অপরাধের ধরন বদলেছে নিরাপত্তা উদ্বেগ কাটেনি

গত ১৭ বছরের আওয়ামী লীগের শাসনামলে ব্যাপক মানবাধিকার-লঙ্ঘনের পর ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান মানুষের মনে আশার সঞ্চার করেছিল। ধারণা করা হয়েছিল, অন্তর্বর্তী সরকার পূর্বতন পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটাতে পারবে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার-পরিস্থিতির কাক্সিক্ষত উন্নতি হয়নি; উল্টো মব বা ‘গণ-সহিংসতা’ উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে একটি নির্বাচিত সরকারের প্রতি মানুষের আশা তৈরি হয়।

নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পরও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। চাঁদাবাজি, দখলবাজি, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই প্রভৃতি অপরাধ নিয়মিতই ঘটছে। অপরাধ, দুর্বৃত্তপনা ও সহিংসতা চলমান।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের মব-সহিংসতা ও বর্তমান সরকারের পাঁচ মাসে সংঘটিত অপরাধ-সংশ্লিষ্ট মামলার অগ্রগতি ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সরকারের বদলে অপরাধের ধরনে কিছু বদল ঘটলেও জননিরাপত্তা-বিষয়ক উদ্বেগ কাটেনি; ভয়ে থাকতে হচ্ছে সবাইকে। ছিনতাই ব্যাপক হারে বেড়েছে। চাঁদাবাজি চলছেই। শহরাঞ্চলের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও বেড়েছে অপরাধ। তুচ্ছ ঘটনায় বড় সহিংসতা হচ্ছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও চলছে দখলের রাজত্ব। এ নিয়ে ছাত্র সংগঠনগুলো জড়িয়ে পড়ছে রেষারেষিতে। নিয়ন্ত্রণহীন কিশোর গ্যাং, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় তারা বেপরোয়া। অনেক বেশি অরক্ষিত নারী ও শিশু। গত ছয় মাসে পাঁচ হাজারের বেশি নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারও এ বিষয়ে পিছিয়ে ছিল না। তাদের দেড় বছরে প্রায় বিশ হাজার নারী-শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে; অন্যান্য অপরাধ থেকেও মানুষের নিস্তার ছিল না।

অপরাধ-বিশ্লেষকদের মতে, দেশে অপরাধের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে মব-সহিংসতা তুঙ্গে থাকলেও বর্তমানে চাঁদাবাজি, দখলদারি, রাজনৈতিক আধিপত্যকেন্দ্রিক সংঘর্ষ ও হত্যাকা- বেড়েছে। নির্বাচিত সরকার আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার-পরিস্থিতির উন্নতির আশা পূরণ করতে পারছে না। তাদের মতে, জনসমর্থন ধরে রাখতে হলে সরকারকে আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার-পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে, ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে হবে এবং আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার বিভাগ ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কার্যকরী সংস্কার করতে হবে। সরকারকে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর গভীরতা আন্তরিকভাবে স্বীকার করে মোকাবিলার রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে হবে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ের বেপরোয়া মব : পুলিশ-সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে চাঁদাবাজি, দখলদারি, রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা কমলেও মব-সন্ত্রাস নিয়মিত ও সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি কমে যাওয়ায় জনতার হাতে আইন তুলে নেওয়ায় রাস্তাঘাটে, প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে মব-সহিংসতা আশঙ্কাজনক বেড়েছিল। মানবাধিকার সহায়তা সমিতির (এইচআরএসএস) তথ্যানুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে ৪১৩টি মব-সহিংসতায় ২৫৯ জন নিহত ও ৩১৩ জন আহত হয়েছে।

থামেনি অপরাধ : মাঠপর্যবেক্ষণ ও অপরাধ-পরিসংখ্যান বলছে, ক্ষমতার পালাবদল ঘটলেও থামেনি অপরাধের রমরমা ধারা। নতুন করে শুরু হয়েছে আধিপত্যবিস্তার। গত ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের অন্তত ৩৮ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে এসব হত্যাকা-ের পেছনে রাজনৈতিক আধিপত্যবিস্তার, অভ্যন্তরীণ কোন্দল, পূর্ববিরোধ, চাঁদাবাজি, দখল-বাণিজ্য ও অবৈধ আর্থিক স্বার্থকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সময়ে সামগ্রিক হত্যাকা-ের সংখ্যাও উদ্বেগজনক।

অপরাধ হলেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে শাস্তি : পুলিশ সূত্র জানায়, দিনে দিনে অবনতির দিকে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি। প্রতিদিনই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হত্যাকা- থেকে শুরু করে সব ধরনের অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। এ নিয়ে পুলিশের শীর্ষ কর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করছেন। বৈঠকে থানা-পুলিশের টহল টিমের কর্মকা- নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়েছে। পুলিশের সবকটি ইউনিট, রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপারদের বার্তা পাঠিয়ে বলা হয়েছে, যেসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হবে সেখানকার কর্মরত পুলিশ কর্মকর্তা বা অন্য সদস্যদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে; তাৎক্ষণিকভাবে বদলি বা সাময়িক বরখাস্ত করা হবে।

বিএনপির ৩৮ নেতাকর্মী খুন : মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারি থেকে ২৮ জুলাই পর্যন্ত নিহত বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের ৩৮ নেতাকর্মীর মধ্যে বিএনপির ২১ জন, যুবদলের ৮ জন, ছাত্রদলের ২ জন, শ্রমিক দলের ২ জন, কৃষক দলের ২ জন, স্বেচ্ছাসেবক দলের ২ জন ও তাঁতীদলের একজন। সর্বশেষ ২৪ জুলাই রাতে রাজধানীর কাফরুলে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন যুবদলের কর্মী মো. ইউসুফ আলী পারভেজ।

তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, ময়লার ঠিকাদারি, ফুটপাতের ব্যবসা, অন্যান্য ব্যবসায়িক স্বার্থ এবং টিনশেড ঘরের দখল নিয়ে বিরোধ থেকে পারভেজের ওপর হামলার পরিকল্পনা করা হয়। ২৫ লাখ টাকার চুক্তিতে ভাড়াটে খুনি আনা হয়। এর আগে ২১ জুলাই সবুজবাগে ওয়ার্ড বিএনপির কর্মী ইব্রাহিম পলাশকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশ ও স্থানীয়রা জানিয়েছে, পূর্বশত্রুতার জেরে যুবদলের কয়েক নেতাকর্মীসহ ১০ থেকে ১৫ জন তার ওপর হামলায় অংশ নেয়। ১৫ জুলাই কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে উপজেলা বিএনপির পদ-স্থগিত হওয়া সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। স্থানীয় ছাত্রদলের এক নেতার সঙ্গে বিরোধের জেরে ভাড়াটে অপরাধীদের দিয়ে হত্যাকা-টি সংঘটিত হয়। ৮ জুন রমনা থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক আহ্বায়ক বিল্লাল হোসেন ছুরিকাঘাতে নিহত হন। পুলিশের ধারণা, ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজির বিরোধ থেকেই এ হত্যাকা-ের সূত্রপাত। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে বিএনপির কর্মী রাজু আহম্মেদ, চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরী, খুলনায় বিএনপি নেতা রফিকুল ইসলাম, ময়মনসিংহে বিএনপিকর্মী রানা মিয়া ও বাগেরহাটে কৃষক দলের সভাপতি বাদল মোড়লও পূর্বোল্লিখিত কারণে নিহত হয়েছেন।

জঘন্য অপরাধের ধারাবাহিকতা : গত বছরের প্রথম ছয় মাসে ছিনতাইয়ের ঘটনা ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ছিনতাই, খুন, ধর্ষণ, মাদক কারবার এবং কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য জনমনে আতঙ্ক বাড়িয়েছে। গত ৭ জুন রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বর এলাকায় দিনদুপুরে ‘মানি এক্সচেঞ্জ’ ব্যবসায়ী মো. লোকমানকে গুলি করে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। ১০ এপ্রিল আশুলিয়ায় তৈরি পোশাক কারখানার সাব-কন্ট্রাক্টর আল আমিন ও একটি পোশাক দোকানের কর্মচারী মো. পারভেজকে গুলি করে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। সামাজিক অপরাধও বেড়েছে। গত সোমবার কাঁঠালবাগানে পারিবারিক কলহের জেরে শাশুড়ি ফিরোজা বেগম ও স্ত্রী ফারজানা আক্তার রাত্রিকে হত্যা করেন হৃদয় ওরফে শিপন। ১৬ মে শরীয়তপুর সদর উপজেলার চন্দ্রপুর এলাকায় জিয়া উদ্দিন সরদারকে হত্যার পর মরদেহ টুকরো করে নদী ও ডোবায় ফেলেন স্ত্রী আসমা আক্তার।

খুন-অপহরণ বেড়েছে : পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে ১ হাজার ৫৩১টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। প্রতিটি ঘটনায় মামলা দায়ের হয়েছে। আর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ১ হাজার ৭৭৮টি। অর্থাৎ চলতি ছয় মাসে ২৪৭টি খুনের ঘটনা বেশি ঘটেছে। আবার চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে অপহরণের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৫২৭টি, যা গত বছরের প্রথম ছয় মাসে ছিল ৪৭২টি। অন্তর্বর্তী সরকার গুম নিয়ে হাঁকডাক দিলেও সে সময়েও ৪৭২টি গুমের ঘটনা ঘটেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে ৯৭৮টি ডাকাতি, ৪ হাজার ৫৭২টি খুন, ২৮ হাজার ৮০৬ টি নারী ও শিশু নির্যাতন ও ১ হাজার ৩৮৬টি অপহরণের মামলা হয়েছে। দস্যুতা, দ্রুতবিচার আইনে মামলা, পুলিশ আক্রান্ত, চুরি, অস্ত্র, মাদক, চোরাচালান, বিস্ফোরকসহ অন্যান্য ঘটনায় দেড় বছরে মামলা হয়েছে ২ লাখ ৭ হাজার ৩৮৭টি। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মোট মামলা ৪৭৪৫টি।

ট্রমামুক্ত হয়নি অনেক পুলিশ : মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পুলিশের ওপর যেভাবে হামলা হয়েছে তার ট্রমা থেকে এখনো বের হতে পারছেন না অনেক সদস্য। তাদের মধ্যে ‘মবের’ ভয় এখনো কাজ করছে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ-বিশ্লেষক তৌহিদুল হক বলেন, ‘আইন প্রয়োগে যে মানসিক মনোবল ও পেশাগত দক্ষতা দরকার, পুলিশে তা এখনো ফেরেনি। কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে দৃষ্টি দিতে হবে।’

পুলিশের গাফিলতি : পুলিশ কর্মকর্তারা নিশ্চিত হয়েছেন, এলাকায় থানা-পুলিশের ঢিলেঢালা টহল হচ্ছে। রাতের বেলায় ডিউটি হয় না বললেই চলে। আবার কিছু টহল হলেও গাড়ির মধ্যে ঘুমিয়ে রাত পার করে দেন দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা। আন্ডারওয়ার্ল্ড আগের চেয়ে বেশি তৎপর। রাজনৈতিক বিরোধ বাড়ছে। টার্গেট করে হত্যাকা- ঘটানো হচ্ছে। চরমপন্থিদের অপকর্মও বেড়েছে। অনেক অপরাধী ভাড়ায় খাটছে। দেশের ভেতরের পাশাপাশি বিদেশ থেকে হত্যার নির্দেশনা আসছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যেও আতঙ্ক আছে। উদ্ধার হচ্ছে না লুণ্ঠিত আগ্নেয়াস্ত্র। ধরা পড়ছে না দাগি অপরাধী। সবকিছু মিলিয়ে শৃঙ্খলা আসছে না দেশে।

অপরাধীকে ছাড় নয় : পুলিশ সদর দপ্তরের উপ-মহাপরিদর্শক (অপারেশন) রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও উন্নতি করতে বেশকিছু নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। এলাকায় পুলিশের টহল বাড়াতে বলা হয়েছে। থানায় জনবল বা যানবাহন সংকট থাকলে সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে পুলিশ সদর দপ্তরকে জানাতে বলা হয়েছে। অপরাধীদের ধরতে বিশেষ অভিযান চালানো হবে, প্রয়োজনে ব্লকরেইড। পুলিশের কোনো কর্মকর্তা বা সদস্যের দায়িত্বপালনে গাফিলতির প্রমাণ মিললে কঠোর শাস্তি দেওয়া হবে। সরকার সব ধরনের সহায়তা দিচ্ছে।’