পুরান ঢাকার দৃষ্টিনন্দন তারা মসজিদ

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৬, ১২:২২ এএম

প্রাচীন ঐতিহ্য, শিল্পরুচি ও ইসলামি স্থাপত্যকলার অনন্য নিদর্শন পুরান ঢাকার তারা মসজিদ। আরমানিটোলার আবুল খয়রাত সড়কের ৮ নম্বর হোল্ডিংয়ে অবস্থিত এ মসজিদ। গুলিস্তান থেকে সিদ্দিক বাজার হয়ে বংশাল অতিক্রম করে মাহুতটুলী মোড় পেরোলেই চোখে পড়ে দৃষ্টিনন্দন এই স্থাপনাটি।

মসজিদটির নির্মাণকাল নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। কারণ, অন্য অনেক প্রাচীন মসজিদের মতো এখানে নির্মাণকাল উল্লেখ করা কোনো শিলালিপি পাওয়া যায়নি। তবে অধিকাংশ গবেষকের মতে, আঠারো শতকের শেষ ভাগ কিংবা উনিশ শতকের শুরুতে এটি নির্মিত হয়। নির্মাতা ছিলেন ধনাঢ্য জমিদার মির্জা গোলাম পীর। তিনি ছিলেন ঢাকার সম্ভ্রান্ত মীর আবু সাঈদের বংশধর। তার পূর্বপুরুষ তুরস্ক থেকে ঢাকায় এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন।

মির্জা গোলাম পীর এই মসজিদ নির্মাণ করে তা ওয়াক্ফ করে যান। তখন স্থানীয় মানুষের কাছে এটি ‘মির্জা সাহেবের মসজিদ’ নামেই পরিচিত ছিল। ১৮৬০ সালে তার ইন্তেকালের পরও মসজিদটি এলাকার ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে টিকে থাকে।

প্রথম দিকে মসজিদটি ছিল বেশ ছোট এবং সাদামাটা। মোগল স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই মসজিদে ছিল তিনটি গম্বুজ। দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় ৩০ থেকে ৩৩ ফুট এবং প্রস্থ ছিল প্রায় ১২ ফুট। তবে এর স্থাপত্যে দিল্লি, আগ্রা ও লাহোরের মোগল যুগের নির্মাণরীতির স্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়। ঢাকার কসাইটুলীর মসজিদের সঙ্গেও এর স্থাপত্যগত মিল রয়েছে।

তারা মসজিদের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ১৯২৬ সালে। সে সময় আরমানিটোলার ধনাঢ্য ব্যবসায়ী আলী জান ব্যাপারী নিজ উদ্যোগে মসজিদটির ব্যাপক সংস্কার করেন। তিনি জাপানসহ বিভিন্ন দেশ থেকে উন্নতমানের মার্বেল, টাইলস ও রঙিন চিনি-টিকরি এনে মসজিদের ভেতর ও বাইরের দেয়াল অলংকৃত করেন। ফুল, লতাপাতা ও জ্যামিতিক নকশার পাশাপাশি গম্বুজজুড়ে ফুটিয়ে তোলা হয় অসংখ্য নীল তারার নকশা। সাদা মার্বেলের ওপর নীল তারার এই অনন্য সৌন্দর্যই মসজিদটিকে নতুন পরিচয় এনে দেয়। সেই থেকেই এটি ‘তারা মসজিদ’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

পরবর্তী বড় সংস্কার হয় ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে। তৎকালীন রাষ্ট্রপতি এইচ এম এরশাদের উদ্যোগে মসজিদটি সম্প্রসারণ করা হয়। মূল স্থাপত্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তিন গম্বুজের পরিবর্তে পাঁচ গম্বুজ নির্মাণ করা হয়। পুরনো অংশের উত্তর দিকে সম্প্রসারণ করা হয় ভবনটি। নতুন তিনটি মেহরাবও তৈরি করা হয়। ফলে মসজিদের দৈর্ঘ্য বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ ফুট এবং প্রস্থ হয় ২৬ ফুট।

১৯৮৭ সাল থেকে তারা মসজিদ সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে ওয়াক্ফ প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এখানে রয়েছে হেফজখানা, মক্তব এবং লিল্লাহ বোর্ডিং। সরকারি অনুদান ও এলাকাবাসীর সহযোগিতায় এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম চলছে।

লেখক : ধর্মীয় নিবন্ধকার

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত