হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের কাজ থামিয়ে দিলেন আদালত

হোয়াইট হাউস সংস্কারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উচ্চবিলাসী পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা দিয়েছে দেশটির আপিল আদালত। হোয়াইট হাউসের ইস্ট উইং (পূর্ব অংশ) ভেঙে সেখানে ৪০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ে ৯০ হাজার বর্গফুটের বিশাল একটি ‘বলরুম’ নির্মাণের কাজ তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

শুক্রবার (৭ আগস্ট) ওয়াশিংটনভিত্তিক ডিস্ট্রিক্ট অব কলাম্বিয়া সার্কিট আপিল আদালত এই রায় ঘোষণা করেন।

প্রেসিডেন্টের একচ্ছত্র ক্ষমতার আইনি সীমানা নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই মামলায় ২-১ ব্যবধানের রায়ে আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ‘প্রত্যেক প্রেসিডেন্ট হোয়াইট হাউসের একজন সাময়িক ভাড়াটিয়া, এর মালিক নন।’ তাই কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া ট্রাম্প চাইলেই ঐতিহ্যে ঘেরা এই ভবনের কাঠামো এভাবে পুরোপুরি বদলে দিতে পারেন না।

ন্যাশনাল ট্রাস্ট ফর হিস্টোরিক প্রিজারভেশন নামের একটি ঐতিহ্য সংরক্ষণকারী সংস্থা ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। ট্রাম্প প্রশাসন কংগ্রেসের কোনো তোয়াক্কা না করে এবং কোনো অনুমতি না নিয়েই ইস্ট উইং ভেঙে এত বড় বলরুম বানানো শুরু করেছিল। ট্রাম্পের তৈরি করা সেই প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞাই বহাল রাখলেন আপিল আদালত। বিচারকরা তাঁদের পর্যবেক্ষণে জানান, একটি বিশাল বলরুম বানানো তৈরি করা উচিত কি না, তা ঠিক করবে মার্কিন কংগ্রেস; প্রেসিডেন্ট একা নিজের ইচ্ছায় এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না।

তবে রায়টির ওপর ১৪ দিনের একটি সাময়িক স্থগিতাদেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে ট্রাম্প প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে আপিল করার সুযোগ পায়।

এদিকে আদালতের এই রায়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে তিনি এই রায়কে ‘ভয়াবহ’ এবং ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে অভিহিত করেছেন। ট্রাম্পের দাবি, বলরুম নির্মাণের এই প্রজেক্টটি আসলে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ ছিল। সেখানে বোমানিরোধক সেল্টার, আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে রক্ষার ব্যবস্থাসহ আরও অনেক নিরাপত্তা বলয় যুক্ত রয়েছে। আদালত কাজ বন্ধ করায় তিনি এবং হোয়াইট হাউসে আসা অতিথিরা নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়বেন বলে তিনি দাবি করেন এবং এ বিষয়ে দ্রুত সুপ্রিম কোর্টে যাবেন বলে জানান।

অন্যদিকে এই রায়কে স্বাগত জানিয়ে ঐতিহ্য রক্ষাকারী সংস্থা ন্যাশনাল ট্রাস্টের প্রধান ব্রেন্ট লেগস বলেন, ‘এটি আমাদের দেশ ও সাধারণ মানুষের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন। হোয়াইট হাউসের মতো ঐতিহ্যবাহী স্থানের সুরক্ষায় মানুষের মতামত প্রকাশের অধিকার আজ জয়ী হলো।’

এর আগে রিপাবলিকান আমলের বিচারক রিচার্ড লিওন মাটির নিচের কাজ চালু রাখার অনুমতি দিলেও মাটির উপরের সব নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিলেন। ট্রাম্প সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করতেই আপিল আদালতে গিয়েছিলেন, কিন্তু আপিল আদালতও ট্রাম্পের বিপক্ষে রায় দেন। ট্রাম্পের সমর্থকদের দাবি ছিল, এটি ব্যক্তিগত অর্থায়নে তৈরি হচ্ছে এবং জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই ইস্ট উইং ভেঙে এটি করা জরুরি। কিন্তু আপিল আদালতের ডেমোক্র্যাট মনোনীত দুই বিচারক স্পষ্ট জানান, জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে আইন অমান্য করার কোনো সুযোগ নেই। সংবিধান ও আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জাতীয় স্মৃতিচিহ্ন বা ঐতিহ্য ভেঙে ফেলার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের নেই।

অবশ্য ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে নিয়োগ পাওয়া বিচারক নিওমি রাও এই রায়ের বিরোধিতা করে বলেন, আদালত নির্মাণকাজ বন্ধ করে নিজেদের ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন করেছেন।

উল্লেখ্য, ওয়াশিংটনের সরকারি ভবন ও জাতীয় স্মৃতিচিহ্নগুলোর রূপ বদলাতে ট্রাম্প যে কয়েকটি বিতর্কিত উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তার মধ্যে এই বলরুম প্রজেক্টটি ছিল সবচেয়ে বড়। এর আগে ‘কেনেডি সেন্টার’-এর গায়ে অবৈধভাবে ট্রাম্পের নাম বসানোর কারণে সেটিও আদালত সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিল। ট্রাম্পের এই বলরুম তৈরির খরচ শুরুতে যা ধরা হয়েছিল, সময়ের ব্যবধানে তা দ্বিগুণ হয়ে ৪০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প এটিকে ‘সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ, নিখুঁত ও নিরাপদ’ এক স্থাপনা হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, যা এখন আইনি বেড়াজালে আটকে গেল।

সূত্র: রয়টার্স