নিষিদ্ধ শব্দবাণ

লোলিতা

‘লোলিতা, আমার জীবনের আলো, আমার কামনা-বাসনার আগুন।’ ১৯৫৮ সালে প্রকাশিত ভ্লাদিমির নবোকভের বিখ্যাত উপন্যাস লোলিতার শুরুর লাইন এটি। প্রকাশের পর উপন্যাসটি চরম বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল আর আজ তা বিশ্বসাহিত্যের ক্ল্যাসিকগুলোর মধ্যে অন্যতম সেরা উপন্যাস হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। উপন্যাসটি প্রকাশের প্রায় ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর মার্কিন গায়িকা ও গীতিকার লানা দেল রেই তার প্রথম অ্যালবাম বর্ন টু ডাই-এর ‘অফ টু দ্য রেসেস’ গানটিতে গেয়ে ওঠেন, ‘আমার জীবনের আলো, আমার কামনা-বাসনার আগুন’—যার মাধ্যমে তিনি নবোকভের সেই বিতর্কিত উপন্যাসের প্রথম বাক্যটিকেই তুলে ধরেন। শুধু এই গায়িকা নন, বিশ্বজুড়ে অনেক লেখক, শিল্পী ও চলচ্চিত্র পরিচালককে উপন্যাসটি নানাভাবে প্রভাবিত করেছে।

নবোকভ বইটি ১৯৫৩ সালে লেখা শেষ করেন। এর মূল গল্পটি এক মধ্যবয়সী ব্যক্তির (হামবার্ট হামবার্ট) ১২ বছরের নাবালিকার প্রতি যৌন আকর্ষণ ও সংকট নিয়ে আবর্তিত হয়েছে। 

প্রকাশের পর উপন্যাসটি বিভিন্ন দেশে সেন্সরশিপের তীব্র বাধার মুখে পড়ে। প্রথমেই দেখা গেল আমেরিকার প্রকাশকরা বইটি প্রকাশ না করে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। সেটা ১৯৫৩-১৯৫৪ সালের কথা। উপন্যাসটি লেখা শেষ হলে নবোকভ প্রধান চারটি মার্কিন প্রকাশনা সংস্থা, যেমন ভাইকিং প্রেসকে পাণ্ডুলিপি পাঠান। কিন্তু সবকটি সংস্থাই বইটি প্রকাশে অস্বীকৃতি জানায়। সম্পাদকদের মতামত ছিল, বইটির সাহিত্যমূল্য অসাধারণ হলেও বিষয়বস্তুর কারণে এটি প্রকাশ করলে তাদের অশ্লীলতার (অবসিনিটি) আইনে বিচারের মুখোমুখি, এমনকি জেলে যেতে হতে পারে। গুনতে হতে পারে বড় অংকের জরিমানা। নবোকভ নিজেও এতটাই ভীত ছিলেন যে, তিনি প্রথমে ছদ্মনামে বইটি প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। 

আমেরিকার কোনো প্রকাশক উপন্যাসটি প্রকাশ না করায় নবোকভ ফ্রান্সের প্যারিসে অবস্থিত অলিম্পিয়া প্রেসের শরণাপন্ন হন এবং সংস্থাটির সঙ্গে চুক্তি করেন। প্যারিস থেকেই ১৯৫৫ সালে এটি প্রথম ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়। অলিম্পিয়া প্রেসের খ্যাতি বা কুখ্যাতি ছিল মূলত ইরোটিক ও পর্নোগ্রাফিক সাহিত্য প্রকাশের জন্য। কিন্তু নবোকভ শুরুতে এ কথা জানতেন না। 

নিষেধাজ্ঞার প্রথম খড়গটা নেমে আসে ব্রিটেনে। বিতর্কের সূচনাও ঘটে সেখানেই। উপন্যাসটির ওপর প্রথম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় ১৯৫৫-১৯৫৬ সময়পর্বে। একই সঙ্গে এই উপন্যাসের জন্য নবোকভ দারুণভাবে সমাদৃত হতে থাকেন। ফ্রান্সে প্রকাশিত হলেও প্রখ্যাত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক গ্রাহাম গ্রিন সানডে টাইমস পত্রিকায় বইটির ভূয়সী প্রশংসা করে একে বছরের অন্যতম সেরা উপন্যাস হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু তখনই শুরু হয় বাদানুবাদ। সানডে এক্সপ্রেসের সম্পাদক জন গর্ডন উপন্যাসটির বিরুদ্ধে আদাজল খেয়ে নামেন এবং একে ‘সবচেয়ে নোংরা ও পর্নোগ্রাফিক বই’ বলে সমালোচনা ও খারিজ করে দেন। 

ব্রিটিশ সরকারও উপন্যাসটির বিরুদ্ধে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। কাস্টমস বিভাগকে তারা নির্দেশ দেয়, বইটি সে দেশে ঢুকলেই যেন বাজেয়াপ্ত করা হয়। এরপর ফ্রান্সেও বইটি নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়ে। ব্রিটিশ সরকারের কূটনৈতিক চাপের মুখে ১৯৫৬ সালে ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ফ্রান্সে বইটির ইংরেজি সংস্করণের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এখানেই থেমে থাকেনি নিষেধাজ্ঞার ঢেউ। ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে। গত শতকের পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি থেকে পুরো ষাটের দশকজুড়ে এই তৎপরতা চলতে থাকে। 

ব্রিটেন ও ফ্রান্সে বিতর্ক ওঠার পর বিশ্বের একাধিক দেশ পর্নো ও অশ্লীল অ্যাখ্যা দিয়ে উপন্যাসটি নিষিদ্ধ করে। নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও আর্জেন্টিনায় বইটির বিক্রি ও বিপণন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। কানাডাও বইটিকে কালো তালিকাভুক্ত করে নিষিদ্ধ করে। কানাডীয় কাস্টমস ১৯৫৮ সালে সে দেশে বইটির প্রবেশে বাধা দেয়। অস্ট্রেলিয়া ছিল আরেক ধাপ এগিয়ে। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া লোলিতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করে রাখে। তবে এরপর পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে যায়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বইটির পাঠ-অবমুক্তি ঘটে ১৯৫৮ সালে। আমেরিকার জি. পি. পুটনামস সন্স প্রকাশনা সংস্থা সেন্সরশিপের ভয় উপেক্ষা করে উপন্যাসটি ছেপে ফেলে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমেরিকায় বইটি সরকারের পক্ষ থেকে কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়নি। প্রকাশের মাত্র ৩ সপ্তাহের মধ্যে ১ লাখেরও বেশি কপি বিক্রি হয়ে বইটি নিউ ইয়র্ক টাইমসের বেস্টসেলার তালিকার শীর্ষস্থান দখল করে। 

আমেরিকায় বাণিজ্যিক সফলতা ও সাহিত্যিকদের সমর্থনের পর অন্যান্য দেশও ধীরে ধীরে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে বাধ্য হয়। আইনি ও রাজনৈতিক বিতর্কের পর ব্রিটেনে আনুষ্ঠানিকভাবে বইটি ১৯৫৯ সালে প্রকাশিত হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় প্রকাশক, লেখক ও রাজনীতিক নাইজেল নিকোলসনকে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। ফরাসি সরকারও ১৯৫৮ সালে বইটির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়। 

বেশ কয়েকটি কারণে বইটি নিষিদ্ধ হয়েছিল। মূল কারণ ছিল এর গল্পটি। সমালোচকদের মতে নাবালিকার প্রতি যৌন নির্যাতন এবং পেডোফিলিয়াকে স্বাভাবিক করে দেখার ঝুঁকি তৈরি করেছিল উপন্যাসটি। দ্বিতীয় অভিযোগটি ছিল মূল চরিত্র হামবার্ট তার অপরাধ ঢাকতে গিয়ে ভাষার মন্ত্রমুগ্ধ সৌন্দর্যকে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন, যা কমবয়সী মেয়েদের ক্ষেত্রে বয়স্ক পুরুষের হাতছানি হিসেবে হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

উপন্যাসের গল্পটি এ রকম : মূল চরিত্র ও বর্ণনাকারী হামবার্ট হামবার্ট একজন মধ্যবয়সী ইউরোপীয় লেখক। ছোটবেলায় তার প্রথম প্রেমিকা অ্যানাবেলের অকালমৃত্যুর পর থেকে তার মধ্যে অল্পবয়সী কিশোরীদের (যাদের সে ‘নিমফেট’ বলত) প্রতি তার এক ধরনের অস্বাভাবিক আকর্ষণ তৈরি হয়। 

আমেরিকায় এলে হামবার্ট রামসডেল নামের এক শহরে শ্যারলট হেজ নামের এক বিধবা নারীর বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে থাকতে শুরু করেন। সেখানে তিনি শ্যারলটের ১২ বছর বয়সী মেয়ে ডলোরেস হেজকে দেখে তার প্রেমে অন্ধ হয়ে পড়েন। হামবার্ট মনে মনে মেয়েটির নাম দেন লোলিতা। 

লোলিতার কাছে থাকার জন্য হামবার্ট তার অপছন্দ সত্ত্বেও শ্যারলটকে বিয়ে করেন। কিন্তু কিছুদিন পর শ্যারলট হামবার্টের ডায়েরি পড়ে লোলিতার প্রতি তার কামনা-বাসনার কথা জানতে পারেন। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত শ্যারলট দুর্ঘটনায় মারা যান। তার মৃত্যুর পর হামবার্ট লোলিতাকে মায়ের মৃত্যুর খবর না জানিয়ে সামার ক্যাম্প থেকে নিয়ে আসেন এবং আইনি অভিভাবক হিসেবে বিভিন্ন মোটেল ও হোটেলে নিয়ে যান। দীর্ঘ এই ভ্রমণজুড়ে তিনি লোলিতাকে যৌনশোষণ ও নিয়ন্ত্রণ করতে থাকেন। লোলিতা তার বন্দিত্বের শিকার হলেও তিনি মোহনীয় ভাষার জালে লোলিতার কাছে নিজেকে নির্দোষ প্রেমিক হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন। ঘটনার একপর্যায়ে লোলিতা অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয় এবং সেখান থেকে ক্লেয়ার কুইল্টি নামের এক নাট্যকারের সাহায্যে সে পালিয়ে যায়। হামবার্ট উন্মাদ হয়ে লোলিতাকে খুঁজতে থাকেন।

কয়েক বছর পর লোলিতার কাছ থেকে একটি চিঠি পান হামবার্ট। লোলিতা তখন প্রাপ্তবয়স্ক নারী, গর্ভবতী এবং এক সাধারণ মানুষকে বিয়ে করে জীবনযাপন করছে। টাকার প্রয়োজন হওয়ায় সে হামবার্টের সাহায্য চায়। হামবার্ট তার কাছে গিয়ে তাকে আবার ফিরে আসার আকুতি জানায়, কিন্তু লোলিতা তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। লোলিতা তাকে জানায়, ক্লেয়ার কুইল্টি তাকে অপহরণ করে তার কাছ থেকে সুবিধা নিতে চেয়েছিল। প্রতিশোধ নেওয়ার লক্ষ্যে হামবার্ট ক্লেয়ার কুইল্টিকে খুঁজে বের করে গুলি করে হত্যা করেন। পুলিশ হামবার্টকে গ্রেপ্তার করে।

জেলে বিচারের অপেক্ষায় থাকা হামবার্ট হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। অন্যদিকে ডলোরেস (লোলিতা) সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে অকালে মৃত্যুবরণ করে। উপন্যাসটি হামবার্টের লেখা স্বীকারোক্তি বা স্মৃতিচারণ হিসেবে লেখা হয়েছে। 

সাধারণভাবে এটি অপরাধ এবং অনৈতিক সম্পর্কের গল্প হলেও সাহিত্যের দিক থেকে উপন্যাসটি নবোকভের ভাষার জাদুকরী শৈলী, মনস্তত্ত্ব এবং অপরাধবোধের জটিল বর্ণনার জন্য বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম ক্ল্যাসিক হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। 

আধুনিক সাহিত্য সমালোচকরা তাই এই উপন্যাসের বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছেন। তারা বলেছেন, বইটি পেডোফিলিয়াকে সমর্থন করে না; বরং এক অপরাধীর আত্মপক্ষ সমর্থনের চরম মিথ্যাচার ও মানসিক দৃষ্টিভঙ্গিকে উন্মোচন করে দেখায়। হামবার্ট ও ডলির মধ্যেকার জটিল সম্পর্ক যৌনতার ভিন্ন এক ধরনের প্রভাবকে সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছে; পরে যা পৃথিবীর অনেক লেখক ভিন্ন ভিন্নভাবে অনুসরণ করেছেন। লোলিতা ধীরে ধীরে সেন্সরশিপের বাধা অতিক্রম করে এভাবেই হয়ে ওঠে বিশ্বসাহিত্যের পাঠকনন্দিত সেরা ক্ল্যাসিক। 

ভ্লাদিমির নাবোকভ তার নিষিদ্ধ ও বিতর্কিত উপন্যাস লোলিতা সম্পর্কে একাধিক সাক্ষাৎকারে এবং উপন্যাসের ‘অন আ বুক এনটাইটলড লোলিতা’ শীর্ষক পরিশিষ্টে বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছিলেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন লোলিতা কোনো নীতিশিক্ষামূলক উপন্যাস নয়। পাঠকদের উদ্দেশে তিনি লেখেন : ‘আমার কাছে একটি কল্পকাহিনি বা উপন্যাসের অস্তিত্ব কেবল তখনই সার্থক বলে মনে হয়, যখন তা আমাকে “নান্দনিক আনন্দ” দেয়। লোলিতা কোনো নৈতিক শিক্ষা দেয় না, উপন্যাসের কাজও সেটা নয়। আমি নীতিশিক্ষামূলক সাহিত্যের লেখক বা পাঠকদের দলভুক্ত নই।’

তার মতে, শিল্প ও সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য মানুষকে সামাজিক-সাংস্কৃতিকভাবে উপদেশ দেওয়া নয়, বরং নান্দনিক আনন্দ দেওয়া। অর্থাৎ নবোকভ নৈতিক শিক্ষা নয়, নান্দনিক আনন্দে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু এই শর্ত মেনে লোলিতা লেখার কাজটি তার কাছে সহজ ছিল না। নবোকভ লোলিতাকে তার লেখা শ্রেষ্ঠ রচনা হিসেবে উল্লেখ করে বলেছিলেন, ‘এটি লিখতে গিয়ে আমাকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট করতে হয়েছিল, আবার এই উপন্যাস লিখতে পেরে সবচেয়ে বেশি আনন্দ পেয়েছি।’

তিনি একবার রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘লোলিতা বিখ্যাত, আমি নই। আমি এক নামগোত্রহীন ঔপন্যাসিক যার নাম উচ্চারণ করাও কঠিন।’

নবোকভ ছিলেন রুশ ভাষার লেখক, কিন্তু বিস্ময়কর হচ্ছে লোলিতা তিনি লিখেছিলেন ইংরেজি ভাষায়। ভাষার এই চ্যালেঞ্জকে গ্রহণ করে তিনি লোলিতা উপন্যাসটি লিখেছিলেন। তিনি একে তার প্রিয় রুশ ভাষা ত্যাগ করে ইংরেজি ভাষার সঙ্গে এক ধরনের প্রেম ও সংগ্রামের অভিজ্ঞতা বলে মনে করতেন। নবোকভ লোলিতাকে সার্বিকভাবে সামাজিক বা নীতি-নৈতিকতার চশমা দিয়ে না দেখে কেবল উঁচু মানের শিল্প ও ভাষার নান্দনিক কারুকাজ হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এই উপন্যাসের প্রথমদিকের সমালোচকদের অন্যতম, প্রখ্যাত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক গ্রাহাম গ্রিনও এই বৈশিষ্ট্যের জন্য উপন্যাসটির প্রশংসা করেছিলেন।