ভোগান্তিতে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীরা

যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ইতালির রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দরে ২৮ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে আটকে আছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের টরন্টো-রোম-ঢাকা রুটের বিজি-৩০৬ ফ্লাইট। এতে আড়াই শতাধিক যাত্রী অবর্ণনীয় দুর্ভোগে পড়েছেন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষায় থেকে অনেক যাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় কেউ কেউ বিমানবন্দরের লাউঞ্জের মেঝে ও চেয়ারে রাত কাটিয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার ইতালির স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ২০ মিনিটের দিকে নিয়মিত জ্বালানি নেওয়ার সময় উড়োজাহাজটিতে কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়ে। এরপর উড়োজাহাজটি আর উড্ডয়ন করতে পারেনি। প্রাথমিক পরীক্ষা শেষে উড়োজাহাজটিকে ‘এয়ারক্রাফট অন গ্রাউন্ড’ (এওজি) ঘোষণা করা হয়। ফ্লাইটটিতে ২৬০ যাত্রী ছিলেন। তাদের মধ্যে প্রায় ১৭০ বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী। যাত্রীদের অভিযোগ, বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের ইতালিতে প্রবেশের সুযোগ না থাকায় তাদের বিমানবন্দর থেকে বাইরে নিয়ে হোটেলে রাখার ব্যবস্থা করা হয়নি। ফলে দীর্ঘ সময় বিমানবন্দরের ভেতরেই থাকতে হয়েছে তাদের।

যাত্রীদের একজন ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটির কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক মো. আবু সাঈদ সামাজিক  মাধ্যমে দেওয়া ভিডিওবার্তায় জানান, রোমে অবতরণের পর বিভিন্ন ত্রুটির কথা বলে তাদের প্রায় ৮ ঘণ্টা উড়োজাহাজের ভেতরে অপেক্ষা করানো হয়। এ সময় ফ্লাইটে থাকা শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন।

আবু সাঈদ বলেন, একপর্যায়ে অধিকাংশ যাত্রী শারীরিকভাবে অসুস্থ বোধ করলে তাদের উড়োজাহাজ থেকে নামিয়ে বিমানবন্দরের ভেতরে নেওয়া হয়। তবে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের বাইরে যাওয়ার সুযোগ না থাকায় তারা হোটেলে যেতে পারেননি। পরে রাত ১১টার দিকে একটি লাউঞ্জের ব্যবস্থা করা হলেও সেখানে সব যাত্রীর জায়গা হয়নি। অনেককে মেঝে ও চেয়ারে রাত কাটাতে হয়েছে।

মো. রোকন উর রহমান নামে আরেক যাত্রী বলেন, ফ্লাইটে থাকা প্রবীণদের মধ্যে ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত অনেক যাত্রী রয়েছেন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার কারণে তারা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। খাবার পেতেও দেরি হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

ভুক্তভোগী যাত্রীদের অভিযোগ, যাত্রীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ, ইনস্যুলিন ও জরুরি জিনিসপত্র লাগেজে থাকায় তারা সেগুলো সময়মতো ব্যবহার করতে পারেননি। শিশুদেরও খাবার ও প্রয়োজনীয় সুবিধা নিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে লাউঞ্জে জায়গা না হওয়ায় অনেকে মেঝেতেই বসে ও শুয়ে ছিলেন।

মেরামত করতে গেছে বিমানের প্রকৌশলী দল : এদিকে উড়োজাহাজটির কারিগরি ত্রুটি মেরামতের জন্য ঢাকায় থাকা প্রকৌশলী দল ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম রোমে পাঠিয়েছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। এগুলো বিজি-৩০৫ ফ্লাইটে রোমে পৌঁছানোর কথা।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের জনসংযোগ বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিজি-৩০৬ ফ্লাইটের উড়োজাহাজ ঝ২-অঔণ বর্তমানে রোমের ফিউমিচিনো বিমানবন্দরে এওজি অবস্থায় রয়েছে। ত্রুটি নিরসনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রকৌশলী ও যন্ত্রপাতি বিজি-৩০৫ ফ্লাইটে রোমে পাঠানো হচ্ছে।

বিমানের দেওয়া সর্বশেষ সময়সূচি অনুযায়ী, প্রকৌশলী দল ও সরঞ্জাম রোমে পৌঁছানোর পর কারিগরি ত্রুটি সফলভাবে মেরামত করা গেলে বিজি-৩০৬ গতকাল শনিবার ইতালির স্থানীয় সময় রাত ১১টায় রোম থেকে ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করতে পারে। সে ক্ষেত্রে ৯ আগস্ট বাংলাদেশ সময় বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে।

তবে ত্রুটি নিরসন ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা পরীক্ষা সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার ওপরই নির্ভর করছে ফ্লাইটটির পরবর্তী যাত্রা।

বিমান কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে রোমে আটকেপড়া যাত্রীদের জন্য খাবার, লাউঞ্জ ও প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করার কথা জানানো হলেও যাত্রীদের অভিযোগ, বাস্তব পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। বিশেষ করে বাংলাদেশি পাসপোর্টধারী যাত্রীদের দীর্ঘ সময় বিমানবন্দরে অবস্থান, পর্যাপ্ত বিশ্রামের সুযোগের অভাব, খাবার পেতে বিলম্ব এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ ব্যবহারে সমস্যার কারণে দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়।

ফ্লাইটে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রী থাকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

এদিকে একই উড়োজাহাজে পরিচালিত হওয়ায় ঢাকা থেকে রোম হয়ে টরন্টোগামী বিজি-৩০৫ ফ্লাইটের সময়সূচিও পরিবর্তন করা হয়েছে। উড়োজাহাজটির কারিগরি ত্রুটি পুরোপুরি নিরসন এবং নিরাপত্তা পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত পরবর্তী ফ্লাইট পরিচালনা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস জানিয়েছে, যাত্রীদের নিরাপত্তাই তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তী আপডেট জানানো হবে।

১০০ যাত্রীকে হোটেলে স্থানান্তর : বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জানিয়েছেন, বিমানের ওই ফ্লাইটের প্রায় ১০০ যাত্রীকে ইতিমধ্যে হোটেলে স্থানান্তর করা হয়েছে। বাকি যাত্রীদের বিমানবন্দরের লাউঞ্জে রাখা হয়েছে। অসুস্থ, বয়স্ক, নারী ও শিশুদের বিশেষ যতেœর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় খাবার ও ওষুধপত্রের ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। গতকাল রাতে রাজধানীর একটি হোটেলে এক্সিকিউটিভ কাপ গলফ টুর্নামেন্টের অ্যাওয়ার্ড প্রদান অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, উড়োজাহাজ মেরামতের কাজ চলছে। দূতাবাসের কর্মকর্তারা সার্বক্ষণিক বিমানবন্দরে খোঁজখবর রাখছেন। ঢাকা থেকেও সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন তারা।

এর আগে গলফ অ্যাওয়ার্ড  প্রদান অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, গলফের মাধ্যমে দেশে পর্যটন ও আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব বাড়ানোর বড় সুযোগ রয়েছে। অনুষ্ঠানে এক্সিকিউটিভ কাপ গলফ টুর্নামেন্টের বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী।