ধাতব যুদ্ধবিমানের শব্দ, বোমাবৃষ্টি, ছিটকে পড়া সৈনিকের মৃতদেহ। আমার কান বধির করে দিচ্ছে, চিত্ত অসাড়, বাতাসে লাশের গন্ধ। আমি এগোচ্ছি রণাঙ্গনের দিকে। এই সেই পশ্চিম সীমান্ত, যেখানে ১৯১৮ সালের অক্টোবরের অপেক্ষাকৃত এক শান্ত দিনে তিনি মারা যান। পুরো সীমান্তে সেদিন এতটাই নিস্তব্ধতা বিরাজ করছিল যে, সামরিক বয়ানে শুধু একটি বাক্যই লেখা হয় : ‘পশ্চিম সীমান্তের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ শান্ত।’ তিনি মাটিতে এমনভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছিলেন যেন মনে হচ্ছিল ঘুমাচ্ছেন। তার মুখটা ঘুরিয়ে দেখার পর বোঝা গেল, খুব বেশি সময় ধরে তাকে যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়নি। তার মুখে ছিল এক ধরনের পরম প্রশান্তির ছায়া, যেন জীবনের শেষ দিনটি এসেছে বলে স্বস্তি পাচ্ছেন।
রেমার্কের এই বিখ্যাত উপন্যাসের শেষ অনুচ্ছেদটি কেবল অজ্ঞাতপরিচয় সৈনিকের মৃত্যুর নিষ্ঠুর বিদ্রুপকেই ফুটিয়ে তোলে না, বরং যুদ্ধকালীন সামরিক বয়ানের ভণ্ডামিকেও প্রকাশ করে, যে বয়ানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আহত ও নিহত হলেও বলা হতো, ‘নতুন কোনো সংবাদ নেই’।
উপন্যাসটির দৃশ্যপটে রয়েছে অজানা সৈনিকরা আর কেন্দ্রবিন্দুতে পল বাউমার এবং তার সহযোদ্ধারা। রণক্ষেত্রের পাঁচ মাইল পেছনে উপন্যাসটির গল্প শুরু হয়। যুদ্ধে ১৪ দিন কাটানোর পর সৈনিকরা তখন ‘বিশ্রামে’। যুদ্ধে যাওয়া ১৫০ জনের মধ্যে ফিরে এসেছে মাত্র ৮০ জন। গল্পের শুরুতেই মোহভঙ্গের সুর ও মূল উপজীব্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পল বলছে, আমাদের মতো ১৮ বছরের তরুণদের জন্য বয়স্কদের হওয়া উচিত ছিল পথপ্রদর্শক ও অভিভাবক। কিন্তু যুদ্ধে আমাদের দেখা প্রথম মৃত্যু এই বিশ্বাস ভেঙে চুরমার করে দিল।
উপন্যাসের প্রথম কয়েকটি অধ্যায়ে সৈনিকদের জীবনের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। যুদ্ধে নতুন নতুন কফিনের পাহাড় জমে ওঠে। শত্রুপক্ষের কামান যখন গর্জে ওঠে, কেঁপে ওঠে চারপাশ। গোলার আঘাতে পরিখা ও কংক্রিটের দেয়াল ধসে পড়ে। একজন সৈনিক মানসিকভাবে ভেঙে পড়লেও তাকে জোর করে আটকে রাখতে হয়।
ভিন্ন এক পরিস্থিতিতে যুদ্ধের ভয়াবহতার ব্যক্তিক প্রকাশ ঘটেছে এই উপন্যাসে। কামানের গোলা আর শব্দের মধ্যে পল একটি গর্তে লুকায়। আতঙ্কে সে ছুরি দিয়ে এক ফরাসি সৈনিককে আঘাত করে। পরে সেই রক্তাক্ত ফরাসি সৈনিকের ক্ষত সে বাঁধার চেষ্টা করে এবং অপরাধবোধে দগ্ধ হতে থাকে : ‘আমি ভেবেছিলাম তোমার গ্রেনেড, বেয়োনেট আর রাইফেলের কথা; কিন্তু এখন দেখছি তোমার স্ত্রী, তোমার মুখ আর আমাদের ভেতরের মানুষটিকে। আমাকে ক্ষমা করো, কমরেড। আমরা সবসময় বড্ড দেরিতে সত্যটা বুঝতে পারি।’
