প্রচ্ছদ রচনা

প্রণয় ও ইয়ার্কি : উনিশ শতকে বন্ধুত্ব ও প্রেম

আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০২ এএম

‘অসার সংসারে সার বন্ধুর প্রণয়’
— ঈশ্বর গুপ্ত, ‘সৌহার্দ্দ’

প্রণয় শব্দে আজকাল প্রেম বোঝায়। কিন্তু উনিশ শতকে প্রণয় বলতে প্রধানত বোঝাত খাতির ও হৃদ্যতা। সমলিঙ্গীয় বন্ধুত্বকেও প্রণয় বলত। বিদ্যাসাগর থেকে শুরু করে জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস সবার রচনাতেই সমলিঙ্গীয় পুরুষ বন্ধুদের মধ্যে হৃদ্যতা বোঝাতে প্রণয়, বিরহ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। প্রণয় আর প্রেম তাই সবসময় এক জিনিস নয়।

সমাজে সম্পর্কের পরিভাষার এ রকম নানা বিবর্তন হয়। যেমন ‘সহবত’ বা ‘সহবাস’ শব্দ। ফার্সি ‘সোহবত’ বা বাংলায় ‘সহবত’ শব্দটি একইসঙ্গে সঙ্গ, সঙ্গম, আদব ও আলাপ এই চারটা জিনিসই বোঝায়। তেমনি বাংলা সহবাস শব্দটি আজকাল বিষমলিঙ্গীয় একান্ত সম্পর্ক বোঝালেও একদা তা সমলিঙ্গীয় বন্ধুত্বের সংসর্গকেও বোঝাত। উল্টাদিকে স্নেহ [নেহ], প্রীতি [পিরিতি] বিষমলিঙ্গীয় প্রেম বোঝাত আগে, আর হালে লিঙ্গনিরপেক্ষ সদ্ভাব বোঝায়।

সেই যুগের লিঙ্গীয় পরিসর-বিভাজিত (জেন্ডার-সেগ্রেগেটেড) সমাজে মানুষের সংবেদের জগতে সমলিঙ্গীয় অন্তরঙ্গতার গুরুত্ব ছিল বিস্তর। গুরুনাথ সেনগুপ্ত, অক্ষয়কুমার দত্ত প্রমুখের রচনায় দেখা যায় সমলিঙ্গীয় বন্ধুর সঙ্গে সহবাস (এক্ষেত্রে, অযৌন সংসর্গ বা সময় কাটানো) করলে পরিতোষ পাওয়া যায়। দত্ত বলছেন, ভার্যার কাছেও যা প্রকাশ্য নয় তাও বন্ধুর কাছে প্রকাশযোগ্য। আর সেনগুপ্ত বলছেন, ভক্তি বা বাৎসল্যের চেয়েও বন্ধুত্ব বড় জিনিস। 

প্রণয় বা সহবাস শব্দগুলো যে তাদের সমলিঙ্গীয় ও অযৌন অর্থ পরিত্যাগ করে আমাদের জমানায় বিষমলিঙ্গীয় একান্ত সম্পর্কের জন্য নিয়োজিত হলো, এর থেকে বোঝা যায় যে শব্দ, ভাষা, চিহ্ন মানুষের শরীরী, ব্যবহারিক সত্তা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে অর্থ উৎপাদন করে না।

উনিশ শতকে নতুন বাংলা সাহিত্যের যখন উন্মেষ হচ্ছে, তখন পুরাতন সামাজিক সম্পর্কগুলোর ভাঙচুর শুরু হয়েছে। জার্মান দার্শনিক মারটিন হাইডেগার বলেন, হাতুড়ি দিয়ে যখন ধমাধম পেরেক ঠোকা যায়, তখন কেউ হাতুড়িকে ধেয়ানে এনে থিমাটাইজ করে না। কিন্তু হাতুড়ি ভাঙলে পরে তাকে খেয়াল করা যায়। আমরা সদা ব্যবহারিক জীবনে যা ব্যবহার করে থাকি, সেই ব্যবহারিক জিনিস যখন কোনো কারণে টুটে যায় তখনই জিনিসটা আমাদের চোখের সামনে আলাদা করে উপস্থিত হয়ে ওঠে। পুরাতন বন্ধুত্বের ধরনগুলো যখন ক্ষয় পেল, আর নতুন ধরনের বন্ধুত্ব গঠনের তাগিদ দেখা দিল, তখন ভদ্রবিত্ত বুদ্ধিজীবীরা বন্ধুত্ব ব্যাপারটিকে থিমাটাইজ করা শুরু করল।

