চোখ হৃদয়ের বার্তাবাহক

আপডেট : ০৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:৫৮ এএম

দৃষ্টিশক্তি আল্লাহর দেওয়া মহান নেয়ামত। এর মাধ্যমে মানুষ ভালো ও মন্দকে চিনতে পারে। সুন্দর ও অসুন্দরকে পৃথক করতে পারে। এর মাধ্যমে সে বিপদ থেকে নিজের আত্মরক্ষা ও ক্ষতি প্রতিরোধ করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি কি তাকে দুটি চোখ দান করিনি?’ (সুরা বালাদ ৮)

যে ব্যক্তি অন্ধত্বে আক্রান্ত হয়েও ধৈর্য ধারণ করে, মহান আল্লাহর কাছে সওয়াবের আশা রাখে এবং অবিচল থাকে, তার প্রতিদান অনেক মহান। আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, মহান আল্লাহ বলেন, ‘যখন আমি আমার বান্দাকে তার দুটি প্রিয় বস্তু দ্বারা পরীক্ষা করি, অর্থাৎ তার দুটি চোখ কেড়ে নিই, আর সে ধৈর্য ধারণ করে, তখন আমি তার বিনিময়ে তাকে জান্নাত দান করি।’ (সহিহ বুখারি ৫৬৫৩)

অতএব, দৃষ্টিশক্তি এমন এক নেয়ামত, যা আল্লাহর প্রশংসা, কৃতজ্ঞতা এবং তার অনুগ্রহের আন্তরিক স্বীকৃতি দাবি করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের মাতৃগর্ভ থেকে বের করেছেন এমন অবস্থায় যে, তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি এবং অন্তর দান করেছেন, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।’ (সুরা নাহল ৭৮)

দৃষ্টিশক্তির নেয়ামতের শোকরিয়া আদায়ের অন্যতম উপায় হলো, বান্দা যেন তা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজে ব্যবহার করে, যা তার দ্বীন ও দুনিয়ার উপকারে আসে। সে যেন তার দৃষ্টিকে হারাম থেকে সংযত রাখে এবং গুনাহে পতিত হওয়া থেকে রক্ষা করে। কারণ, দৃষ্টি হলো অন্তরে ফেতনা প্রবেশের সবচেয়ে বড় ও বিপজ্জনক পথ। চোখ হলো অন্তরের বার্তাবাহক। যখন চোখ দেখে, তখন অন্তর আকৃষ্ট হয়। আর যখন অন্তর আকৃষ্ট হয়, তখন প্রবৃত্তি জেগে ওঠে। এরপর একের পর এক চিন্তা আসে, কল্পনা বাড়তে থাকে এবং শয়তানের কুমন্ত্রণা হৃদয়ে ভিড় জমায়।

ইসলাম এসেছে এমন সব উপায় বন্ধ করার জন্য, যা হারামের দিকে নিয়ে যায়। আর ইসলাম শুধু অশ্লীল কাজকেই হারাম ঘোষণা করেনি, বরং এর সব উপায়ও হারাম করেছে এবং এর সব প্রবেশপথও বন্ধ করেছে। তাই আল্লাহর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশ এসেছে হারাম বিষয় থেকে দৃষ্টি সংযত রাখার বিষয়ে। আর লজ্জাস্থান সংরক্ষণের আগে দৃষ্টি সংযত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, কারণ এ দুটির মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘আপনি মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয়ই তারা যা করে, আল্লাহ সে সম্পর্কে সম্যক অবগত। আর মুমিন নারীদেরও বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।’ (সুরা নুর ৩০-৩১)

হারাম দৃষ্টি হলো শয়তানের বিষাক্ত তীরগুলোর একটি। সে এই তীর দ্বারা অন্তরকে বিদ্ধ করে, ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়, নুর নিভিয়ে দেয় এবং অন্ধ করে ফেলে। যখন এই তীর অন্তরে গেঁথে যায়, তখন মানুষ কুপ্রবৃত্তির দাসে পরিণত হয়। তখন সে ভালোকে ভালো মনে করে না এবং মন্দকে মন্দ মনে করে না।

চোখ এমন বস্তুকেও সুন্দর করে তোলে, যা অর্জন করা সম্ভব নয়। এমন বিষয়কেও আকর্ষণীয় করে তোলে, যা বাস্তবে পাওয়া যায় না। ফলে মানুষ কিছু বিষয়ে তার প্রকৃত রূপের বিপরীতে এবং বাস্তবতার বাইরে দেখে। তাই বুদ্ধিমান মানুষের উচিত, লাগামহীনভাবে দৃষ্টি ছেড়ে না দেওয়া। কারণ দৃষ্টি সংযত রাখার কষ্ট, পরবর্তীকালের যন্ত্রণার তুলনায় অনেক সহজ। বিশেষ করে এই যুগে, যখন প্রলোভনের উপকরণ বহুগুণে বেড়ে গেছে, বিভ্রান্তির পথ নানাভাবে বিস্তৃত হয়েছে। এগুলো লাভজনক ব্যবসা এবং বহুল প্রচলিত পণ্যে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন ডিভাইস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং টেলিভিশন চ্যানেলের মাধ্যমে সেগুলো প্রচারিত হচ্ছে। মানুষের অনুমতি ছাড়াই তা ঘরে ঘরে এবং মনে মনে প্রবেশ করছে। সমাজ, সংস্কৃতি ও ধর্মের ভিন্নতার প্রতিও কোনো গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে দৃষ্টি সংযত রাখার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়া কতই না প্রয়োজন। বর্তমান যুগে এটি তাকওয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকাশ।

দৃষ্টি সংযত রাখার বিষয়টি অন্তরকে পবিত্র করে। মানুষকে ইবাদতের প্রতি একাগ্র রাখে। প্রবৃত্তির উপত্যকায় ছুটে বেড়ানো থেকে রক্ষা করে। ফেতনা ও পথভ্রষ্টতা থেকে সংরক্ষণ করে। এর মাধ্যমে বান্দা দেহের প্রশান্তি, আত্মার সুখ, ইমানের মাধুর্য এবং ইবাদতের স্বাদ লাভ করে। আল্লাহ তার জন্য জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দ্বার খুলে দেন। তিনি তাকে অন্তর্দৃষ্টি, সুস্পষ্ট প্রমাণ, সক্ষমতা ও শক্তি দান করেন। তার মধ্যে প্রজ্ঞা, হেদায়েত, বিচক্ষণতা, দূরদর্শিতা, অবিচলতা, সাহস এবং অন্তরের নুর সৃষ্টি করেন। বান্দা যত বেশি হারাম থেকে দৃষ্টি সংযত রাখবে, তার অন্তরে নুরও তত বেশি বৃদ্ধি পাবে।

দৃষ্টি সংযত রাখার আরেকটি ফল হলো, মানুষ তার দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণকর বিষয় নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ পায়। কিন্তু লাগামহীন দৃষ্টি মানুষের চিন্তাকে ছড়িয়ে দেয়, মনকে অস্থির করে, অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে ক্লান্ত করে, তার ওপর বোঝা চাপিয়ে দেয় এবং জীবনের শৃঙ্খলা নষ্ট করে দেয়। তাই জ্ঞানী ও বিচক্ষণ ব্যক্তি সর্বদা কাজের পরিণতি বিবেচনা করে। সে জানে, হারাম দৃষ্টির আনন্দ কয়েক মুহূর্তের, কিন্তু তার অনুশোচনা বহু বছরের। আর আল্লাহর কাছে যা আছে, তাই উত্তম এবং অধিক স্থায়ী।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাদের বিভিন্ন শ্রেণিকে আমি দুনিয়ার জীবনের সৌন্দর্যস্বরূপ যা ভোগের উপকরণ দিয়েছি, তা যেন তুমি লোভের দৃষ্টিতে না দেখ। এগুলোর মাধ্যমে আমি তাদের পরীক্ষা করি। আর তোমার প্রতিপালকের রিজিকই উত্তম এবং অধিক স্থায়ী।’ (সুরা তাহা ১৩১)

হে আল্লাহর বান্দারা! দৃষ্টিকে সংযত রাখতে যে বিষয়গুলো সহায়তা করে, সেগুলো মধ্যে রয়েছে মহান আল্লাহকে ভয় করা, তার শাস্তির আশঙ্কা করা, বেশি বেশি তার কাছে দোয়া করা এবং নিজের নফসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা। যে ব্যক্তি পবিত্রতা অবলম্বন করতে চায়, আল্লাহ তাকে পবিত্র রাখেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোনো কিছু ত্যাগ করে, আল্লাহ তাকে তার চেয়ে উত্তম প্রতিদান দান করেন।

পূর্বসূরি এক নেককারকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, দৃষ্টি সংযত রাখতে কীভাবে সাহায্য পাওয়া যায়? তিনি বলেছিলেন, তুমি এ কথা জেনে রাখবে যে, যাকে তুমি দেখছ তার দিকে তোমার দৃষ্টি পৌঁছানোর আগেই আল্লাহর দৃষ্টি তোমার ওপর রয়েছে।

দৃষ্টি সংযত রাখতে সহায়ক বিষয়গুলোর মধ্যে আরও রয়েছে, মানুষ যেন সন্দেহজনক স্থান, ফেতনা-ফ্যাসাদের পরিবেশ এবং অসৎ লোকদের মজলিস থেকে দূরে থাকে। কারণ ফেতনা মানুষকে দ্রুত গ্রাস করে।

দৃষ্টি সংযত রাখা কোনো বঞ্চনা নয়, বরং এটি সম্মানের বিষয়। এটি কোনো দমন নয়, বরং পবিত্রতা ও দ্বীনের সংরক্ষণ। আপনারা আল্লাহকে ভয় করুন। আপনাদের প্রতিপালক যে বিষয়গুলো হারাম করেছেন, সেগুলো থেকে আপনাদের দৃষ্টি সংযত রাখুন। নির্জনে ও প্রকাশ্যে সর্বদা তার তত্ত্বাবধানে থাকার অনুভূতি রাখুন। কেননা আপনাদের আমল সম্পর্কে অবশ্যই জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই কান, চোখ, অন্তর, এসবের প্রত্যেকটি সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।’ (সুরা ইসরা ৩৬)

৩১ জুলাই শুক্রবার, মসজিদে হারামে প্রদত্ত জুমার খুতবা। সংক্ষিপ্ত অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত