প্রকৃতিতে নেই এমন ভাইরাস তৈরি করল এআই

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে প্রথমবারের মতো প্রকৃতিতে নেই এমন নতুন ভাইরাস তৈরি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের একদল গবেষক। এ সাফল্য ভবিষ্যতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। তবে একই সঙ্গে এটি জীবাণু নিরাপত্তা (বায়োসিকিউরিটি) নিয়ে নতুন উদ্বেগও তৈরি করেছে।

বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে জানায়, বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স-এ প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং এমআইটি ও হার্ভার্ডের ব্রড ইনস্টিটিউট-এর গবেষকেরা ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করে এমন এক ধরনের ভাইরাস ব্যাকটেরিওফেজ (ফেজ)-কে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে এআইয়ের মাধ্যমে হাজারো নতুন জিনোম তৈরি করেন। 

এর মধ্যে প্রায় ৩০০টি জিনোম পরীক্ষাগারে রাসায়নিকভাবে তৈরি করে পরীক্ষা চালানো হয়। এতে ১৬টি কার্যকর (ভায়েবল) কৃত্রিম ভাইরাস তৈরি করতে সক্ষম হন গবেষকেরা। 

গবেষণায় দেখা গেছে, এসব কৃত্রিম ভাইরাসের সমন্বয়ে তৈরি মিশ্রণ প্রাকৃতিক ভাইরাসের তুলনায় ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়া ধ্বংসে বেশি কার্যকর ছিল। গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে দ্রুত পরিবর্তনশীল রোগজীবাণুর বিরুদ্ধে আরও কার্যকর ফেজ-ভিত্তিক চিকিৎসা উদ্ভাবনে এ প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।   

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, একই প্রযুক্তি অপব্যবহার করে ক্ষতিকর জীবাণুও তৈরি করা সম্ভব হতে পারে। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ আইজ্যাক বোগোচ বলেন, এআই-নকশা করা ভাইরাস অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণের চিকিৎসায় সহায়ক হতে পারে, কিন্তু একই সক্ষমতা বিপজ্জনক রোগজীবাণু তৈরিতেও ব্যবহৃত হতে পারে। তাই শক্তিশালী নজরদারি ও বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

অস্ট্রেলিয়ার ইউএনএসডব্লিউ স্কুল অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড বায়োমলিকুলার সায়েন্সেস-এর অধ্যাপক ফাতেমেহ ভাফায়ি বলেন, গবেষণায় তৈরি ভাইরাস মানুষের জন্য সরাসরি ঝুঁকিপূর্ণ নয়, কারণ এগুলো শুধু ব্যাকটেরিয়াকে সংক্রমিত করে। তবে এআই এখন এমন ভাইরাস তৈরি করতে সক্ষম এই বাস্তবতাই ভবিষ্যতের জন্য সতর্কতার কারণ।

এদিকে এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের সরকারি এআই সিকিউরিটি ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, নিরাপত্তা মূল্যায়নের সময় অ্যানথ্রপিক ও ওপেনএআই-এর কিছু উন্নত এআই মডেল মানুষের অনুমতি ছাড়াই ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের চেষ্টা করেছিল।

তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করছেন, এআই দিয়ে জটিল ও মানুষের জন্য বিপজ্জনক ভাইরাস তৈরি করা এখনও অনেক দূরের বিষয়। ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন-এর সিনথেটিক জিনোম প্রকৌশল বিশেষজ্ঞ টম এলিস বলেন, গবেষণায় ব্যবহৃত ফেজ ভাইরাসের জিনোম খুবই ছোট ও সহজ। তুলনায় কোভিড-১৯ সৃষ্টিকারী ভাইরাসের জিনোম প্রায় ছয় গুণ বড় এবং সেটির মতো জটিল ভাইরাস এআই দিয়ে তৈরি করা বর্তমানে অনেক বেশি কঠিন।

সিঙ্গাপুরের এশিয়া সেন্টার ফর হেলথ সিকিউরিটি-র পরিচালক হসু লি ইয়াংও বলেন, গবেষণাটি যেমন চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার দিক থেকেও সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে এখন যে কেউ সহজেই পরীক্ষাগারে বিপজ্জনক ভাইরাস তৈরি করতে পারবে।