলমানরা দ্বিধাবিভক্ত হওয়ায় সংকট আরও বাড়ছে। বিশ্বে জাতীয় শক্তির ভারসাম্য না থাকায় এক মেরু বিশ^ ব্যবস্থা যুদ্ধের সম্ভাবনা ও বাস্তবতা বাড়িয়ে তুলেছে। এতে নিরীহ লোকজনের মৃত্যুর পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের সঙ্গে যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ, দূষণ এবং সম্পদের অপচয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি করছে। যুদ্ধ শেষ হওয়ার বহু বছর পরও অবিস্ফোরিত মাইন ও গোলাবারুদ ভূমি ব্যবহারে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়।

আবার বেশিরভাগ যুদ্ধে নদী, সাগর, সংরক্ষিত বন, মালভূমি, পাহাড় ও জলাভূমি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যুহ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় যুদ্ধের সবচেয়ে বড় পরিবেশগত ক্ষতির শিকার হয় এসব সংবেদনশীল প্রতিবেশ ব্যবস্থা। আক্রমণকারী রাষ্ট্রের লক্ষ্য থাকে প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যুহ ধ্বংস করা; অপরদিকে আক্রান্ত রাষ্ট্র এ প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে উভয়েই পুরো প্রতিবেশ ব্যবস্থা ও বাস্তুতন্ত্রকে সঙ্গিন করে তোলেন। আবার সর্বাত্মক এসব যুদ্ধের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো বিভিন্ন খনি, বিদ্যুৎ কেন্দ্র, গ্যাস ক্ষেত্র, তেলকুপ, রাসায়নিক কারখানা, রাসায়নিক দ্রব্য বা তেল তরল গ্যাস বহনকারী জাহাজে হামলা চালানো। ব্যাপক বোমাবর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, খনন, সামরিক স্থাপনা নির্মাণ হলো যেকোনো যুদ্ধের সাধারণ ঘটনা। এতে প্রাকৃতিক পরিবেশ কেবল যুদ্ধকালীন নয়; যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেও আহত ও পঙ্গু মানুষের মতো সার্বিক পরিবেশ ও প্রতিবেশও অনেকটা পঙ্গুত্ব বরণ করে; যুদ্ধের ক্ষত ধারণ করে টিকে থাকে। মূলত হিরোশিমা থেকে শিক্ষা না নেওয়ায় সশস্ত্র সংঘাতগুলো টেকসই মানবসভ্যতার পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে।

লেখক : পরিবেশ, জলবায়ু ও উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ। অধ্যাপক ও উপাচার্য, মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

jahirul-psa@sust.edu