ইরানকে ঘিরে কৌশলগত মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের জন্য ওয়াশিংটনে পৌঁছেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠিতব্য এ বৈঠকে ইরান, গাজা, লেবানন এবং সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিককরণসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরার পর এটি হবে দুই নেতার অষ্টম বৈঠক। গত ফেব্রুয়ারিতে সর্বশেষ সাক্ষাতের পর ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হয়েছিল। তবে এপ্রিল মাসে বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ এবং জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের আশঙ্কায় ট্রাম্প ওই অভিযান স্থগিত করেন।
ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এখনও পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় হয়নি। নেতানিয়াহু বৈঠকে ইরানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের বিষয়ে নতুন গোয়েন্দা তথ্য তুলে ধরে আরও কঠোর অবস্থান নেওয়ার পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করতে পারেন।
তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, ট্রাম্প বর্তমানে নতুন সামরিক সংঘাতে জড়ানোর পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা কমিয়ে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগ্রহী। অন্যদিকে আগামী অক্টোবরে ইসরায়েলের জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে নেতানিয়াহু ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে নিরাপত্তা ইস্যুতে রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন করতে চান।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ট্রাম্প এমন কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, যা ইসরায়েলের অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর মধ্যে রয়েছে ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান বন্ধ করা, লেবানন-সংক্রান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো, তুরস্কের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রির সম্ভাবনা বিবেচনা করা এবং সৌদি আরবের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি এগিয়ে নেওয়া।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব কারণে ট্রাম্পের ওপর নেতানিয়াহুর প্রভাব আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। ফলে এবারের বৈঠকে তিনি ট্রাম্পকে নতুন সামরিক অভিযানে রাজি করানোর পরিবর্তে ইসরায়েলের নিরাপত্তা, সম্ভাব্য ‘রেড লাইন’ এবং প্রয়োজনে এককভাবে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সম্পর্কে সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতে পারেন।
গাজা ও লেবানন ইস্যুতেও দুই দেশের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর বিষয়টি আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবাননে ইসরায়েলি সেনা ধাপে ধাপে প্রত্যাহার, লেবাননের সেনাবাহিনীর মোতায়েন এবং হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে। একইভাবে গাজার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনায় ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েনের বিষয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রতি ইতিবাচক ইঙ্গিত দিয়েছে ইসরায়েল। তবে তেল আবিব স্পষ্ট করতে চায়, চুক্তির শর্ত লঙ্ঘিত হলে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার স্বাধীনতা তাদের বজায় থাকবে।
দুই নেতার আলোচনায় সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিককরণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেতে পারে। সম্প্রতি ওয়াশিংটন ও রিয়াদের মধ্যে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি হয়েছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, সৌদি আরব ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক না করলে ওই উদ্যোগ পূর্ণাঙ্গভাবে এগোবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করতে পারলে তা নেতানিয়াহুর জন্য বড় কূটনৈতিক সাফল্য হবে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত নতুন আঞ্চলিক জোট গঠনের পথও আরও সুগম হতে পারে।
তবে ইরান ইস্যুতে দুই নেতার অবস্থানের পার্থক্য বিবেচনায় এবারের বৈঠক থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বড় সামরিক সিদ্ধান্ত আসার সম্ভাবনা কম বলেই ধারণা করছেন পর্যবেক্ষকরা। বরং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা সহযোগিতা, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং সম্ভাব্য সমঝোতার কাঠামো নির্ধারণই বৈঠকের প্রধান অর্জন হতে পারে।
সূত্র: দ্য টাইমস অব ইসরায়েল