এদিকে রণাঙ্গনে যুদ্ধ চলছে, ঘটছে মৃত্যু। একের পর এক সহযোদ্ধারা প্রাণ হারাচ্ছে। শরৎকালে শান্তি ও যুদ্ধবিরতির কথা শোনা গেল। কিন্তু পল ভাবতে থাকে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা। করুণ মৃত্যুর মধ্য দিয়ে উপন্যাসটি শেষ হয়।
নিষিদ্ধের ইতিবৃত্ত
১৯২৮ সালে জার্মানিতে যখন অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট প্রকাশিত হয়, তার আগেই ন্যাশনাল সোশ্যালিজম (নাৎসিবাদ) একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছিল। যুদ্ধের এক দশক পর সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই উপন্যাসটি ব্যাপক সাড়া ফেলে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রকাশিত হওয়ার আগেই এর ৬,০০,০০০ কপি বিক্রি হয়ে যায়, একই সঙ্গে বিপুল ক্ষোভেরও জন্ম দেয়। এটি ন্যাশনাল সোশ্যালিস্টদের ক্ষুব্ধ করেছিল সবচেয়ে বেশি। তারা মনে করেছিল, উপন্যাসটি তাদের দেশপ্রেম ও আদর্শের পরিপন্থি। এই ক্ষোভ থেকে উপন্যাসটির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রচারণাও শুরু হয়। ১৯৩০ সালে জার্মানিতে উপন্যাসটি নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৩৩ সালে রেমার্কের লেখা সব বই ইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে থাকা জার্মানির এক বই-বহ্ন্যুৎসবের শিকার হয়।
ওই বছরের ১০ মে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা ইহুদি লেখকদের ২৫,০০০ বই পুড়িয়ে দেয়। ৪০,০০০ ‘উত্তেজনাহীন’ নিস্পৃহ নিরুদ্বিগ্ন মানুষ তাকিয়ে তাকিয়ে সেই দৃশ্য দেখেন। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও একই ধরনের বিক্ষোভ হয়। মিউনিখে ৫,০০০ শিশু মার্কসবাদী এবং অজার্মান বই পোড়ানোতে অংশ নেয়।
রেমার্ক তার বইয়ের বিরুদ্ধে এ ধরনের হিংসাত্মক আক্রমণে দমে যাননি, কিন্তু তাকে দেশ ত্যাগ করতে হয়। নাৎসিদের হয়রানি থেকে বাঁচতে ১৯৩২ সালে তিনি প্রথমে সুইজারল্যান্ডে এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান।
নির্মম কূটাভাস হচ্ছে, ইউরোপের কয়েকটি দেশে বইটি নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯২৯ সালে অস্ট্রিয়ার সৈন্যদের বইটি পড়তে দেওয়া হয়নি। চেকোস্লোভাকিয়ার সামরিক লাইব্রেরিতে এটি রাখা নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৩৩ সালে ইতালিতে যুদ্ধবিরোধী বলে এর অনুবাদ নিষিদ্ধ হয়ে যায়।
১৯২৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ‘লিটল, ব্রাউন অ্যান্ড কোম্পানি’ নামক প্রকাশনা সংস্থা ‘বুক-অফ-দ্য-মান্থ ক্লাব’-এর বিচারকদের পরামর্শে এর কোনো কোনো অংশ বদলে ফেলে। বিচারকরা তিনটি শব্দ, পাঁচটি বাক্য এবং দুটি সম্পূর্ণ অংশ বাদ দেন—এর মধ্যে দুই বছর ধরে বিচ্ছিন্ন থাকা এক দম্পতির শারীরিক মিলনে লিপ্ত হওয়ার দৃশ্যও আছে। প্রকাশকরা যুক্তি দিয়ে বলেছিলেন, এই উপন্যাসের কিছু শব্দ ও বাক্য অনেক খোলামেলা, অর্থাৎ অশ্লীল। কোনো ধরনের আইনি দ্বন্দ্বে তারা জড়াতে চাননি।
আরেক ধরনের সেন্সরশিপের কথা রেমার্ক নিজেই বলেছিলেন। ইউরোপজুড়ে বিপুল সফলতা পাওয়ার পরও ১৯২৯ সালে পুটনামস প্রকাশন সংস্থা বইটি ছাপতে অস্বীকৃতি জানায়। কয়েক দশক পর রেমার্ক এক মন্তব্যে বলেন, ‘কোনো এক নির্বোধ লোক না কি বলেছিল, সে কোনো ‘হান’-এর (জার্মানদের প্রতি ব্যবহৃত গালি) বই প্রকাশ করবে না।’
কিছুটা পরিবর্তিত ও খণ্ডিত হয়ে পড়া সত্ত্বেও ১৯২৯ সালে বোস্টনে অশ্লীলতার অভিযোগে বইটি নিষিদ্ধ করা হয়। একই বছর শিকাগোতে মার্কিন শুল্ক বিভাগ ইংরেজি অনুবাদের কপিগুলো বাজেয়াপ্ত করে। লি বুরেস তার ব্যাটল অব দ্য বুকস : লিটেরারি সেন্সরশিপ ইন দ্য পাবলিক স্কুলস (১৯৫০-১৯৮৫) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘অতিরিক্ত সহিংস’ এবং যুদ্ধকে ‘নৃশংস ও অমানবিক’ হিসেবে চিত্রায়িত করার অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্রে উপন্যাসটির তীব্র বিরোধিতা করা হয়েছিল।
পিপল ফর দ্য আমেরিকান ওয়ের বার্ষিক বিদ্যালয় সেন্সরশিপ জরিপ : অ্যাটাকস অন ফ্রিডম টু লার্ন, ১৯৮৭-১৯৮৮ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই উপন্যাসের বিরুদ্ধে ‘অশালীন ভাষা’ ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়। আসল কথা হলো, সেন্সরকারীরা তাদের কৌশল বদলে ফেলে। ‘গ্লোবালিজম’ বা ‘উগ্র-ডানপন্থিদের আতঙ্ক সৃষ্টিকারী শব্দে’র মতো সনাতন অভিযোগের পরিবর্তে তারা ‘এখন অশ্লীলতা বা ঘৃণা উদ্রেক করার অজুহাত ব্যবহার করছে। জরিপে সেন্সরশিপের ইতিহাসে রেমার্কের উপন্যাসকে সবচেয়ে বেশি সেন্সর করা’ বইগুলোর একটি বলে উল্লেখ করা হয়।
নিষিদ্ধ শব্দবাণ
অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট
‘নিষিদ্ধ শব্দবাণ’ বিশ্বসাহিত্যের সেইসব বইয়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, যেগুলো কোনো না কোনো সময়ে রাষ্ট্র, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, মতাদর্শিক গোষ্ঠী কিংবা সামাজিক রক্ষণশীলতার কারণে নিষিদ্ধ, বিতর্কিত বা দমনের শিকার হয়েছিল। প্রতিটি পর্বে তুলে ধরা হবে একটি বইয়ের প্রকাশ-ইতিহাস, নিষিদ্ধ হওয়ার প্রেক্ষাপট এবং সময়ের সঙ্গে তার সাহিত্যিক ও বৌদ্ধিক গুরুত্বের পুনর্মূল্যায়নের গল্প
নিষিদ্ধ শব্দবাণ-১
জিভাগোর ইতিকথা
নিষিদ্ধ শব্দবাণ-২
লেডি চ্যাটার্লিজ লাভার
নিষিদ্ধ শব্দবাণ-৩
লোলিতা
নিষিদ্ধ শব্দবাণ-৪
দ্য ম্যানিফেস্টো অব দ্য কমিউনিস্ট পার্টি
মাসুদুজ্জামান
প্রকাশ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৯ এএম
আপডেট : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৯ এএম
গ্রাফিক্স : দেশ রূপান্তর
এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
- ১
- ২
- ৩
- ৪
- ৫
- ৬
- ৭
- ৮
- ৯
- ১০
- ১
- ২
- ৩
- ৪
- ৫
- ৬
- ৭
- ৮
- ৯
- ১০