আত্তারের কবিতায় দুনিয়ার তুচ্ছতা

মানুষের ভেতর অনেক সম্ভাবনা থাকে। অধিকাংশ মানুষ সেই সম্ভাবনার বিষয়ে অনুধাবনই করতে পারে না। সামান্য প্রাপ্তিতেই সন্তুষ্ট হয়ে যায়। ক্ষণস্থায়ী সুখকে স্থায়ী অর্জন মনে করে। দুনিয়ার চাকচিক্যে মুগ্ধ হয়ে নিজের আত্মার আহ্বান ভুলে বসে। অথচ মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার আত্মা। সেই আত্মাকে জাগিয়ে তোলার জন্যই যুগে যুগে বহু আল্লাহ ভীরু সাধক ও সুফি কবি মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য। তাদের অন্যতম ফরিদ উদ্দিন আত্তার।

বিশ^ বিখ্যাত কবি ফরিদ উদ্দিন আত্তার তার ‘মুখতার নামা’ কাব্যগ্রন্থে লিখেছেন, ‘হে মানুষ! কেন কুকুরের মতো একটি শুকনো হাড়েই তৃপ্ত হয়ে আছ? আর কতকাল এই ধূলিময় পৃথিবীকেই চূড়ান্ত ঠিকানা মনে করবে? তোমার প্রতিটি নিঃশ^াসে লুকিয়ে আছে হাজারো জীবনের সম্ভাবনা। তবে কেন তুমি আত্মার সেই অসীম জীবন ছেড়ে অর্ধেক জীবনেই সন্তুষ্ট থাকবে?’

এই কবিতার প্রতিটি পঙ্্ক্তি রূপক ও ইঙ্গিতে ভরপুর। প্রথমেই এসেছে শুকনো হাড়ের উপমা। গোশত ছাড়া শুকনো হাড়ে কোনো খাদ্য থাকে না। তবুও কুকুর সেটি পেয়ে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যায়। ঠিক তেমনই মানুষ অনেক সময় অল্প কিছু সম্পদ, সম্মান কিংবা ভোগবিলাসকে জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন মনে করে। অথচ এগুলো ক্ষণস্থায়ী। এগুলো কখনো আত্মার প্রকৃত তৃপ্তি দিতে পারে না।

এরপর কবি পৃথিবীকে ধূলাবালির ঘর হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই দুনিয়া চিরস্থায়ী নয়। মানুষ এখানে সাময়িক অতিথি। কিন্তু সে এই অস্থায়ী জগৎকেই নিজের স্থায়ী নিবাস ভেবে বসে। ফলে আখেরাতের প্রস্তুতি এবং আত্মার বিকাশের কথা ভুলে যায়।

সবচেয়ে গভীর উপমা এসেছে শেষ দুই পঙ্ক্তিতে। কবি বলেছেন, মানুষের প্রতিটি নিঃশ্বাসে হাজারো প্রাণ রয়েছে। অর্থাৎ প্রতিটি মুহূর্তেই মানুষ আল্লাহর নৈকট্য লাভ, আত্মশুদ্ধি এবং আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের নতুন সুযোগ পায়। কিন্তু সে যদি কেবল খাওয়া, ঘুম, ভোগ আর দুনিয়ার প্রতিযোগিতাতেই জীবন সীমাবদ্ধ রাখে, তবে সেটি পূর্ণ জীবন নয়। সেটি অর্ধেক জীবন মাত্র। প্রকৃত জীবন হলো আত্মার জাগরণ। আল্লাহর পরিচয় লাভের চেষ্টা। নেক আমলের মাধ্যমে অনন্ত জীবনের প্রস্তুতি।

পবিত্র কোরআনের সঙ্গে এই ভাবনার গভীর মিল রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘পার্থিব জীবন তো খেলাধুলা ও তামাশা ছাড়া কিছুই নয়। আর যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তাদের জন্য আখেরাতের আবাসই উত্তম। তোমরা কি বুঝো না?’ (সুরা আনআম ৩২)

মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে গাফেল করে রেখেছে। অবশেষে (এ অবস্থাতেই) তোমরা কবরে উপনীত হয়েছ।’ (সুরা তাকাছুর ১-২)

হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুনিয়ার প্রকৃত মূল্য বোঝাতে বলেছেন, ‘আখেরাতের তুলনায় দুনিয়ার উদাহরণ হলো, তোমাদের কেউ সমুদ্রে একটি আঙুল ডুবিয়ে দেখুক, সেটি কতটুকু পানি নিয়ে ফিরে আসে।’ (সহিহ মুসলিম)

অপর হাদিসে তিনি বলেন, ‘তুমি দুনিয়াতে এমনভাবে বসবাস করো, যেন তুমি একজন অপরিচিত ব্যক্তি অথবা একজন পথচারী।’ (সহিহ বুখারি)

ফরিদ উদ্দিন আত্তারের কবিতাটি আমাদের একটি বড় প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। আমরা কি সত্যিই পূর্ণ জীবনযাপন করছি, নাকি কেবল অর্ধেক জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট আছি? আমরা কি শুকনো হাড়ের মতো ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার পেছনে ছুটছি, নাকি আত্মার অনন্ত যাত্রার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করছি? এই প্রশ্নের উত্তরই মানুষের জীবনের প্রকৃত দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে।

আসুন, এ বিষয়ে আমরা একটু চিন্তা-ভাবনা করে দেখি। মহান আল্লাহ আমাদের যে কারণে দুনিয়ায় পাঠিয়েছেন, আমরা তা কতটুকু পালন করছি? কোরআন-হাদিসের বিধি-নিষেধ কতটুকু মানছি? আমাদের পরিবারের লোকজন কতটুকু মানছে? আমাদের কিন্তু একদিন সবকিছুর হিসাব দিতে হবে। পরকালে মহান আল্লাহর সামনে দাঁড়াতে হবে। সেটার প্রস্তুতির সময় এখনই। তাই অবহেলায় জীবন না কাটিয়ে আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহ করাই মুমিনের কাজ। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সেই তৌফিক দান করুন। আমিন।