হরমুজের চাবি ইরানের হাতেই

বিশ্ব নৌবাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রস্তাবিত চুক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে ইরান ও ওমান। ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাতে বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, প্রস্তাবিত চুক্তিটি কার্যকর হলে হরমুজ পাড়ি দিয়ে উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেতে পারে তেহরান। গত বুধবার দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাঘাই বলেন, চুক্তিটি এখন ‘চূড়ান্ত পর্যায়ে’ রয়েছে। কিন্তু এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি তিনি। তবে একইসঙ্গে বাঘাই সতর্ক করে বলেছেন, ওমানের সঙ্গে চুক্তি হলেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ নৌচলাচলের নিশ্চয়তা মিলবে না। তার দাবি, ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণে ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো প্রভাবিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাঁচ মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটানোর বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এ চুক্তির আলোচনা চলছে। এই চুক্তি নিয়ে ওমান ও যুক্তরাষ্ট্র এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলা চালানোর পর থেকে তেহরান মূলত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে রেখেছে। বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সাধারণত এই প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হয়। এক বিবৃতিতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের রুটের ‘ভৌগোলিক স্থানাঙ্ক’ নিয়ে ওমানের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনাকে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালিকে অনিরাপদ করে তুলেছে এমন কারণগুলো এখনো বহাল রয়েছে। বিশেষ করে ইরানের বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নৌঅবরোধ এবং ইরান ও এর স্বার্থের বিরুদ্ধে অন্যান্য আগ্রাসী ও হুমকিমূলক পদক্ষেপগুলো কার্যকর থাকায় নিরাপত্তা হুমকি কমেনি। দেশটির উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি ইরানকে বলেন, নতুন এ রুটটি অস্থায়ী হবে এবং দুই থেকে চার মাস পর্যন্ত চালু থাকতে পারে। তবে তিনিও এ বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য দেননি।

রয়টার্সকে ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজের বহন করা পণ্যের মূল্যের ওপর ৫ থেকে ৭ শতাংশ ফি আদায় করতে চায় ইরান। অন্যদিকে ওমান প্রায় ৩ শতাংশ ফি নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনা করছে, আর যুক্তরাষ্ট্র যেকোনো ধরনের ফি আরোপেরই বিরোধিতা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বারবার বলেছেন, বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা ইরানের হাতে দেওয়ার বিষয়ে তারা কখনো সম্মত হবেন না। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা জানান, জাহাজ চলাচল চলতি সপ্তাহের শেষ দিকে পুনরায় শুরু করার লক্ষ্যে আলোচনা এগিয়ে যাচ্ছে। তবে ইরান বরাবরের মতোই দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তারা কোনো আলোচনায় বসেনি এবং এমন কোনো পরিকল্পনাও তাদের নেই। গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, হরমুজ প্রণালি ‘খুব শিগগির’ খুলে না দিলে ইরানকে ‘খুব কঠোরভাবে’ আঘাত করা হবে।

প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজের ওপর ইরান কর্র্তৃত্ব পেলে, গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শুরু করা যুদ্ধের ফলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য তেহরানের পক্ষে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেবে। পাশাপাশি চলমান যুদ্ধে এটি তেহরানের জন্য কৌশলগত বিজয় বলেও গণ্য হবে। কেননা যুদ্ধ শুরুর আগে কোনো ধরনের ফি ছাড়াই সব জাহাজের জন্য প্রণালিটি উন্মুক্ত ছিল। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস ও শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য যুদ্ধ শুরু হলেও, ‘হরমুজ প্রণালি’ এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় চাবিকাঠি হয়ে উঠেছে। মূলত হরমুজ নিয়ে অচলাবস্থার কারণেই আটকে আছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুই দেশ ও মধ্যস্থতাকারীদের আলোচনায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে।

এ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় সংঘাতের পুরো সময়ে জ্বালানির দাম ব্যাপক ওঠানামা করেছে। তবে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর অগ্রগতির খবরে বৃহস্পতিবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম কিছুটা কমেছে। এশিয়ায় দিনের শুরুতে লেনদেনে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম দশমিক ৩ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৯ দশমিক ২৪ ডলারে (প্রায় ৫৮ দশমিক ৮৪ পাউন্ড) নেমে এসেছে। মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্স ফার্ম উইন্ডওয়ার্ড জানিয়েছে, ১২টি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, পারাপার হওয়া এসব জাহাজের মধ্যে ছয়টি আগমনকারী এবং ছয়টি বহির্গামী জাহাজ ছিল। ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের আগে প্রতিদিন এই জলপথ দিয়ে অন্তত ১৪০টি জাহাজ যাতায়াত করত।