নদীর সীমানা দখল করে গড়ে উঠছে স্থাপনা। কোথাও নদী ভরাট করে বদলে দেওয়া হচ্ছে গতিপথ। শিল্পবর্জ্য, পয়োনিষ্কাশন ও কঠিন বর্জ্যে দূষিত হচ্ছে পানি। কোথাও আবার নাব্য হারিয়ে সরু হচ্ছে নদী। ফলে একদিকে কমছে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ও জল ধারণক্ষমতা, অন্যদিকে সংকুচিত হচ্ছে মাছসহ জলজ প্রাণীর আবাসস্থল। নদী হারানোর সঙ্গে সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সংশ্লিষ্ট এলাকার পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন-জীবিকা।
দেশের নদনদীর এই অবস্থায় আজ রবিবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব নদী দিবস। প্রতি বছর সেপ্টেম্বরের চতুর্থ রবিবার সারা বিশে^ এ দিবস পালিত হয়। তবে দিবসটি দেশে সরকারিভাবে স্বীকৃত না হওয়ায় তেমন জোরালো কোনো কর্মসূচি নেই। বিক্ষিপ্তভাবে বেসরকারি সংগঠন ও পরিবেশবাদীরা নৌ-র্যালি, সভা, সেমিনারসহ নানা কর্মসূচি পালন করছে।
সরকারি হিসাবে দেশে বর্তমানে মোট নদনদীর সংখ্যা ১ হাজার ৪১৫টি। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর তথ্য সমন্বয় করে ২০২৫ সালের ১৪ এপ্রিল এ সংক্রান্ত একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। এর আগে নদীর সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সরকারি নথিতে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য ছিল। নদীর সংখ্যা নির্ধারণ হলেও দখল, দূষণ ও নাব্য হারানোর বিষয়টি চিহ্নিত করাও জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দেশের নদনদীর নাব্য হারানোর চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালে তৎকালীন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী সংসদে জানিয়েছিলেন, জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী দেশে ৯৩১টি প্রবহমান নদীর মধ্যে ৩০৮টি নাব্য হারিয়েছে। পরে নদীর সরকারি তালিকা হালনাগাদ হওয়ায় সংখ্যার হিসেবেও পরিবর্তন এসেছে। তবে নাব্য হারানোর এই তথ্য নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের সংকটের একটি নমুনা বহন করে।
দখল ও দূষণে বিপর্যন্ত দেশের নদীগুলো। মাঝেমধ্যেই উচ্ছেদ অভিযান চললেও থামছে না নদীর দখল। গত ২৫ বছরে দেশের নদনদী থেকে অন্তত ২৮ হাজার ৩২৫টি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে ১ হাজার ২৪৪ দশমিক ২২ একর তীরভূমি উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)। এরপরও গত বছর ডিসেম্বরে প্রকাশিত তালিকায় সারা দেশে ২১ হাজার ৯৮৮ জন অবৈধ নদী দখলদার শনাক্ত করেছে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন।
দখল ঠেকানোই বড় চ্যালেঞ্জ : নদীর তীর ও সীমানা নির্ধারণ করে স্থাপনা উচ্ছেদ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে উচ্ছেদের পর আবার দখল হয়ে যাচ্ছে। নদীর সীমানা নির্ধারণ, সীমানা পিলার স্থাপন, উচ্ছেদ অভিযান এবং উদ্ধার করা জমি সংরক্ষণ প্রতিটি ধাপেই সমন্বিত ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, একই সঙ্গে নদীর তীরবর্তী এলাকায় নতুন করে স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ না হলে একদিকে উচ্ছেদ, অন্যদিকে পুনর্দখল এ চক্র চলতেই থাকবে। নদী দখলের সঙ্গে যুক্ত থাকে নানা ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতা। অনেক ক্ষেত্রে দখলদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে মামলা-মোকদ্দমা, স্থগিতাদেশ বা মালিকানাসংক্রান্ত বিরোধ সামনে আসে। ফলে উদ্ধার করা তীরভূমি স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ এবং নদীর সীমানা অক্ষুণœ রাখা নদী রক্ষার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নদী কমলে কমে জীববৈচিত্র্য : নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কমে গেলে শুধু নৌযান চলাচল বা কৃষি ব্যবস্থাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় না, এর প্রভাব পড়ে পুরো জলজ প্রতিবেশ ব্যবস্থায়। নদীর পানির প্রবাহ ও গভীরতা কমে গেলে মাছের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হয়। একই সঙ্গে জলজ উদ্ভিদ, বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, শামুক-ঝিনুকসহ অন্যান্য প্রাণীর আবাসস্থলও নষ্ট হতে থাকে। দূষণের কারণে এই সংকট আরও গভীর হয়। শিল্পবর্জ্য, পয়োনিষ্কাশনের পানি ও কঠিন বর্জ্য নদীতে পড়ায় পানির গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। কোথাও কোথাও নদীর পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে জলজ প্রাণীর জন্য পরিবেশ প্রতিকূল হয়ে উঠছে। নদী দখল ও দূষণের পাশাপাশি অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নগরায়ণও নদীর ওপর চাপ বাড়াচ্ছে।
নদী সংকুচিত হলে এর স্বাভাবিক জলধারণক্ষমতাও কমে যায়। বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ধারণ ও নিষ্কাশনে নদীর ভূমিকা বাধাগ্রস্ত হলে জলাবদ্ধতা ও বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। আবার শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে গেলে কৃষি, মৎস্য ও নৌপরিবহনের ওপরও চাপ পড়ে। ফলে নদীর সংকটকে শুধু পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে দেখলে এর সামগ্রিক প্রভাব বোঝা যাবে না।
‘নদীকে গুরুত্ব দিলে সড়কের যানজট কমবে’ : ছোট নদীকে গুরুত্ব দিয়ে নৌপথ তৈরি করতে পারলে সড়ক পথের যানজট কমানো সম্ভব বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী। গতকাল শনিবার আলাপকালে দেশ রূপান্তরকে তিনি এসব কথা বলেন।
মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী বলেন, ঢাকাসহ সারা দেশের নদীগুলো বিপর্যস্ত। ঢাকার চারপাশের নদীতে মাছ লাফালাফি করার কথা ছিল। নদীর ওপর পাখি, চিল ওড়ার কথা ছিল। নদীর পাশে মানুষ প্রশান্তির জন্য যায়, কিন্তু ঢাকার অনেক নদীর পাশ দিয়ে নাক চেপে যেতে হচ্ছে।
এক প্রশ্নের জাবাবে তিনি বলেন, নদী রক্ষার জন্য সরকারের যেসব প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং যেসব সামাজিক ও বেসরকারি শক্তি কাজ করে, এর থেকে দখলদাররা অনেক বেশি শক্তিশালী। অনেক নদী আছে, যেখানের জায়গা খুব দামি। যেমন চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর তীর দখল হয়ে গেছে। একই অবস্থা নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যার তীরেও।
তিনি আরও বলেন, অনেক নদীর জায়গা অব্যহৃত থাকে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-কর্তৃপক্ষের রুটের বাইরেও অনেক ছোট ছোট নদী রয়েছে। যেগুলো সরকার গুরুত্ব দেয় না। এসব নৌরুটকে কার্যকর করলে সড়ক ও রেলপথের ওপর চাপ কমত।
নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক এই চেয়ারম্যান বলেন, ছোট ছোট নদীগুলো নৌকা চলাচলের উপযোগী থাকলে ছোট আকারের নৌযান চালু করা যায়। শুধু কচুরিপানার জন্য অনেক নৌপথ বন্ধ হয়ে আছে। এগুলোতে অপসারণ করে নৌ-চলাচলের উপযোগী করলে সড়কপথের যানজট কমবে।
তিনি বলেন, কিন্তু সরকার এই কাজে গুরুত্ব না দিয়ে সড়কের পেছনে সব ঢেলে দেয়। এই জায়গায় গুরুত্ব দিলে সড়কের পেছনে অর্থব্যয়ও কমতে পারে। এতে মানুষের সময় অপচয়ও রোধ হবে।
দখল-দূষণ ঠেকাতে নতুন উদ্যোগ : নদী রক্ষায় সরকার বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ অভিযান, নদী খনন, সীমানা নির্ধারণ ও তীরভূমি উদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্র্তৃপক্ষের উচ্ছেদ ও তীরভূমি উদ্ধারের পরিসংখ্যানও দেখায়, নদী দখলমুক্ত করার কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে চলছে। বর্তমান সরকার কাজ শুরু করার পর থেকে খাল খনন ও নদী উদ্ধারে গুরুত্ব দিচ্ছে।
ঢাকার চারপাশের নদনদীর দূষণ রোধ ও পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি কেন্দ্রীয় সেল গঠন করেছে সরকার। গত ৩ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তারকে আহ্বায়ক করে এ সেল গঠন করা হয়েছে। এ সেলের অধীনে তিনটি সাব-কমিটি কাজ করবে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ঢাকার চারপাশের বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু, ধলেশ্বরীসহ খাল, নালার দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও নদনদী পুনরুদ্ধারে এ সেল কাজ করবে। কেন্দ্রীয় এ সেলের উপদেষ্টা করা হয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের। এ সেলের সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকবে নৌবাহিনী।
দেশের নদনদী রক্ষা প্রসঙ্গে পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেছেন, নদীদূষণ নিয়ন্ত্রণ কোনো একক মন্ত্রণালয় বা সংস্থার পক্ষে সম্ভব নয়। পানিসম্পদ, পরিবেশ, নৌপরিবহন, স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশন, শিল্প, রাজউকসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে নদীর তীরবর্তী জনগণ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা ও ধলেশ্বরীসহ ঢাকার চারপাশের নদীগুলোকে দূষণ ও দখলমুক্ত রাখা সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। নদীতে শিল্পবর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য ও কঠিন বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে বলা হয়েছে।