মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মহান আল্লাহর অনুগ্রহ। মহান আল্লাহ যার প্রতি অনুগ্রহ করেন, তার অল্প সম্পদেও বরকত হয়। কঠিন পথও সহজ হয়ে যায়। বিপদের মধ্যেও সে আশার আলো খুঁজে পায়। অন্যদিকে মহান আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত মানুষ বাহ্যিকভাবে সফল হলেও অন্তরে শান্তি পায় না। তাই একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় চাওয়া হওয়া উচিত মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অনুগ্রহ অর্জন করা। কোরআন ও সুন্নাহ আমাদের এমন কিছু আমলের শিক্ষা দিয়েছে, যা মানুষকে আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহের যোগ্য করে তোলে।
বিশুদ্ধ ইমান ও তাকওয়া : মহান আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের প্রথম শর্ত হলো বিশুদ্ধ ইমান ও তাকওয়া। যে ব্যক্তি অন্তর থেকে মহান আল্লাহকে বিশ্বাস করে এবং তার আদেশ মেনে চলে, সে মহান আল্লাহর বিশেষ সাহায্য লাভ করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যদি জনপদের অধিবাসীরা ইমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত, তবে অবশ্যই আমি তাদের জন্য আসমান ও জমিনের বরকতের দ্বার খুলে দিতাম।’ (সুরা আরাফ ৯৬)
তাকওয়া শুধু বাহ্যিক কিছু আমলের নাম নয়। এটি এমন এক গুণ, যা মানুষকে গোপন ও প্রকাশ্য সব অবস্থায় মহান আল্লাহকে ভয় করতে শেখায়। তাকওয়াবান মানুষ পাপ থেকে দূরে থাকে এবং নেক কাজের দিকে অগ্রসর হয়। ফলে সে আল্লাহর অনুগ্রহের উপযুক্ত হয়ে ওঠে।
ইবাদতে আন্তরিক হওয়া : ইবাদতের উদ্দেশ্য কেবল দায়িত্ব পালন নয়। বরং মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। নামাজ, রোজা, জাকাত, হজ, দোয়া, জিকির সব ইবাদতেই ইখলাস তথা একনিষ্ঠতা থাকতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তাদের এ ছাড়া কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি যে, তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে...।’ (সুরা বায়্যিনাহ ৫)
যে ব্যক্তি লোক দেখানো ইবাদত করে, সে মানুষের প্রশংসা পেতে পারে। কিন্তু মহান আল্লাহর অনুগ্রহ পায় না। আন্তরিক ইবাদতই বান্দাকে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছে দেয়।
কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক : কোরআন মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় নেয়ামত। যে ব্যক্তি নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত করে, অর্থ বোঝার চেষ্টা করে এবং তার নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করে, সে মহান আল্লাহর বিশেষ রহমতের অধিকারী হয়।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘এটি এমন এক কিতাব, যা আমি নাজিল করেছি, এটি বরকতময়। অতএব তোমরা এর অনুসরণ করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হও।’ (সুরা আনআম ১৫৫)
কোরআনের আলো হৃদয়কে জীবন্ত করে। চিন্তাকে শুদ্ধ করে। চরিত্রকে সুন্দর করে। এভাবেই মানুষ আল্লাহর অনুগ্রহের পথে এগিয়ে যায়।
তওবা-ইস্তিগফার করা : মানুষ ভুল করবে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভুলের পর অনুতপ্ত হয়ে মহান আল্লাহর কাছে ফিরে আসাই একজন মুমিনের পরিচয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল।’ (সুরা নুহ ১০)
ইস্তিগফার শুধু গুনাহ মাফের মাধ্যম নয়। এটি রিজিক বৃদ্ধি, সংকট দূর হওয়া এবং মহান আল্লাহর অনুগ্রহ লাভেরও অন্যতম উপায়। তাই প্রতিদিন নিয়মিত ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।
ধৈর্য ধারণ করা : জীবনে পরীক্ষা আসবেই। দুঃখ, কষ্ট, রোগ, অভাব কিংবা প্রিয়জন হারানোর মতো কঠিন মুহূর্ত আসতে পারে। এসব অবস্থায় ধৈর্য ধারণ করা ইমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সুরা বাকারা ১৫৩)
ধৈর্য মানে কষ্টে ভেঙে না পড়া। বরং আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা। এমন বান্দাদের জন্য আল্লাহর সাহায্য ও অনুগ্রহ সবসময় উন্মুক্ত থাকে।
মানুষের প্রতি দয়া ও সদাচরণ : মহান আল্লাহ তার বান্দাদের প্রতি দয়ালু। তিনি চান তার বান্দারাও একে অপরের প্রতি দয়াশীল হোক। হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যারা দয়া করে, পরম দয়াময় আল্লাহ তাদের প্রতি দয়া করেন। তোমরা পৃথিবীর অধিবাসীদের প্রতি দয়া করো, তাহলে আকাশের অধিবাসী তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।’ (সুনানে আবু দাউদ)
অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ক্ষুধার্তকে খাবার দেওয়া, অসুস্থের খোঁজ নেওয়া, প্রতিবেশীর হক আদায় করা এবং মানুষের কষ্ট লাঘব করা মহান আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহার : মা-বাবার সন্তুষ্টির সঙ্গে মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাদের সম্মান করা, সেবা করা এবং তাদের জন্য দোয়া করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমার প্রতিপালক নির্দেশ দিয়েছেন, তোমরা তাকে ছাড়া অন্য কারও ইবাদত করবে না এবং মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।’ (সুরা ইসরা ২৩)
যে সন্তান মা-বাবার হক আদায় করে, মহান আল্লাহ তার জীবনে বরকত দান করেন। তার দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনাও বৃদ্ধি পায়।
হালাল উপার্জন করা : হারাম উপার্জন মানুষের আমল নষ্ট করে দেয়। দোয়া কবুলে বাধা সৃষ্টি করে। অন্যদিকে হালাল রিজিক মহান আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের অন্যতম উপায়।
হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেছেন, যে দীর্ঘ সফরে এলোমেলো চুলে ধূলিধূসর অবস্থায় আল্লাহর কাছে দোয়া করে। কিন্তু তার খাদ্য, পানীয় ও পোশাক হারাম এবং সে হারাম দ্বারা প্রতিপালিত। তাহলে তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে? (সহিহ মুসলিম)
হালাল উপার্জনের জন্য কষ্ট করা ইবাদতের অংশ। এতে রিজিকে বরকত আসে এবং মহান আল্লাহর রহমত লাভ হয়।
দান-সদকা করা : মহান আল্লাহর পথে ব্যয় করলে সম্পদ কমে না। বরং বরকত বৃদ্ধি পায়। দান মানুষের হৃদয়কে কোমল করে। সমাজে ভালোবাসা সৃষ্টি করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যা কিছু ব্যয় করো, আল্লাহ সেই সম্পর্কে সম্যক অবগত।’ (সুরা বাকারা ২৭৩)
সামর্থ্য অনুযায়ী নিয়মিত দান করা উচিত। অল্প হলেও আন্তরিকতার সঙ্গে দান করলে মহান আল্লাহ তা কবুল করেন।
দোয়া ও আল্লাহর ওপর ভরসা : দোয়া হলো মুমিনের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র। যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর কাছে বারবার প্রার্থনা করে, মহান আল্লাহ তাকে নিরাশ করেন না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।’ (সুরা গাফির ৬০)
দোয়ার পাশাপাশি তাওয়াক্কুলও জরুরি। অর্থাৎ নিজের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করা এবং ফলাফলের জন্য মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা। এ গুণ মানুষকে মহান আল্লাহর বিশেষ সাহায্যের যোগ্য করে তোলে।
নিয়মিত জিকির করা : জিকির মানুষের হৃদয়কে প্রশান্ত করে। গুনাহ দূর করে। ইমানকে শক্তিশালী করে। সকাল সন্ধ্যার মাসনুন জিকির, তাসবিহ, তাহলিল, তাহমিদ এবং দরুদ শরিফ পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর জিকিরেই হৃদয় প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাদ ২৮)
যে হৃদয় সবসময় মহান আল্লাহকে স্মরণ করে, সেই হৃদয় মহান আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হয় না।
মহান আল্লাহর অনুগ্রহ অর্জনের জন্য প্রয়োজন ইমান, তাকওয়া, আন্তরিক ইবাদত, তওবা, ধৈর্য, হালাল উপার্জন, দান, দোয়া, জিকির এবং মানুষের প্রতি সদাচরণ। একজন মুমিন যখন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলার চেষ্টা করে, তখন তার ওপর আল্লাহর রহমত নেমে আসে। দুনিয়ার সংকট সহজ হয়ে যায়। আখেরাতের সফলতার পথও সুগম হয়। তাই আমাদের প্রতিদিনের সবচেয়ে বড় দোয়া হওয়া উচিত, মহান আল্লাহ যেন আমাদের এমন বান্দা হিসেবে কবুল করেন, যাদের ওপর তার রহমত, বরকত ও অনুগ্রহ সর্বদা বর্ষিত হয়। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে তেমন বান্দা হওয়ার তওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক : মাদ্রাসাশিক্ষক ও ইসলামি গবেষক