অনুকূলে ইরান, বেকায়দায় যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলতি কূটনৈতিক আলোচনা আবারও ব্যর্থ হলে, উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন সংঘাতের শুরু হওয়াটা কেবল সময়ের ব্যবধান। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও তেমনটাই আভাস দিয়ে রেখেছেন। ইরানও সে বাস্তবতা জানে এবং দেশটির কর্র্তৃপক্ষ সেভাবেই নিজেদের প্রস্তুত করেছে। ইরানের সামরিক কর্র্তৃপক্ষ জোর দিয়ে জানিয়েছে যে, তারা নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে এবং যুদ্ধের ক্ষতি কাটিয়ে উঠেছে। এমনকি যুদ্ধবিরতির ‘সর্বোচ্চ ব্যবহার’ করে ইরান ড্রোনের উৎপাদন বেড়েছে ৩ গুণ। সামরিক সক্ষমতা যখন ইরানের আত্মবিশ্বাসের পালে হাওয়া দিচ্ছে, মুদ্রার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র তখন খানিকটা হলেও বেকায়দায় পড়েছে। দীর্ঘ পাঁচ মাসের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী তাদের মজুদ থাকা অত্যন্ত নিখুঁত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের বড় অংশই ব্যবহার করে ফেলেছে। ফলে ভবিষ্যতের কোনো সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর পর্যাপ্ত প্রস্তুতি আছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

চলতি সপ্তাহে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সেনা মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেন, ‘আমরা সমঝোতা স্মারকের সুযোগ এবং যুদ্ধবিরতির প্রতিটি মুহূর্তকে সর্বোচ্চ কাজে লাগিয়েছি।’ তিনি জানান, সামরিক বাহিনীতে বিদ্যমান সরঞ্জামগুলো অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি নতুন সরঞ্জাম আমদানি করা হয়েছে। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবস্থাগুলো মেরামত ও পুনরুদ্ধার করা হয়েছে এবং নতুন সামরিক ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। গত মাসে ইরানের ভারপ্রাপ্ত প্রতিরক্ষামন্ত্রী মজিদ ইবনে রেজা বলেছিলেন, ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনের উৎপাদন ‘একটি দিনের জন্যও বন্ধ হয়নি’ এবং ড্রোন উৎপাদন যুদ্ধপূর্ব সময়ের তুলনায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে তিনি নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা উল্লেখ করেননি।

ইরানের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণকারী এবং ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা পরিচালনাকারী আইআরজিসিও একই ধরনের তথ্য জানিয়েছে। বাহিনীর মুখপাত্র হোসেন মহিব্বি গত মাসের শেষের দিকে বলেছিলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জিত জ্ঞান ব্যবহার করে ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্যভেদের নির্ভুলতা উন্নত করা হয়েছে। তবে গত জুনে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছিল, ইরান তাদের যুদ্ধপূর্ব ক্ষেপণাস্ত্র মজুদের প্রায় ৭০ শতাংশ এবং ড্রোন মজুদের প্রায় ৪০ শতাংশ অক্ষত রেখেছে যা নির্দেশ করে যে তেহরান হরমুজ প্রণালি ও অন্যান্য ক্ষেত্রে আরও কয়েক মাস ধরে এই অসম যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম।

আইআরজিসির সাবেক সিনিয়র কমান্ডার হোসেন কানানি মোকাদ্দম আলজাজিরাকে বলেছেন, ‘আমরা আমাদের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও মান উন্নত করছি। আমাদের আগের ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর পাল্লা (রেঞ্জ) এবং ওয়ারহেডের ধ্বংসক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের মাটির নিচে থাকা সুড়ঙ্গ শহরগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের বিশাল মজুদ রয়েছে, যার নতুন নতুন অংশগুলো পর্যায়ক্রমে আমাদের অপারেশনাল লাইনে যুক্ত হচ্ছে।’ তিনি যোগ করেন, এটিই অন্যতম প্রধান কারণ যার জন্য ট্রাম্প বারবার ইরানের ওপর বড় ধরনের বিমান হামলা বাতিল করেছেন।

বেকায়দায় যুক্তরাষ্ট্র : ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ গোলাবারুদের মজুদ বিপজ্জনকভাবে কমে এসেছে। একাধিক সূত্রের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রায় ৮০ শতাংশ ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার হয়ে গেছে। একই সঙ্গে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় অর্ধেক কমেছে। এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আর্মি ট্যাকটিক্যাল মিসাইল সিস্টেম (অ্যাটাকমস) ও প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল (পিআরএসএম) নামে পরিচিত। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের (সিএসআইএস) তথ্য বলছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আধুনিক দুই ধরনের প্যাট্রিয়ট ব্যবস্থার প্রায় ২ হাজার ২০০টি ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় ৪৫২টি থাড ক্ষেপণাস্ত্র ছিল। যুদ্ধের সময় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ঠেকাতে এসব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর ফলে থাডের মজুদ প্রায় চার-পঞ্চমাংশ এবং প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টরের প্রায় অর্ধেক শেষ হয়ে গেছে বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে। থাডের এত বড় ঘাটতির তথ্য এর আগে প্রকাশ্যে আসেনি।

ট্রাম্প অস্ত্রের ঘাটতির কথা অস্বীকার করলেও, পেন্টাগণের কর্মকর্তাদের তথ্য বলছে উল্টো কথা। পাশাপাশি এসব অস্ত্রের উৎপাদন ‘ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ’ হওয়ায় দ্রুতই নতুন সরবারহ পাবে না যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী। দেশটির সমরাস্ত্র প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন- ট্রাম্পের বিবৃতি বা অস্ত্রের বর্তমান মজুদ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেনি।