নিয়ম অনুসারে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের চার বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হলেও মেয়াদপূর্তির আগেই তা বাতিল করে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিতর্ক সৃষ্টি হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে আকস্মিক অব্যাহতি এবং এক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে সরিয়ে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘটের পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছে। নতুন করে আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনের হুমকি দিয়েছে। এসব পরিস্থিতি দেশের উচ্চশিক্ষার প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমের স্বাভাবিক পরিবেশের ক্ষেত্রে এবং দেশে স্থিতিশীলতায় বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী জানিয়েছেন, সার্চ কমিটির মাধ্যমে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়ই উপাচার্য নিয়োগ সম্পন্ন হচ্ছে।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় উপাচার্য পরিবর্তনের ঘটনায় ক্যাম্পাসে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়েছে। গত ২১ সেপ্টেম্বর অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে অব্যাহতি দিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। আকস্মিক এই পরিবর্তনে চুয়েটের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিস্ময় তৈরি হয়েছে। অধ্যাপক সায়েম তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের দাপ্তরিক কাজে ঢাকায় ছিলেন। সেখানেই তিনি জানতে পারেন, তাকে চুয়েটের উপাচার্য পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, আকস্মিক এই পরিবর্তনের কোনো কারণ তাদের জানানো হয়নি। তারা নতুন উপাচার্যের ব্যক্তি বা যোগ্যতার বিরুদ্ধে অবস্থান নয়, বরং সায়েমকে পুনর্বহালের দাবি জানাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যাণে আমি অনেকগুলো কাজ শুরু করেছিলাম। এমনকি যেদিন আমাকে অব্যাহতি দেওয়া হয় সেদিনও আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের জন্য কাজ করছিলাম। অথচ এমন একটি সিদ্ধান্ত আসতে পারে, তা আমি জানতামই না।
ঘটনাটি জানার পর শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে সর্বাত্মক শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন তারা। চলমান এ আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা জানিয়েছে চুয়েট শিক্ষক সমিতিও।
চুয়েটের ঘটনার মধ্যেই গতকাল শনিবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে ঢাকা সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকার সাত কলেজ নিয়ে গঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. নুরুল ইসলামকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একই দিনে আরেক প্রজ্ঞাপনে ঢাকা সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. লুৎফর রহমানকে।
নতুন এই নিয়োগকে ঘিরে ঢাকা সেন্ট্রাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক লুৎফর রহমানকে সর্বাত্মকভাবে প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষার্থীদের একটি পক্ষ। একইসঙ্গে সংকট নিরসন না হওয়া পর্যন্ত বিদায়ী উপাচার্য অধ্যাপক নুরুল ইসলামকে স্বপদে পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যথায় ঢাকার রাজপথ দখল করে দাবি আদায়ের হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। গতকাল ‘সাধারণ শিক্ষার্থী, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি’-এর ব্যানার থেকে সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক স্পষ্ট বিবৃতিতে এসব তথ্য জানানো হয়।
বিবৃতিতে শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শোষণ’ থেকে মুক্তির লক্ষ্যেই এই নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সৃষ্টি হয়েছিল। শুরু থেকেই তাদের দাবি ছিল ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহির্ভূত কোনো ব্যক্তি হতে হবে। কিন্তু সেই দাবির ব্যত্যয় ঘটিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের একজন অধ্যাপককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যা তারা কোনোভাবেই মেনে নেবেন না।’’
শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে আরও বলেন, ‘২০২১-২০২২ থেকে ২০২৩-২০২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের মাইগ্রেশন প্রক্রিয়া বর্তমানে চলমান রয়েছে। নতুন উপাচার্য নিয়োগের এই সিদ্ধান্তকে তারা মাইগ্রেশন প্রক্রিয়া শতভাগ সফল না করার একটি ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন।’
এর আগে একই ধরনের দ্রুত উপাচার্য পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও (গোবিপ্রবি)। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ১৯ জুলাই উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. নাজমুস সাদাতকে। কিন্তু মাত্র ৩৭ দিনের মাথায়, তাকে আবার ২৫ আগস্ট ওই পদ থেকে সরিয়ে নারায়ণগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তর, আবার কোনো উপাচার্যকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে নতুন ব্যক্তি নিয়োগ সাম্প্রতিক এসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদটি শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়; একাডেমিক কার্যক্রম, শিক্ষক নিয়োগ, পরীক্ষা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। তাই দায়িত্ব নেওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যে বারবার পরিবর্তন হলে এর বিরূপ প্রভাব বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমে পড়তে পারে। তারা বলেন, চুয়েটের চলমান আন্দোলন দেখিয়ে দিয়েছে, উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত শুধু প্রশাসনিক প্রজ্ঞাপনেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; এর প্রতিক্রিয়া সরাসরি ক্যাম্পাসের একাডেমিক পরিবেশেও পড়ছে। শিক্ষার্থীদের শাটডাউন ও শিক্ষক সমিতির কর্মবিরতির কারণে সেখানে ক্লাস, পরীক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে।
এ প্রসঙ্গে খ্যাতিমান অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা নিয়ে আসতে হবে। উপাচার্য নিয়োগ, বাতিল সবকিছু একটা কাঠামোতে নিয়ে আসতে হবে। রাজনৈতিক বিবেচনায় উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হলে তা শিক্ষাক্ষেত্রে অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘যাকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয় তাকে কেন নিয়োগ দেওয়া হলো সেই বিষয়ে নিয়োগকর্তার কাছে একটা পরিষ্কার ধারণা থাকতে হবে।’
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ এস এম ফায়েজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসব সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, সার্চ কমিটি উপাচার্য নিয়োগের লক্ষ্যে সিভি সংগ্রহ করে প্রার্থীদের শর্টলিস্ট করবে। প্রয়োজনে সম্ভাব্য উপাচার্য প্রার্থীদের ভাইভাও নেওয়া হবে। এরপর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগের জন্য একটি পোল তৈরি করা হবে। কিন্তু সার্চ কমিটি গঠনের সেই ইচ্ছা বা উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি। সেটি বাস্তবায়িত হলে এসব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত।’
এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উপাচার্য নিয়োগে সার্চ কমিটি গঠন করা হয়েছে। সার্চ কমিটি সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ প্রেরণ করে। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ফাইল উপস্থাপন হয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য আচার্যের কাছে পাঠানো হয়। পুরো বিষয়টি একটি নিয়মের মধ্যে পরিচালিত হয়।’