বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসে সমস্যা কাটছেই না। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন সংস্থাটিকে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নানা উদ্যোগ নিলেও কাজের কাজ হচ্ছে না। যে সরকারই আসে, তারাই চাপিয়ে দেয় বোঝা। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বেশকিছু সিদ্ধান্তে নাখোশ ছিল বিমান কর্তৃপক্ষ। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে লাভের আশা দূরের কথা উল্টো বোয়িং কেনার চুক্তি করা হয়। বর্তমান সরকারও লাভের আশাতেই এয়ার বাস কিনতে যাচ্ছে। চলতি মাসেই ১০টি এয়ার বাস কেনার চুক্তি করার কথা রয়েছে। বিমান কর্তৃপক্ষ বলছে, বিদেশিদের খুশি করতেই বিমানকে চাপ দিচ্ছে সবাই। এ নিয়ে তারা ক্লান্ত, ক্ষুব্ধ ও হতাশ।
অ্যাভিয়েশন বিশ্লেষকদের মতে, বিমানের লাভজনক হওয়ার চেয়ে লোকসানি প্রতিষ্ঠান হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। বিমানবহরের জন্য একসঙ্গে ২৪টি বোয়িং ও এয়ার বাস কেনা ঠিক হচ্ছে না, যা করা দরকার তা ধীরে-সুস্থে করা দরকার। উড়োজাহাজগুলো একসঙ্গে আসবে না বটে, তবে উভয় সংস্থার পাওনা কিন্তু একই সময়ে পরিশোধ করতে হবে, যা বিমানের ওপর বিশাল আর্থিক চাপ তৈরি করবে। বরং বিমানকে লাভজনক করার পরিকল্পনা সাজাতে হবে। বিদেশিদের খুশি করা নয়, বরং দেশের কদর বাড়াতে হবে। বন্ধ রুটগুলো চালু করতে হবে। দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। ব্যাংক ঋণ কমাতে হবে। রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে পেশাদারত্ব বাড়াতে হবে। এগুলো করতে পারলে বিমান লাভজনক প্রতিষ্ঠান হয়ে উঠবে; বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে পারবে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিমানকে আধুনিক মিক্সড ফ্লিটে রূপান্তরের চেষ্টা চলছে। সংস্থাটিকে আরও উন্নত ও লাভজনক করতে আমরা চেষ্টা করছি। বিমানে দুর্নীতিবাজের ঠাঁই হবে না। উন্নতির জন্যই বোয়িংয়ের ১৪টি ও এয়ার বাসের ১০টি নতুন উড়োজাহাজ বিমানবহরে যুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
করা হয়নি ঋণ শোধের পরিকল্পনা : বিমান-সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, বর্তমানে বিমানের বহরে ১৯টি উড়োজাহাজ আছে। নতুন উড়োজাহাজ যুক্ত হলে বহরের আকার ২৯টিতে পৌঁছাবে। সরকার ২০৩৪-৩৫ অর্থবছরের মধ্যে বিমানের বহর ৪৭টিতে উন্নীত করার পরিকল্পনার লক্ষ্যে সংস্থাটিকে আধুনিক, লাভজনক ও প্রতিযোগিতামূলক করতে চায়। বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক কেন্দ্রস্থলে পরিণত করার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের নীতিনির্ধারকদের। ১০টি এয়ার বাস ও ১৪টি বোয়িং যুক্ত হলে আগামী এক দশকে বিমানের বহরে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটবে বলে ধারণা সরকারের। তবে অর্থ পরিশোধ নিয়ে চিন্তিত বিমান কর্তৃপক্ষ। কীভাবে নতুন উড়োজাহাজ কেনার ঋণ পরিশোধ করা হবে, তার পরিকল্পনা এখনো করা হয়নি। এমনকি কীভাবে অর্থায়ন হবে, ঋণের সুদের হার কত হবে এবং রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশিক্ষণে কত ব্যয় করা হবে, তা নিয়েও কোনো পরিকল্পনা নেই। উড়োজাহাজ পরিচালনার জনবল নিয়োগের ব্যাপারেও কোনো হিসাব নেই।
দৌড়ঝাঁপ শুরু আওয়ামী লীগ আমলেই : বিমান সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই এয়ার বাস কেনার দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়। এ বিষয়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। আবার বোয়িং বিক্রি করতে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাসও দৌড়ঝাঁপ করেন। কিন্তু চুক্তি করার আগেই সরকারের পতন হয়। বিমান অভ্যন্তরীণ সাতটি ও আন্তর্জাতিক ২২টি রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে। আরও রুট ও ফ্লাইট বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে তারা। এরই মধ্যে ইতালি, কানাডা, জাপান রুটে ফ্লাইট চালু করেছে বিমান। নিউইয়র্কসহ আরও কয়েকটি গন্তব্যে ফ্লাইট চালুর পরিকল্পনা রয়েছে বিমানের; দুবাই, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া, চেন্নাইসহ আরও রুটে ফ্লাইট সংখ্যা বাড়াতে চাচ্ছে। এ কারণে আরও উড়োজাহাজ কেনার চেষ্টা চলছে। আওয়ামী লীগের আমলে ফরাসি প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন এয়ার বাস কোম্পানির ১০টি উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। বোয়িংয়ের ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস বিমান ও বেবিচকের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে বিশেষ বৈঠক করেন। বৈঠকে ঢাকা-নিউইয়র্ক ফ্লাইট চালু ও বিমানের কাছে বোয়িং কোম্পানির ড্রিমলাইনারের নতুন ভার্সন ৭৮৭-১০ বিক্রির প্রস্তাবও দেওয়া হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বোয়িং কেনার চুক্তি হয়। বিএনপি সরকার এয়ার বাস কেনার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।
বিতর্কের ঝড় ২০২৩ সাল থেকেই : নাম প্রকাশ না করে বিমানের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উড়োজাহাজ কেনার বিতর্কের গোড়াপত্তন হয়েছিল ২০২৩ সালে। তারপর সব সরকারই বিদেশিদের খুশি করতে বিমানের ওপর চাপ দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘বিমানের অনেক ঋণ আছে। দুর্নীতিও পিছু ছাড়ছে না। আবার বোয়িং ও এয়ার বাস কেনা আমাদের জন্য কষ্টসাধ্য। আমাদের করার কিছু নেই। উড়োজহাহাজগুলো এলে জনবল বাড়াতে হবে। সম্পূর্ণ নতুন করে পাইলটদের ট্রেইনিং দিতে হবে, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বোয়িংয়ের ও এয়ার বাসের জটিল সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যারের সঙ্গে পরিচিত হতে হবে আরও।’
কমছে অর্থ : বিমানের আরেকটি সূত্র জানায়, একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মৌলিক সূত্র হলো আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষা করা এবং লোকসান কমানো; অথচ বিমান হাঁটছে সম্পূর্ণ উল্টো পথে। একদিকে রিজার্ভ বা ফান্ড কমছে, অন্যদিকে অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা। শীর্ষ পদের বেতন এক লাফেই দ্বিগুণ করার মতো ঘটনা ঘটেছে। কোনো সরকারের আমলেই বিমান লাভজনক ছিল না। তারপরও চার মাস আগে বিমনের নামে থাকা বিভিন্ন ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে ৩৬শ কোটি টাকার মতো ছিল। অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কেনার বিষয়টি চূড়ান্ত করলেও সময়ের অভাবে তা আর সম্ভব হয়নি। নতুন সরকার ১৪টি বোয়িং কেনার বিষয়টি লিখিতভাবে চূড়ান্ত করে। চুক্তির সময় ৪০০ কোটি টাকা পরিশোধও করতে হয়েছে। নতুন করে যোগ হয়েছে এয়ার বাস। ফুয়েলের দাম বেড়ে যাওয়ায় গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত অর্থ। বেতনসহ অনুষঙ্গিক খরচও রয়েছে।
বিলাসিতা মনে হচ্ছে : বিমানের সাবেক এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এত বড় রাষ্ট্রীয় ক্রয়চুক্তিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ উড়োজাহাজ কেনা শুধু দামের বিষয় নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ, যন্ত্রাংশ, প্রশিক্ষণ, ইঞ্জিন সাপোর্ট এবং অর্থায়নের বিশাল ব্যয়। বোয়িং ও এয়ার বাসের উড়োজাহাজ যুক্ত হলে বাংলাদেশের ইতিহাসে সেটি বড় বহর-সম্প্রসারণের উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ উদ্যোগ দেশের বিমান পরিবহন খাতকে নতুন উচ্চতায় যেমন নিয়ে যাবে, যেমন তেমনি বড় ধরনের ঝুঁকিও আছে।’ তিনি বলেন, ‘বিমান বিক্রয়ের প্রতিযোগিতা কেবল বাণিজ্যিক নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থও। ৩৭০ কোটি টাকার প্যাকেজে রয়েছে আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০ ড্রিমলাইনার, দুটি ৭৮৭-৯ ড্রিমলাইনার এবং চারটি ৭৩৭ ম্যাক্স ৮। এয়ার বাস কেনার বাজেট এখনো জানায়নি সরকার। এতগুলো উড়োজাহাজ কেনার বিষয়টিকে বিলাসিতা বলেই মনে হচ্ছে।’
বিপদে পড়তে পারে বিমান : এভিয়েশন-বিশ্লেষক এটিএম নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মূল চ্যালেঞ্জ হলো নতুন এয়ারক্রাফট এলে প্রয়োজনীয় পাইলট, কেবিন ক্রু, ইঞ্জিনিয়ার এবং রক্ষণাবেক্ষণের জন্য টুলসের ব্যবস্থা করা, যার জন্য নিবিড় প্রশিক্ষণের দরকার হবে। সময়মতো ঋণপরিশোধ নিশ্চিত করতে হবে। বিমানের আয় বাড়াতে হবে। পরিকল্পনায় সামান্য ভুলে বড় বিপদে পড়তে পারে বিমান।’
আরেক এভিয়েশনের-বিশ্লেষক কাজী ওয়াহিদুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভেবে চিন্তে আমাদের এগোতে হবে। বিমানকে কীভাবে আরও লাভজনক করা যায়, সে পরিকল্পনা করতে হবে। বিমানে অনেক ঋণ আছে। ২৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার পর বিমান চাপে পড়বে সন্দেহ নেই। বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি ডেলিভারির সময়সীমার ঝুঁকি থেকেই যায়।’
চুক্তির পর দাম-শর্ত প্রকাশ : বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দাম ও অন্যান্য শর্তসহ কেনাকাটার বিস্তারিত তথ্য চুক্তি সাক্ষরের পর প্রকাশ করা হবে। বাংলাদেশের জাতীয় ও বাণিজ্যিক স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়েই চুক্তির বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। আশা করি, আগস্ট মাসে চুক্তি হবে। বিমানকে লাভজনক করতে যা করা দরকার, তাই আমরা করছি।’