জুলাই-উত্থানে রবীন্দ্রনাথের অপ্রাসঙ্গিকতার বিষয়ে সাইবার জগতে কমবেশি কিছু আলাপ-মন্তব্য আমার চোখে পড়েছে। একান্তে দু-চারজন প্রশ্নও করে থাকেন বটে। অস্বীকার করব না যে প্রশ্নটা আমার কাছে জবরদস্তিমূলক। চারপাশে রবীন্দ্রবিদ্বেষের ব্যাকরণকে পাঠ করা অতিশয় জরুরি মনে করি আমি; বা যেকোনো সাহিত্যিক-শিল্পীর বিষয়ে বিদ্বেষ নিয়েই। কিন্তু একটা বিশেষ ইভেন্টে বিশেষ কোনো পুরান দিনের সাহিত্যিক-চিন্তক-রাজনীতিকের প্রাসঙ্গিকতার জিজ্ঞাসাটা উদ্বেগপরায়ণ, কুণ্ঠাময়, কৈফিয়ৎমূলক, রক্ষণাত্মক বলে বিবেচনা করি। এটা প্রায় এক সেকেন্ডেই প্রমাণ করা সম্ভব। তার জন্য জনাচারেক র্যান্ডাম পুরান-দিনের-মানুষ বেছে নেব। প্রশ্নটা হবে এ রকম : আচ্ছা জুলাই-আন্দোলনে এঁদের প্রাসঙ্গিকতা কী—মীর মশাররফ হোসেন, আবুল হাশিম, ফররুখ আহমদ, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক? জিয়াউর রহমানের নাম আমি সাহস করে এমনিতেই রাখতাম না। কিন্তু মওলানা ভাসানীর নাম রাখাই যেত। কিন্তু একজন সাবেক-বাম বর্তমান-প্রতিমন্ত্রী অন্তত কয়েকটা সেমিনার-টেমিনার ভাসানীর নামে আশপাশের সময়কালে করে থেকেছিলেন বলে ভাসানী ডিসকোয়ালিফাই করেছেন এই তালিকায়। আমার প্রশ্নটার গড়নেই পরিষ্কার যে এগুলো অজরুরি প্রশ্ন। সম্ভবত, চতুষ্পার্শ্বের রবীন্দ্রবিদ্বেষের মধ্যে যাদের অশান্তি তৈরি হয় তাদের সাফাই-খোঁজারু প্রশ্ন এগুলো।
বিগ্রহ ও রবীন্দ্রগ্রহণ
রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে চতুষ্পার্শ্বের অশান্তি প্রথমত খোদ আইকনকে নিয়ে সাধারণ এবং সাধারণ্যে অশান্তি হিসেবে দেখা দরকার। সেটুকু গোড়াতেই বুঝে না নিলে নানান ধরনের বোঝাবুঝির সমস্যা হবেই। হয়ে আসছে, আগামীতেও হতে থাকবে। তারপর আইকনের সাধারণত্বের সঙ্গে অসাধারণ মানে বিশেষ সাংস্কৃতিক বাতাবরণ যুক্ত হতে থাকে। ভেবে দেখলে, রাজনৈতিক বাতাবরণও বলা যায়। কিন্তু আমি কাজের সুবিধার্থে দক্ষ আমলার মতো আজকে খোঁপ বানিয়ে নিচ্ছি। মানে কিনা বর্গীকরণ। যতটা নির্বোধ হলে রাজনৈতিক আর সাংস্কৃতিক বাতাবরণকে, এমনকি আইকনকে, দুই বর্গে রাখা যেত, ততটা নির্বোধ হওয়া আমার পক্ষে কখনোই সম্ভব নয়। ফলে আমার বর্গীকরণটা বড়জোর আইকনগুলোর উৎপত্তিসূত্র, বিকাশ প্রক্রিয়া ও পেশাজগৎকে আশ্রয় করছে। অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে বা আবুল মনসুর আহমদকে প্রথমত সাংস্কৃতিক বাতাবরণের মধ্যে দেখতে চাই; আবার রাজনৈতিক বাতাবরণ ভুলতে নারাজ। তেমনি, ‘শেরেবাংলা’ এ কে ফজলুল হক কিংবা ‘বঙ্গবন্ধু’ শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রথমত রাজনৈতিক বাতাবরণের মধ্যে দেখতে চাই; কিন্তু কিছুতেই সাংস্কৃতিক ব্যঞ্জনা আপনাদের ভুলে যেতে সুপারিশ করব না। খোঁপ-বানানি আমার পক্ষে তাই নিছকই আলাপ-কাজের একটা সুবিধাগ্রহণ মাত্র, সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানকে নষ্ট হতে না দিয়েই।
এই রচনাটি লেখার চাকরি পাওয়ার আগের দিনই ভারতে প্রচারিত একটা এআই-সৃজিত মিম চোখে পড়ল। জনৈক ভারতীয় রাজার জুতার তলে সুভাষ বসুর মাথা পিষ্ট হচ্ছে। দেখতে কুৎসিত এবং বানানোতে কাঁচা হওয়া সত্ত্বেও এটার প্রেক্ষাপট নিয়ে কৌতূহল হওয়ারই কথা। সেই কৌতূহল মেটাতে গিয়ে বুঝলাম যে, জনৈক বিজেপি সাংসদ জুলাই মাসের মাঝামাঝি সুভাষ বসুকে নিন্দা করেছেন এই বলে যে, তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ব্রিটিশ সৈন্যদের ব্রিটেনের বিরুদ্ধে পরিচালিত করে ‘সুযোগের অপব্যবহার’ করেছেন। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপি এ ধরনের কথাবার্তায় বিব্রত হয়েছে, কিন্তু তৃণমূল পর্যায়ের হাজারে-বিজারে বিজেপি কর্মীদের এটাই ছিল মনের মতো কথা। এতদিন ধরে উদারপন্থী, সমাজতন্ত্রী, সেক্যুলার রাজনীতিকদের পেটাই করার যে বিশদ চর্চা বিজেপি করেছে তাতে যে তৃণমূল পর্যায়ে কোটি কোটি আগ্রাসী রাগী-হিন্দু-জাতীয়তাবাদী-রাষ্ট্রবাদী সৃষ্টি হয়ে বসে আছে তা বলা নেহায়েতই বাহুল্য। বিশ্লেষকরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, ধর্মনিরপেক্ষ জাতীয়তাবাদী, এমনকি সমাজতন্ত্রী, সুভাষ বসুকে নিগৃহীত করার এই সুযোগ মিমকারীরা ছাড়েননি। সামন্তমনস্ক হিন্দুগর্বী রাজার পদতলে সুভাষকে দেখানো তাই একটা ক্রুদ্ধ হিংস্র প্রতিশোধ হিসেবেই দেখা দরকার।
প্রতিশোধ বা প্রতিহিংসা ছাড়া আইকনের সমাজজীবন বা আয়ু বোঝা সম্ভব নয়। যদি নিরীহ কোনো অনুভূতিও খুঁজতে চেষ্টা করি তাহলেও লাগবে প্রতিপক্ষতা। প্রথমেই লোকে রা-রা করতে পারেন, আরে ভক্তির কী হলো! আইকনের নির্মাতা ও গুণগ্রাহীদের বেলায় সেখানে ভক্তিরস মুখ্য। তবে ভক্তিরস ছাড়াও বীররস, বিস্ময় ও করুণরসের সমান অবদান আছে আইকনসৃষ্টিতে; বিগ্রহ বানানোতে। কিন্তু বিগ্রহ বানানো মানেই তা নিগ্রহের মধ্যে পড়তে পারে। পড়ার ঝুঁকিসম্পন্ন। বিগ্রহ বা আইকন বানানোর কারিগরির মধ্যে আছে এমন সব বিশেষায়িত ভক্তিরসের সন্নিবেশন যা নানান বর্গকে বাদ দিতে দিতে তৈরি হয়। বাদ-পড়া বর্গ বিগ্রহকে দেখে তাই প্রতিপক্ষীয় চিহ্ন হিসেবে। এগুলো বিগ্রহনির্মাণ প্রক্রিয়া বা আইকনোগ্রাফির সাধারণ বৈশিষ্ট্য। আইকনোগ্রাফি তাই সততই আইকনোক্ল্যাজমের বীজসমেত প্রবহমান। অর্থাৎ বিগ্রহরঞ্জন খোদ বিগ্রহভঞ্জনের কারিগরিতে উসকানি প্রদান করে। এমনকি, খুব শান্তভাবে চিন্তা করলে, বিগ্রহ নির্মাণের অংশীদার না হয়ে বিগ্রহের অর্চনা করতে গেলেও বড়সড় বিপদ ঘটতে পারে। নিজপক্ষ হয়ে পড়তে পারে ক্রূর, হিংস্র। এর একটা বেশ কর্কশ উদাহরণ আছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর জীবনে। ঘটনাচক্রে রবীন্দ্রনাথকে নিয়েই।
দীর্ঘ বাধ্যতামূলক প্রবাসজীবনে তিনি কমবেশি সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক অর্থপূর্ণ কাজ করার চেষ্টা করেছেন। যা ও যতটা পারতেন সেভাবে কিংবা যখন যেভাবে যেটা বুঝতেন সেই অনুযায়ী। সম্ভবত এটা ২০২৩ সালের রবীন্দ্রজয়ন্তীর কথা। তার নিজস্ব ‘সামাজিক’ মাধ্যমে তিনি (তারেক রহমান) রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে একটা রচনা পোস্ট করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের বিশালত্বের স্বীকৃতি দিয়ে, বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে বিশ্বদরবারে পৌঁছানোর রবীন্দ্রকৃতিত্বকে স্মরণ করে, আগামী দিনে রবীন্দ্রচেতনা যে বাংলাদেশের মানুষজনের দীর্ঘ পাথেয় হয়ে থাকবে এ ধরনের আশাবাদ সমেত। নেতৃস্থানীয় কেউ যেভাবে একটা মানানসই নৈবেদ্য বা বন্দনা রচনা করে থাকেন সেরকমই। বাংলাদেশের দুপুর নাগাদ তার এই পোস্টটি জনচক্ষুতে আসে। আর পোস্টটির আয়ু সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পর্যন্ত থাকে। আমার যতদূর মনে পড়ে, ঘণ্টা কয়েক পরেই তিনি তার টীকাটি অপসারণ করেন। ডিলিট করেন নাকি ওনলি মি বানান তা আমার জানা নেই। এ সময়ের মধ্যেই হাজারে হাজারে ‘ভক্ত’ তাকে তিরস্কার-নিন্দা করতে থাকেন। বাস্তবে গালাগালিই করতে থাকেন। এখানে ‘ভক্ত’ বলতে বুঝতে হবে তারেক রহমানের ভক্ত, রবীন্দ্রনাথের ভক্ত নয়। আর গালাগালির টার্গেট রবীন্দ্রনাথ নাকি তারেক রহমান নাকি দুজনই তা অতটা সহজে মীমাংস্য নয়। বরং কেবল ফরেনসিক তদন্ত করে এবং সূক্ষ্ম ভাষাতত্ত্ব, ব্যঞ্জনাশাস্ত্র এবং সমাজ-মনোবিদ্যা গবেষণা করেই নিষ্পত্তি করা সম্ভব যে গালিগুলোর অভিমুখ কী ছিল। নিষ্পত্তি করার জন্য সেই পোস্ট আর এখন উন্মুক্ত পাওয়া সম্ভব নয়। আমি কারও সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্তে আসিনি। তবে এ রকম সিদ্ধান্তে আমি এসেছিলাম যে পোস্টটাকে উধাও করে দেওয়ার কারণ সংঘবদ্ধ-গালাগালি থেকে পরিত্রাণের ইচ্ছা। আমি যে এই স্মৃতিটা লিখলাম তাও কেবল এই ভরসাতে যে যা সত্যিই ঘটেছে তা নিয়ে কেউ না কেউ আমার নশ্বর জীবন রক্ষা করতে এগিয়ে আসবেন, বিপদ বাধলে।
কী ঘটল যেখানে একজন বিপুল-ভক্তসম্পন্ন জাতীয় নেতা, প্রবাসজীবনের অবধারিত মানসিক অশান্তির মধ্যে, একটা আপাত-নিরীহ বিবরণী প্রকাশ করে নিজপক্ষের এ রকম হেনস্তার শিকার হলেন? এখানেই লুক্কায়িত আছে বিগ্রহনির্মাণ প্রক্রিয়া। এটাকে ঠিকমতো খোসা ছাড়িয়ে বুঝতে গেলে আমাদের মনোযোগ দিতে হবে ৭০ দশকের শেষভাগ থেকে বিকশিত বিএনপির সাংস্কৃতিক মিশনের দিকে, জিয়া-ডক্ট্রিনের দিকে, ‘ভারত’ চিহ্নমালা সৃজনের দিকে এবং সেই ভারত-চিহ্নমালার মধ্যকার অবধারিত কারক-স্মারক হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে পুনরাবিষ্কারের দিকে। কাজটা কঠিন নয়; কিন্তু আবার সহজও নয়। সবচেয়ে বড় দুইটা সমস্যা হবে : ইতিহাস সূত্রের ধারাবাহিকতা খুঁজে পাওয়ার পর্যাপ্ত নির্দেশনার অভাব এবং সম্ভাব্য বিশ্লেষকের জানমালের নিরাপত্তার সমস্যা। এখানে চাইলে আমরা বিএনপির ‘নিজপক্ষ’কে আরেকটু তদন্ত করে দেখতে পারি যে নিজপক্ষ কতটা নিজপক্ষ, কতটা মিশ্রপক্ষ। সব মিলে, এই অধ্যায়টাকে বিশদে আলাপ করার সুযোগ থাকছেই আমাদের জীবনে, যদি চাই কখনো।
নিগ্রহ ও জুলাই-উত্থান
জুলাই-পূর্ববর্তী ও জুলাই-পরবর্তীকালে নাগরিক পরিমণ্ডলে রবীন্দ্র বিবেচনাতে দুইটা বড় ধাক্কাকে চিহ্নিত করা যায়। আমি করছি আর কী! পূর্ববর্তীকালে একটা বড় আলোচনা ছিল রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন কিনা সেই প্রশ্নটি। আমি নিজে ইতিহাসের একটা দিনে কে কোন পক্ষে ছিলেন সেই দশাকে স্থির কিছু হিসেবে বিবেচনা করি না। এমনকি নিশ্চিত-নিয়ামক হিসেবেও দেখি না। কারও ক্ষেত্রেই। ভাবুন, ছোটবেলাতে শেখা-চোখে এখনো বসে-বসে মনশ্চক্ষে দেখছি শেরেবাংলা ১৭ জগ খেজুররস খেয়ে সমানে বই ছুড়ে-ছুড়ে ফেলে দিচ্ছেন। এতে শেরেবাংলার তেমন কোনো ক্ষতিবৃদ্ধি না হলেও আমার আক্কলের বিশ্রি রকমের খারাপ দশা ঘটে। আমার দেখাদেখি বদলানোতে শেরেবাংলাকে নিয়ে বাল্যগ্রন্থের ওই পাঠ আসলেই যারপরনাই সাহায্য করেছিল। যা হোক, বলাই বাহুল্য, জনরোষের একটা বড় উপলব্ধি ছিল যে রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরোধিতা করেছিলেন। এক্ষেত্রে একটা দুর্ঘটনাও দায়ী। অনেকেই জানেন, তাও আরেকবার জানানো যায় যে, অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খানের একটা দীর্ঘ বক্তৃতার খণ্ডিত অংশ সাইবারে এই উপলব্ধির একটা বড় কারণ সরবরাহ করেছিল। তিনি নিজে পরে ভেঙেই ব্যাখ্যা দিয়েছেন যে, তিনি তা বলেননি। তার দীর্ঘ ও পইপই করে বক্তৃতা দেওয়ার অভ্যাসের একটা সামূহিক ও অনুবর্তী ক্ষয়ক্ষতি হিসেবেই আমি এই ঘটনাকে দেখি। রবীন্দ্র প্রতিপক্ষতায় এই ঘটনা আরও এক উচ্চতা নিয়ে এসেছে।
অন্য ঘটনাটি এই মুহূর্তে সব বর্গের মনোভাব বিচারে গৌণ লাগতে পারে। তবে গৌণ ছিল না তা, অন্তত তখন। ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর প্রেসক্লাবে একটা প্রেস কনফারেন্সে গোলাম আযমের পুত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আব্দুল্লাহিল আমান আযমী নতুন জাতীয় সংগীত লিখবার তাগিদ দেন জনগণকে, সংবিধান বদলানোর পাশাপাশি। তিনি জাতীয় সংগীত বদলানোর মূল যুক্তি দেন যে গানটা দুইটা বাংলাকে একক হিসেবে আকাঙ্ক্ষা করে। সংবিধান বদলের ক্ষেত্রে তার যুক্তি ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমদের বাংলাদেশে নাগরিকদের ধর্মীয় বিধানে রাখা। দুইটা জিনিসের রদবদলে তার দুইটা যুক্তি মনে রাখা কর্তব্য, কারণ তার অনুসারীরা ঠিক এত স্পষ্টভাবে আলাদা করতে রাজি থাকেন না। জনজবানে তারা প্রায়শই রবীন্দ্রনাথের পরিচয়কেও সংগীত বদলের কারণ হিসেবে আলাপ করে থাকেন। আযমীর প্রস্তাব বাংলাদেশের নাগরিক সব মহলে ইতিবাচক সাড়া না আনলেও জামায়াতে ইসলামী ও এর বন্ধুপ্রতিম সংগঠনগুলো এই দাবি নিয়ে সোচ্চার ছিলেন। এখন স্তিমিত হতে পারে দাবিটা, তবে তারা তাদের দাবি থেকে সরেননি।
রবীন্দ্র-প্রতিপক্ষতার এই দুটো স্মারক সমসাময়িক বলেই কেবল মনে করলাম। উপরন্তু দুটোই জুলাই-উত্থানের ঘটনাক্রমের মধ্যে প্রোথিত আছে বলে বিবেচনা করি। কিন্তু সবারই মনে রাখা ভালো যে, রবীন্দ্র-প্রতিপক্ষতা কিংবা বিদ্বেষের পাটাতন এতেই সীমিত নয়, এর বিকাশকালও এমন ছোটখাটো নয়। যে রবীন্দ্রনাথকে অতিকায় আইকন বানানো হয়েছে বাংলাদেশে, অন্তত ষাটের দশকের জাতীয়তাবাদী চেতনার মধ্য দিয়ে, সেই রবীন্দ্রনাথকে খর্বকরণের সূচনাও তাহলে এর সমসাময়িক। এটা সাধারণ কাণ্ডজ্ঞানের প্রসঙ্গ যে পাকিস্তানের শাসকেরা রবীন্দ্রচিহ্নকে বড় হিসেবে দেখতে পাচ্ছিলেন বলেই তো এর অবনয়নের উদ্যোগ নেন। শাসকের উপেক্ষার প্রতিবাদ করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ আরও বড় আইকনে পরিণত হন। সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়ার এই রাজনৈতিক বৈশিষ্ট্য মোটের ওপর বৈশ্বিক। শাসক কখন কোনো সাহিত্য-শিল্পচর্চাকারীকে প্রতিপক্ষ ভাববেন সেটার সুস্পষ্ট রাজনৈতিক প্রেষণা আছে। আমার মূল আগ্রহটা জনমানস নিয়ে। সেখানে ভক্তি ও বিদ্বেষ দুয়ের কারিগরিই অনেক আবছায়া, অনেক ঘোলাটে; নানাস্তরীয়।
রবীন্দ্রবিদ্বেষ নিয়ে ব্যথা পান যারা তারা প্রায়ই ব্যথা পাওয়ার সময় লক্ষ করতে ভুলে যান যে সাহিত্য-সংস্কৃতি-শিল্পের প্রতি বিদ্বেষের চর্চা আরও পরিব্যপ্ত। রবীন্দ্রনাথকে হিন্দু ভাবা বাস্তবে যতই বিদঘুটে ধরনের ভ্রান্তি হোক না কেন, তাতে খ্রিস্টান মাইকেল মধুসূদন দত্ত, কিংবা মুসলিম কাজী নজরুল ইসলাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য কোনো বাড়তি সুবিধা নিয়ে থাকেন না। পরিচয় প্রণালির সামাজিক বিদ্বেষগুলো অবধারিত বলে সেটা আমি এড়াচ্ছি। বরং ভাবতে সুপারিশ করি, ধ্রুপদি সাহিত্যের হেন লোক নাই যিনি সমকালীন বাংলাদেশে কোনো না কোনো বিদ্বেষের মধ্যে বা অন্তত অবজ্ঞার মধ্যে, পড়েননি। যদি আর কোনো বড় উপেক্ষা তারা মরণোত্তর নাও পান, তাতেও পাঠবর্জিত থাকার উপেক্ষা আছেই। প্রাসঙ্গিক যে, রবীন্দ্রনাথ জীবদ্দশাতে খোদ কলকাতীয় সমকালীন পিয়ারগ্রুপের কাছেও কম নিগৃহীত হননি। এর নাম ঈর্ষা দিই বা যাই দিই, তা ছিল। নোবেলপ্রাপ্তিতে তার সম্মান হয়তো বেড়েছিল, কিন্তু নিগ্রহ বিশেষ কমেনি। প্রাপ্তির ব্যাকরণ নিয়ে নতুন নিগ্রহ-হাতিয়ার তৈরি হয়েছিল। সাহিত্য-সংস্কৃতি-শিল্পকলার প্রতি বৃহত্তর সমাজের অনেকাংশের বিদ্বেষকে সহজে ‘শিক্ষার অভাব’ হিসেবে রায় দিয়ে দেওয়া হয়। আমার তাতে শিথিল শর্তে আপত্তি নেই, কিন্তু এই ফয়সালাকে পর্যাপ্ত বিবেচনা করি না। সমাজে ঘোরতর বৈষম্য থাকলে এবং রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা লাগাতার দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়লে সচ্ছল শ্রেণির জীবনের বহু চিহ্ন ও লক্ষণা ‘গণ’শত্রু হয়ে পড়তে পারে। এই বাক্যটার ভার ও সম্ভাবনা সম্বন্ধে আমি ওয়াকিবহাল। অবশ্যই কখনো বিশদ করা লাগতে পারে। সচ্ছল শ্রেণির চিহ্ন-লক্ষণা-জীবনদর্শনকে শত্রুজ্ঞান করা ‘রাজনীতি’-কারিগরি বুঝতে ভারত উদাহরণ হিসেবে লাগসই। ভারত অন্যের দেশ বলে ও রাষ্ট্র-সংগঠন হিসেবে বহুবিধ উপকরণে গঠিত বলে নিরাপদ উদাহরণও বটে। তবে প্রবণতাটি বাংলাদেশেরও।
মাঠটীকা
রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধের সঙ্গে জনচিত্তের সম্পর্ক চিরকালই এবড়ো-থেবড়ো। ধারাবাহিক নয়। তবে খুবই ধারালো সব যোগাযোগের নজির আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনাতে তার ভূমিকা নিয়ে বিতর্কে নেটিজেনদের কেউ কেউ মুসলমান জনগোষ্ঠী বা তাদের শিক্ষা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথকে আবার পাঠ করতে সুপারিশ করেছেন। সত্যি বললে, সাবেক প্রধান উপদেষ্টার গরিবের ব্যাংকঋণ ও সুদ ব্যবসা শুরুর কালেও, সেই ৯০ দশকে, রবীন্দ্রনাথের পল্লীপ্রকৃতি, স্বদেশী সমাজ বা শ্রীনিকেতনের ইতিহাস ইত্যাদি গ্রন্থ আবার মনোযোগ পেয়েছিল। আমি চিরকালই রবীন্দ্রনাট্যের রাজনৈতিক দর্শন আরও গাঢ় পঠনের প্রয়োজনীয়তা বোধ করেছি। সেই গাঢ়পঠন যে তেমন ঘটে না তাও মনে করি। তবে জুলাইয়ের উত্থানপর্বে সাংগীতিক অধিগ্রহণের প্রসঙ্গটাই অধিক প্রাসঙ্গিক। আমি শুনেছি যে আন্দোলনে উজ্জীবনকারী ৬৩টা গানের সংকলন নিয়ে একটা বই বের হয়েছে। আমার দেখা হয়নি। তবে আন্দাজ করি যে র্যাপই সেখানে অগ্রগণ্য আর সেটাই ন্যায্য। কিন্তু আমি নিশ্চিত যে দ্বিজেন্দ্রলাল, নজরুল ও মোহিনী চৌধুরীর গানও সংযোজিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের গান ওই সংকলকরা রেখেছেন কিনা বিষয় নয়, বিষয় হলো জাতীয় সংগীত বাংলাদেশের এমাথা থেকে ওমাথায় গাওয়া হয়েছিল আন্দোলনের দিনগুলোতে। পাশ্চাত্যে থাকা বাংলাভাষী শিক্ষার্থীদের সংহতিতে ‘মুক্তির মন্দির’ গান যেমন এসেছিল, তেমনি জাতীয় সংগীতও এসেছিল। কিন্তু সত্যি সত্যিই এটা জরুরি প্রশ্ন নয় যে রবীন্দ্রনাথের ঠিক কয়খানা গান নিয়ে কে কী করেছিলেন।
আমাদের মনে রাখা ভালো, ২০২৪ সালের ৩ আগস্ট, এমনকি ৪ আগস্ট পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রাসঙ্গিক ছিল। মানে তিনি প্রাসঙ্গিক ছিলেন। আন্দোলনকারীরা মধ্য-জুলাই থেকেই তাকে প্রাসঙ্গিক করে রেখেছিলেন। ৫ তারিখ বিকালে যে ‘মুজিব’ চিত্রিত হলেন তার কারিগর যে বা যারাই হোন, মধ্যজুলাইয়ের সহযোদ্ধারা ‘মুজিব’ বিগ্রহের রক্ষায় এলেন না। আড়াই বছর আগে যদি পরলোকে দ্বিজেন্দ্রলালকে বলা হতো তোমার গান বাংলাদেশের আন্দোলনে প্রাণ সঞ্চারিবে এবং একখান মেগাহিট হবে, তাহলে তার এই বিদেহী আত্মাও শিহরিত হতো বলে আমার অনুমান। কিন্তু বাস্তবে তাই ঘটেছে। তার মানে এই নয় যে, এখন বাংলাদেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কারিকুলামে দ্বিজেন্দ্রলালের গান রাখতে গিয়ে বা চোখ বুজে দলগত কোরাস গাইতে গিয়ে আপনি পিটানি খাবেন না। বিগ্রহের আত্তীকরণ আর বিগ্রহের নিগ্রহ একটা নির্দিষ্ট সময়কালের মার্কাশ্রয়ী রাগ-ক্রোধ-জিঘাংসা-স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত মাত্র। ধ্রুপদের তো বটেই, সাধারণভাবেই সমাজ-বিদ্রোহে সাংস্কৃতিক প্রডাক্টের প্রাসঙ্গিকতার জিজ্ঞাসা কোনো শর্তবিযুক্ত মুক্তপাঠ নয়। রবীন্দ্রনাথও সেই প্রবণতার একজন চিহ্ন। খুবই বড় চিহ্ন বটে।