স্কুল ফিডিংয়ে অনিয়ম

যশোরের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে স্কুল ফিডিং (মিড-ডে মিল) কর্মসূচির খাদ্যসামগ্রী বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দাবি অনেক স্কুলেই বরাদ্দের চেয়ে কম ওজনের কলা, শক্ত পাউরুটি এবং নষ্ট ডিম সরবরাহ করা হচ্ছে। পাশাপাশি, নির্দিষ্ট সময়ের অনেক পরে খাদ্যসামগ্রী বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর নজিরও রয়েছে। এসব অনিয়মের চিত্র তুলে ধরে সংশ্লিষ্ট উপজেলা শিক্ষা অফিসগুলো থেকে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে দফায় দফায় লিখিত প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। তবে প্রশাসনের কাছে একাধিকবার প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

সম্প্রতি যশোরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ‘ফিডিং কর্মসূচি’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় প্রধান শিক্ষকদের ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ফিডিং কর্মসূচির প্রকল্প পরিচালক, উপ-প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ সময় প্রধান শিক্ষকরা তাদের বিদ্যালয়ে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহের বিভিন্ন অনিয়মের বিষয় কর্মকর্তাদের অবহিত করেন।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস মতে, যশোরের তিনটি উপজেলায় ৪০৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ফিডিং কর্মসূচি চালু রয়েছে। এর মধ্যে ঝিকরগাছায় ১৩১টি, অভয়নগরে ১১৭টি এবং কেশবপুরে ১৫৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। কর্মসূচির আওতায় শিক্ষার্থীদের পাঁচ ধরনের খাবার দেওয়া হয়। এগুলো হলো- ডিম, বানরুটি, দুধ, কলা ও বিস্কুট। এনজিও সুশীলন ডিম, কলা ও পাউরুটি এবং প্রাণ কোম্পানি বিস্কুট ও আকিজ কোম্পানি দুধ সরবরাহ করছে। তবে কর্মসূচির আওতায় সুশীলনের সরবরাহ করা খাদ্যসামগ্রী নিয়ে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ পাওয়া গেছে। শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন, অনেক ক্ষেত্রে কম ওজনের কলা, নষ্ট ডিম এবং নিম্নমানের পাউরুটি সরবরাহ করা হচ্ছে।

ঝিকরগাছা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস মতে, চলতি বছরের ১৮ এপ্রিল, ২১ মে ও ৩০ জুলাই যশোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পৃথক তিনটি প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। এসব প্রতিবেদনে উপজেলার ১৩১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চলমান স্কুল ফিডিং কর্মসূচির বিভিন্ন অনিয়মের চিত্র তুলে ধরা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্মসূচির শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের জন্য সরবরাহ করা কলা, ডিম ও পাউরুটির মান এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন ত্রুটি দেখা দিয়েছে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি কলার ওজন ১০০ গ্রাম হওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন বিদ্যালয়ে সরবরাহ করা কলার ওজন ৬০ থেকে ৭০ গ্রাম পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে পচা বা নষ্ট কলা সরবরাহের অভিযোগও রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভাঙা ডিম শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। আবার কিছু পাউরুটির রঙ পরিবর্তিত হয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ১৫ জুলাই উপজেলার একটি বিদ্যালয়ে এমন ঘটনার ভিডিও ধারণ করে জেলা কার্যালয়ে পাঠানো হয়।

ঝিকরগাছা উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ওয়ালীয়ার রহমান বলেন, খাবারের মান যাচাইয়ের জন্য প্রতিটি বিদ্যালয়ে তিনজন অভিভাবক ও দুজন শিক্ষকের সমন্বয়ে পাঁচ সদস্যের কমিটি রয়েছে। তারা প্রায়ই খাদ্যসামগ্রী নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ করেন।

তিনি বলেন, ৩০ জুলাই উপজেলার মাটিকুমরা ক্লাস্টারের কয়েকটি বিদ্যালয়ে কম ওজনের কলা ও শক্ত পাউরুটি দেওয়া হয়েছে। এসব অনিয়মের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট এনজিওকে একাধিকবার মৌখিকভাবে জানানো হলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি। তিনি আরও বলেন, ‘বিদ্যালয়গুলো থেকে পাওয়া অনিয়মের তথ্য তুলে ধরে ১৮ এপ্রিল, ২১ মে ও ৩০ জুলাই জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে তিনটি প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে।’

ঝিকরগাছার দোস্তপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু সাঈদ বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রায় ৯০ শতাংশ উপস্থিতি ধরে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহ করা হয়। কিন্তু মিড-ডে মিল চালুর পর বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বেড়েছে। ফলে উপস্থিত সব শিক্ষার্থীর জন্য খাবার না থাকায় বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে।

কেশবপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জহির উদ্দিন বলেন, কখনো কখনো বিদ্যালয়ে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছাতে দুপুর ১টা বেজে যেত। এছাড়া কলা সংরক্ষণ ও বিতরণেও সমস্যা ছিল। বারবার তাগাদা দেওয়ার পর ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।

যশোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) জিএম আলমগীর কবির বলেন, ফিডিং কর্মসূচির খাবার নিয়ে আগে থেকেই অভিযোগ রয়েছে। প্রধান শিক্ষকদের ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠানে প্রধান শিক্ষকরা কর্মকর্তাদের সামনেই অনিয়মের তথ্য তুলে ধরেছেন। কর্মকর্তারা বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সুশীলনের প্রোগ্রাম ম্যানেজার আব্দুর রহিম বলেন, খাদ্যসামগ্রীর মান, ওজন ও সরবরাহে তাদের পক্ষ থেকে দায়িত্বে কোনো অবহেলা নেই। তিনি বলেন, কলা, রুটি ও ডিম ক্রয় করে বিদ্যালয়ে পৌঁছে দেওয়া হয়। এগুলো কাঁচাপণ্য হওয়ায় পরিবহনের সময় কখনো সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আবার সংরক্ষণের সময়ও নষ্ট হতে পারে। শিক্ষক বা অভিভাবকদের কাছে কোনো পণ্য খারাপ মনে হলে আমরা সেটি আলাদা করে রাখতে এবং ছবি তুলে পাঠাতে বলি। পরদিন তা পরিবর্তন করে দেওয়া হয়।