উপনিবেশের সময় রাজনৈতিক তৎপরতার সুযোগ কম ছিল, কিন্তু পরা-রাজনৈতিক নানা পরমার্থ নিয়ে এই সময় বাংলা ভাষার লেখকরা বিস্তর চিন্তাভাবনা করেছেন। মানবীয় সম্পর্ক ছিল তাদের বিবেচনার অন্যতম বিষয়। উপনিবেশবাদ কেবল রাষ্ট্র পরিচালনা করেনি, বরং সমাজের ভেতর নতুন ধরনের বান্দাগঠন ছিল তার অন্যতম প্রকল্প। মেকলের মিনিটস তার এক ধরনের আদিকল্প। কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলায় নব্য বাবু ও বিবি-দেবীর নানাপ্রকার বিবর্তনে এই বান্দার গঠন ও বিক্ষেপ দেখা যায়। সমাজে বিদ্যমান বন্ধুত্বের যে নানা ধরন সেগুলোকে নাকচ ও নতুন ধরনের বন্ধুত্বের নির্মিতির প্রেরণা বোধ করছিল ভদ্রবিত্ত বুদ্ধিজীবীরা।

প্রাক-উপনিবেশ বাংলাতেও বন্ধুত্ব নিয়ে নানা তত্ত্ব ছিল। মুসলমানি [ইসলামিকেট] এবং হিন্দুয়ানি [ইন্ডিক] চিন্তাপরম্পরায় বন্ধুত্ব প্রসঙ্গে নানা থিমাটিক তত্ত্বায়নের নজির বিস্তর। সুফি তত্ত্বে, মজহাব-ই-ইশকে, বন্ধু ছিল দর্পণ। বন্ধুর সঙ্গে প্রণয়ের মধ্য দিয়েই সাধক নিজের পরম আত্মকে উপলব্ধি করতে পারত।

আর বৈষ্ণব তত্ত্বে পরমের সঙ্গে বান্দার সম্পর্কের নানা ধরনকে পাঁচটি রসের দ্বারা প্রকাশ করা হতো। এই পাঁচ রসের নাম—শান্ত, দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর রস। এই পাঁচ রসে পরমকে পাঁচভাবে পাওয়া যায়। চৈতন্যচরিতামৃতে বলছে শান্ত রসে কেবল ‘স্বরূপ জ্ঞান’ হয়। দাস্যে ‘পূর্ণৈশ্বর্য প্রভু জ্ঞান’ হয়। পরমকে নিজের মতো জ্ঞান করা এবং অসংকোচ লালন করার মমতাই হলো ‘সখ্য’। বাৎসল্য হলো পরমকে পাল্য এবং নিজেকে তার পালক মনে করা। আর মধুর রস বা শৃঙ্গার রস হলো যেখানে পরম ‘কান্তভাবে নিজ অঙ্গে করান সেবন।।’

কিন্তু উনিশ শতকে বন্ধুত্ব সম্পর্কে ভাবনা করা হলো নতুন কায়দায়। নতুন নানা গরজ মাথায় নিয়ে বন্ধুত্বকে বিবেচনা করা শুরু হলো। কারণ বন্ধুত্বের পুরাতন যেসব দস্তুর ছিল, সেগুলো নতুন জমানার ভদ্রলোকের কাছে ছিল অপচয় ও অবক্ষয়ের এলাকা। বাংলায় ইয়ার্কি কথাটা বোঝাত বন্ধুত্ব, কিন্তু নতুন যুগের ভাষায় তা একধরনের মশকারা ও অপচয়ী আচরণ বোঝানো শুরু করল।

অপচয়ী বন্ধুত্ব বা ইয়ার্কির কাহিনি পাওয়া যায় প্যারীচাঁদ মিত্রের আলালের ঘরের দুলাল উপন্যাসে। এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মতিলাল বাপের সম্পত্তি পাওয়ার পর তার আশকারা পেয়ে ‘পাড়ার যত হতভাগা লক্ষ্মীছাড়া—উনপাজুরে—বরাখুরে ছোঁড়ারা’ তার সঙ্গে জুটল। প্যারীচাঁদের নব্য-ভদ্রলোকি চাহনিতে এই বন্ধুত্বকে দঙ্গল বা গ্যাং বলে মনে হয়েছে। ‘সন্ধ্যার পর বাবুরা দঙ্গল বাঁধিয়া বাহির হন’। তারা কারও বাড়িতে লুটতরাজ, ‘কাহারো কানাচে আগুন’ দেন, ‘কোন বেশ্যার বাটীতে গিয়া শোর সরাবত করিয়া তাহার কেশ ধরিয়া টানেন বা মশারি পোড়ান কিম্বা কাপড় ও গহনা চুরি করিয়া আনেন—নয়তো কোন কুলকামিনীর ধর্ম্ম নষ্ট করিতে চেষ্টা পান।’ হট্টগোল, হোহো হাসির গররা, ‘তামাক-চরস গাঁজার ছররা’, চুরি, অনর্থক মারপিট, দাঙ্গা-হাঙ্গাম ইত্যাদি তো চলেই। এই গ্যাং সমাজে প্রচলিত আনন্দের যেব ধরন আমল করে, প্যারীচাঁদের কাছে সেগুলোও বদমায়েশি বলে প্রতিপন্ন হলো—যেমন বনভোজন, যাত্রার দলে আকড়া, পাঁচালির দল, সকের কবিওয়ালদিগের সঙ্গে দেওরা দেওরা করিয়া চেঁচানো, বারওয়ারি পূজার জন্য দৌড়াদৌড়ি, খেম্‌টার নাচ দেখিতে বসা ইত্যাদি। প্রচলিত সমাজের সাংস্কৃতিক নানা প্রকরণকে এভাবে প্রায় নির্বিশেষেই অপচয়মূলক আকারে শনাক্ত করলেন নব্য ভদ্রলোক প্যারীচাঁদ।

সমাজে তখন উপনিবেশি অর্থনীতির যে বিস্তার, বণিক-মুৎসদ্দি ও জমিদার শ্রেণির হাতে অর্থকড়ির সমাগম, তারই সাপেক্ষে নতুন এক অর্থনৈতিক প্রজ্ঞার উদয় ঘটছিল, যেই প্রজ্ঞার বিচারে পুরাতন ধরনের ইয়ার-সাগরেদি সম্পর্ক অপচয়ী। ঈশ্বর গুপ্তের কবিতায় দেখা যায়, বন্ধুত্বকে তিনি এমন এক পরমার্থ মনে করছেন যা ধন বা অর্থনৈতিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে। ধনে সবকিছু মেলে, ‘কিন্তু ধনে বন্ধুরত্ন নাহি মিলে ভাই।’

মতিলালের যখন অর্থাভাব হলো, তখন তার বন্ধুরা কেটে পড়ল। ‘তাহারা আমোদ-প্রমোদ ও অর্থের অনুরোধে আত্মীয়তা দেখাত—বস্তুত মতিলালের প্রতি তাহাদের কিছুমাত্র আন্তরিক স্নেহ ছিল না।’ তারা ‘মনে করিল উহার সঙ্গে প্রণয় রাখার কি ফল?’ ‘মতিলাল বিরক্ত হইয়া বলিলেন—বিপদেই বন্ধু টের পাওয়া যায়, এতদিনের পর আমি তোমাদিগকে চিন্‌লাম’। কিশোর গ্যাং ও টিকটকার নিয়ে আমাদের যুগে যে সাংস্কৃতিক উদ্বেগ দেখা যায়, সেকালে এই অপচয়ী কিশোর-তরুণ নিয়েও ভদ্রবিত্ত ছিল উদ্বিগ্ন।

এই সব অপচয়ী বন্ধুর ক্ষতিকর সহবাসের বিপরীতে প্যারীচাঁদের প্রকল্প হলো শিশুকিশোরদের সৎ সহবাসে অভ্যাস করানো। ‘মনের ভাবের চালনা সৎলোকের সহবাসে যেমন হয়, তেমন শিক্ষা দ্বারা হয় না।’ তার মানে বন্ধুত্বের মানদণ্ড হয়ে উঠছে তা শিশুকিশোরের মনের গঠনে কতটুকু উপযোগী। এভাবে উপনিবেশি যুগের নতুন অর্থনৈতিক প্রজ্ঞা অনুযায়ী নতুন ধরনের বান্দাগঠনের যে আদব, সেখান থেকেই বন্ধুত্বেরও উপযোগবাদী পুনর্গঠনের তাগিদ অনুভূত হলো।

খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এই উপযোগবাদী বন্ধুত্বে আস্থাশীল ছিলেন। তিনি মামুলি আরামের সম্পর্ককে বন্ধুত্ব বলেছেন আর আদর্শ সম্পর্ককে বলেছেন ভালোবাসা। ১৮৮৩ সালে, ২২ বছরের জোয়ান রবীন্দ্রনাথ বিবিধ প্রসঙ্গ নামে একটি বই লেখেন। সেখানে তিনি ভালোবাসা ও বন্ধুত্বকে আলাদা করেন। বন্ধুত্ব মামুলি ও জাগতিক। আর ভালোবাসা দুজনের একান্ত ও মহৎ সম্পর্ক। বন্ধুত্ব বাজারি, আর ভালোবাসা ‘মনের বাগান বাড়ি’। একটা আরাম ও অভ্যাসের, আরেকটা সাধনার। ‘বন্ধুত্ব আটপৌরে, ভালবাসা পোষাকী।’ বন্ধুরা ‘হীন প্রমোদে লিপ্ত’ হলে অসুবিধা হয় না, কিন্তু ভালোবাসার পাত্র ‘আমাদের সৌন্দর্যের আদর্শ হইয়া থাক্ এই আমাদের ইচ্ছা।’

রবীন্দ্রনাথ এই আদর্শ বন্ধু বা ভালোবাসার পাত্রের সঙ্গে সম্পর্ককে নিজের গঠনের জায়গা থেকে দেখেছেন। তার ভাষায়, ‘সর্ব্বাপেক্ষা আত্মীয় “নিজের” নিকটে স্বভাবতঃ অনেকটা গোপন করিতে হয়। না করিলে চলে না, না করিলে মঙ্গল নাই।’ একেই ফ্রয়েডীয় ভাষায় হয়তো আদর্শ-অহং (আইডিয়াল ইগো) বলে। আর এই আদর্শ অহং যেমন নিজের কলুষ ধামাচাপা দেয়, তেমনি এমন আদর্শ বন্ধু চাই, এমন অহংয়ের আদর্শ (ইগো-আইডিয়াল) চাই যার সাপেক্ষে পরস্পরের কলুষ ধামাচাপা দেওয়া থাকবে। 

এমন আদর্শ বন্ধু কীরকম? হাটবাজারের মামুলি-কেজো সম্পর্কের বাইরে কোনো একজনের সঙ্গে এমন এক আদর্শ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে, যে ‘তাহার সঙ্গে আমার অন্য কোন কাজ কর্ম্মের সম্পর্ক নাই, কেনা বেচার সম্বন্ধ নাই, দলিল দস্তাবেজের আত্মীয়তা নাই। আমি তাহার নিকট আদর্শ সে আমার নিকট আদর্শ।’ রবীন্দ্রনাথের মতে, আদর্শ ভালোবাসায় নিজের সবটুকু প্রকাশ করতে নাই। প্রণয়ীর কাছে নিজের সেরা রূপ তুলে ধরতে হবে। সেও তার সেরা রূপ তুলে ধরবে।

এই পারস্পরিক প্রযত্ন-মূলক (কিউরেটেড) সম্পর্ককে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন মনের বাগান বাড়ি। ‘এ বাগানের কাছে কদর্য্য কিছুই নাই, দুর্গন্ধ কিছুই নাই। ... সে স্থানে অস্বাস্থ্যজনক দূষিত কিছু না থাকে যেন, যদি থাকে তাহা আবৃত করিয়া রাখিও।’

বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার এই উপযোগবাদী নির্মিতি অনুসারে কাউকে ভালোবাসার সহি কারণ থাকলে তবেই ভালোবাসা উচিত। অর্থাৎ গুণ থাকলে ভালোবাসা যায়, নইলে নয়। রবীন্দ্রনাথ ‘আদর্শ ভালবাসা’ প্রবন্ধে লিখেছেন অভ্যাসের জুড়ে থাকা ভালোবাসা নয়। প্রণয়ের পাত্র নীচ হলেও তাকে আঁকড়ে থাকাকে লোকে ‘প্রণয়ের পরাকাষ্ঠা’ মনে করলেও রবীন্দ্রনাথ একে ‘অপদার্থ দুর্ব্বল-হৃদয়ে’র পরিচয় সাব্যস্ত করেছেন। ক্রীতদাস বা কুকুরেরা যেভাবে খারাপ প্রভুর প্রতিও অনুগত থাকে, সেটাকে তিনি ভালোবাসা মানেন না। তার মতে ‘আদর্শ প্রণয়ী প্রকৃত সৌন্দর্য্যকে ভালবাসেন, মহত্বকে ভালবাসেন; তাঁহার হৃদয়ের মধ্যে যে আদর্শ ভাব জাগিতেছে, তাহারই প্রতিমাকে ভালবাসেন।’ অহংয়ের স্বায়ত্তশাসন তার কাছে জরুরি। ‘প্রকৃত প্রণয় স্বাধীন প্রণয়।’

জোয়ান বয়সী রবীন্দ্রনাথের এই বাগান বাড়ি, এই আদর্শ আত্ম ও পর, এই স্বাধীন প্রণয়ের ধারণা—এগুলো এমন এক তপোবন জাতের আদর্শ কল্পনা যা একধরনের নারসিসিস্টিক আত্মপ্রেমের ইমাজিনারি বা কল্প-সেরেস্তা সৃজন করে। সেই উপলব্ধি বুড়া রবীন্দ্রনাথের মালঞ্চ উপন্যাসে পাওয়া যায়। এই উপন্যাসের নায়িকা নীরজা রুগ্‌ণ হওয়ার পর তার আদর্শ ভালোবাসার বাগানে তার আদর্শ বন্ধু-স্বামী পরকীয়ায় রত হয়। নীরজা টের পায় ঈর্ষা ও অক্ষমতায় তার নিজের অন্তর ছোট হয়ে গেছে।

যাই হোক, কেবল সমলিঙ্গীয় খাতির দিয়ে তো দুনিয়া চলে না। নারীপুরুষ বা বিষমলিঙ্গীয় সম্পর্কেও অদলবদল ঘটছে উপনিবেশি কলকাতাকেন্দ্রিক ভদ্রবিত্ত সমাজে। সমাজে যত দিন লিঙ্গীয় পরিসর-বিভাজন প্রবল ছিল তত দিন সম্পর্কের বিন্যাসও ছিল সেইরকম। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় :
‘এক মহলে গার্হস্থ্য, আর এক মহলে ইয়ার্কি। অর্থাৎ এক মহলে দশকর্ম, আর-এক মহলে একাদশ অকর্ম। ঘরে আছেন ইষ্টদেবতা আর ঘরের গৃহিণী। সেখানে পূজা-অর্চনা, অতিথিসেবা, পালাপার্বণ, ব্রত-উপবাস, কাঙালিবিদায়, ব্রাহ্মণভোজন, পাড়াপড়শি, গুরুপুরোহিত। ইয়ারমহল গৃহসীমার বাইরেই, সেখানে নবাবি আমল, মজলিসি সমারোহে সরগরম। এইখানে আনাগোনা চলত গৃহের প্রত্যন্তপুরবাসিনীদের। তাদের সংসর্গকে তখনকার ধনীরা সহবত শিক্ষার উপায় বলে গণ্য করত।’ (যোগাযোগ)

এই সাবেকি-সামন্তীয় বাস্তবতা, এই লিঙ্গীয় পরিসর-বিভাজন, ‘বাহিরে’র নারীর কাছে সহবত শিক্ষা, এই ইয়ার-মহলের সঙ্গে অপচয়ী হৃদ্যতা বনাম অন্দরমহলের স্ত্রীর সঙ্গে মনের তফাৎ—এই সবকিছুকেই টুটিয়ে দিয়ে উনিশ শতকে নতুন ধরনের জুটি-প্রেম [কম্প্যানিওনেট কাপলডম] উদিত হলো। বাংলায় এর প্রথম গুরুত্বপূর্ণ রূপকার বঙ্কিমচন্দ্র।

বঙ্কিমই স্ত্রীপুরুষের কম্প্যানিওনেট প্রেম বা জুটিপ্রেমকে প্রেমের দস্তুর আকারে কেন্দ্রে স্থাপন করলেন। নারীপুরুষকে যা ভিন্নতার দ্বারা যুক্ত করে তা হলো কাম। বঙ্কিম রূপের মোহ বা কামকে সংসারের ইষ্টসাধক বলে স্বীকার করেছেন, কিন্তু তাকে প্রণয় বলে স্বীকার করেননি। এমনকি বাংলার বৈষ্ণব তত্ত্বে রাধা-কৃষ্ণ রূপকে প্রেমকে বোঝার যে সিলসিলা, বঙ্কিম সেখানে রাধার ধারণাকেই অনেকটা গুম ও গায়েব করে দিয়েছেন।

ব্যাটা ও বেটির মধ্যে কাম বা শৃঙ্গার হলো ভিন্ন হয়ে যুক্ত হওয়ার পন্থা। আর তাদের অভিন্নতার দ্বারা যুক্ত হওয়ার পথ হলো বুদ্ধি। বঙ্কিম বলছেন, ‘প্রেম বুদ্ধিবৃত্তিমূলক। প্রণয়াস্পদ ব্যক্তির গুণ সকল যখন বুদ্ধিবৃত্তিদ্বারা পরিগৃহীত হয়, হৃদয় সেই সকল গুণে মুগ্ধ. হইয়া তৎপ্রতি সমাকৃষ্ট এবং সঞ্চালিত হয়, তখন সেই গুণাধারের সংসর্গলিপা, এবং তৎপ্রতি ভক্তি জন্মে। ইহার ফল, সহৃদয়তা, এবং পরিণামে আত্মবিস্মৃতি ও আত্মবিসর্জন। এই যথার্থ প্রণয়; ... ইহা রূপে জন্মে না।’ বঙ্কিম এই যে বুদ্ধিকে প্রণয়ের বনিয়াদে রেখেছেন—হোক তা স্ত্রীপুরুষের ভালোবাসা বা অন্য বন্ধুত্বের ভালোবাসা—সেটা গুরুত্বপূর্ণ একটা মোচড়। কেন? কারণ এখানে দুইজন মানুষ পরস্পরের গুণগ্রাহিতা থেকে প্রণয়ে উপনীত হচ্ছে। গুণ থেকে সংসর্গ আর সংসর্গ থেকে পারস্পরিক প্রণয়ের বিকাশ।

বঙ্কিমে এভাবে বুদ্ধি থেকে হৃদয়ের রাস্তা ধরেছেন। গুণগ্রাহী প্রণয়কে বড় করে তুলছেন। আর রবীন্দ্রনাথে এসে সখ্যরূপ প্রণয় হয়ে উঠছে মধুর প্রেমের বনিয়াদ। এর প্রমাণ দেখা যাবে শব্দের ব্যবহারে। বৈষ্ণব চিন্তায় সচরাচর সখা পুরুষের সমলিঙ্গীয় বন্ধু আর সখী নারীর সমলিঙ্গীয় বন্ধু। রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গানে ‘সখা’ বা ‘সখী’ শব্দ প্রায়ই বিষমলিঙ্গীয় প্রেমাস্পদের প্রতি সম্বোধন—সব জায়গায় না হলেও বহু জায়গাতেই, যেমন ‘গোপনে তোমারে সখা কত ভালবাসি’, কিংবা ‘সখী, বলো দেখি লো, নিরদয় লাজ তোর টুটিবে কি লো,’ ইত্যাদি।

সখ্য থেকে মধুর প্রেমের উদয়—এটাই রোমান্টিক উনিশশতকি ভদ্রলোকি প্রেমের নতুন আদর্শ। বিবাহপূর্ব সখ্য, প্রেম, কোর্টশিপ ইত্যাদির সুযোগ অবশ্য সেকালের সমাজে সীমিত ছিল। নীরদচন্দ্র চৌধুরী লিখেছেন যে বাঙালি প্রেম বা কোর্টশিপ করত বিয়ের পরে।

বঙ্কিম বা রবীন্দ্রনাথের হাতে এই যে জুটি-প্রেম ও সখ্য-মধুর প্রণয়কে বিষমলিঙ্গীয় প্রণয়ের প্যারাডাইম বানানোর প্রচেষ্টা, সেই প্রকল্প বাস্তবায়নের শর্ত ছিল নারী-পুরুষের মানসিক সাযুজ্য গঠন। বঙ্কিমের স্যাটায়ারে বা গোলাম মুরশিদের গবেষণায় দেখা যায় হিন্দু ও মুসলমান সমাজে অবরোধ প্রথা, বাল্যবিবাহ, নারীশিক্ষার অভাব ইত্যাদির ফলে বিয়ের আগে বা পরে সখ্য তৈরি বেশ দুরূহ হয়ে উঠেছিল।

উনিশ শতকের এই সখ্য থেকে মধুর প্রেমের পরিগঠনে পুরুষ প্রায়ই উদ্ধারকর্তা আর নারী উদ্ধৃত। সখ্য থেকে মধুর প্রেমের যে উদয়, রবীন্দ্রনাথের এই প্রেমতত্ত্বের এক নমুনা পাওয়া যায় ‘সমাপ্তি’ গল্পে—যেখানে অপূর্ব বলে এক পুরুষ অল্পবয়সী অচন্দ্রচেতন এক বালিকা মৃণ্ময়ীর প্রেমে পড়ে, বিয়ে করে ও ক্রমশ তার সঙ্গে বিবাহ-পরবর্তী সখ্য তৈরির দ্বারা তার ভেতর থেকে ‘মধুর’ প্রেমময় নারীসত্তাকে বের করে নিয়ে আসে।

নারীদের ক্রমবর্ধমান শিক্ষাগ্রহণ ও জনপরিসরে উপস্থিতির ফলে ভদ্রবিত্ত সমাজে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির কিছু পরিবর্তন ঘটে। বাঙালি নারী শিক্ষা-সাহিত্য-জনতৎপরতার মধ্য দিয়ে বিবি বা দাসী থেকে দেবী হয়ে ওঠেন। সখ্যভিত্তিক জুটি-প্রেম বিয়ের আগে বা পরে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হয়ে ওঠে। সখ্য হয়ে ওঠে বিষমলিঙ্গীয় প্রণয়ের প্রচলিত প্রকরণ। উনিশ শতকের শেষের দিকে জন্ম নেওয়া বেগম রোকেয়ার ক্ষুরধার বাহাসি গদ্যে মূলত বাঙালি ও মুসলমান সমাজের নারীদের শিখেপড়ে ও কর্মক্ষেত্রে সক্রিয় হয়ে প্রিয়তমের সঙ্গে সখ্য-মধুর প্রণয় রচনার দ্বারা অর্ধাঙ্গিনী হওয়ার তাগিদ প্রকাশ পাবে।

সখ্য-মধুর প্রণয়কে একপতিপত্নীক বিয়ের ছকে লগ্নি করে সেই সম্পর্ককেই মানুষের যাবতীয় অন্তরঙ্গ রাগানুগ সম্পর্কের পরাকাষ্ঠা হিসাবে সাব্যস্ত করার যে আদর্শ, যে পরিণামবাদ—তার সংকটগুলো অবশ্য নাঙ্গা হয়ে উঠবে অনেক পরে।

হালজমানার বাস্তবতায় সমলিঙ্গীয় ও বিষমলিঙ্গীয় বন্ধুত্ব ও সম্পর্কে নয়া নয়া সংকটের উদয় ঘটেছে। পরনোগ্রাফিক দৃশ্য-পরিসরে কামনার একধরনের অত্যুগ্র প্রস্থাপন [প্রস্থেসিস] নারীপুরুষ সম্পর্কে সখ্য বা সহৃদয় প্রণয়ের আদর্শকে ফের দুরূহ করে তোলে। আর আখেরি পুঁজিবাদ মানুষকে যেভাবে আণবিক ও বিপন্ন করে তুলছে, তার ভেতর বন্ধুত্বের নাজুকতাই নিখিল সত্য হয়ে উঠছে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত