প্রতিভাবান হওয়া সত্ত্বেও অনেকে ক্যারিয়ারে সফল হতে পারে না। মেধা এবং দক্ষতা থাকার পরও অঙ্কুরেই ঝরে যায় সঠিক দিকনির্দেশনার অভাবে। সফল ক্যারিয়ারের জন্য শিক্ষাজীবনেই যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ করা এবং সে অনুযায়ী কাজ করা প্রয়োজন। সফল ক্যারিয়ার গড়ার কৌশল জানিয়েছেন শাহ জামান
নিজের সহজাত প্রতিভা খুঁজে বের করুন
সফল ক্যারিয়ারের জন্য শিক্ষাজীবনেই খুঁজে বের করতে হবে নিজের প্রতিভা। সে বিষয়ে আপনি কতটা দক্ষ তা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করুন। কোনো বিষয়ের প্রতি আগ্রহ থাকলে সে বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করা সহজ হয়। নিজের আগ্রহের বাইরে কোনো পেশায় সফল হওয়া স্রোতের বিপরীতে নৌকা চালানোর মতো পন্ডশ্রম। কারও কারও একাধিক বিষয়ে আগ্রহ থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে কোনো কিছুকে চূড়ান্ত না ধরে সেগুলোকেও পরিকল্পনাতে রাখতে হবে এবং নিয়মিত পরিচর্যা করতে হবে। ক্যারিয়ার নির্ধারণের সময় অন্যের সফলতা, ট্রেন্ড প্রভৃতি না দেখে নিজের আগ্রহকে প্রাধান্য দিতে হবে। এরপর সেই বিষয়ে দক্ষতা অর্জনের সাধনা চালিয়ে যেতে হবে। এই সাধনায় লক্ষ্য থাকবে প্রতিদিন পূর্বদিনের অর্জনকে ছাড়িয়ে যাওয়া।
লক্ষ্য নির্ধারণ করুন
নিজের সহজাত প্রতিভা খুঁজে বের করার পরবর্তী ধাপ হলো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ। যদি কোনো ব্যক্তির তথ্যপ্রযুক্তির বিষয়ে আগ্রহ ও সহজাত পারদর্শিতা থাকে তাহলে দ্বিতীয় ধাপে তাকে নির্ধারণ করতে হবে তিনি প্রোগ্রামার হবেন, প্রকৌশলী হবেন, নাকি তথ্য-প্রযুক্তি ক্ষেত্রের অন্য কোনো দায়িত্ব পালন করবেন। কারও যদি কারও চিকিৎসাসেবার প্রতি আগ্রহ থাকে তাহলে তিনি চিকিৎসাক্ষেত্রে ক্যারিয়ার তৈরির সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। শুধু চিকিৎসক হওয়া-ই না, বরং সেবক-সেবিকা, ওষুধ প্রস্তুতকারক, গবেষক প্রভৃতি হতে পারে তার সম্ভাব্য ক্যারিয়ার। আগ্রহের বিষয় এবং ক্ষেত্র অন্যের কাছে যত ছোটই মনে হোক না কেন, তাকে তুচ্ছজ্ঞান না করে বরং উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সে ক্ষেত্রে একজন বিশেষজ্ঞ হওয়া।
সময়ের যথাযথ ব্যবহার
সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ জীবন হলো সময়ের সমষ্টি। সময়কে যে যেভাবে ব্যবহার করে তার জীবন সেভাবে গড়ে ওঠে। শিক্ষাজীবনে সময়ের সদ্ব্যবহার করতে ব্যর্থ হলে সফল ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব হয় না। দুঃখের ব্যাপার হলো, ছাত্রজীবনেই সময়ের অপচয় হয়ে থাকে। তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে মনের অজান্তেই অনেক তরুণ জড়িয়ে পড়েন অহেতুক এবং অপ্রয়োজনীয় কর্মকান্ডে। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য দরকার সময়ের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। ক্যারিয়ার ও জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ এবং পরিকল্পনা গ্রহণ সময়ের এই অপচয় রোধ করে। লক্ষ্য নির্ধারিত থাকে বলে অপ্রয়োজনীয় কাজ সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব হয়।
কাজ করুন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে
কাজ অসীম কিন্তু সময় নির্দিষ্ট। তাই প্রতিটি কাজ করতে হবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে। সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করতে পারার মন্ত্র হলো অগ্রাধিকার নির্বাচন করা। শিক্ষার্থীরা প্রায়ই অগ্রাধিকার নির্বাচন করতে ব্যর্থ হয়। ফলে সঠিক সময়ে সঠিক কাজ কিংবা সময়ের কাজ সময়ে করা সম্ভবপর হয় না। স্থান, কাল, পাত্র এবং আগ্রহভেদে অগ্রাধিকার ভিন্নতর হতে পারে। কোন কাজ কখন করবেন তা ঠিক করার আগে গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রথমে করতে হবে এমন কাজ তালিকার প্রথমে রাখুন।
হতাশাকে প্রশ্রয় দেবেন না
যথেষ্ট মেধা এবং দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ে গৌরবময় ক্যারিয়ার গঠনের নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না। জীবনের কোনো পর্যায়েই হতাশাকে প্রশ্রয় দেবেন না সেটা ছাত্রজীবনই হোক কিংবা পেশাগত জীবন। হতাশা থেকে নিজের ওপর অনাস্থা বৃদ্ধি পেতে থাকে, নিজের মেধা এবং পারদর্শিতা নিয়ে নিজের মধ্যেই প্রশ্নের সৃষ্টি হয়। অতিরিক্ত হতাশা মানুষকে ক্রমে অপরাধপ্রবণতা, এমনকি আত্মহত্যার দিকে নিয়ে যায়। নির্দিষ্ট সময়ে কাক্সিক্ষত অবস্থানে পৌঁছাতে না পারলেও হাল ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। বরং অধ্যবসায় একজনকে পৌঁছে দিতে পারে সাফল্যের স্বর্ণশিখরে। তা ছাড়া মনে রাখতে হবে, প্রতিটি বৃক্ষেরই ফলবান হওয়ার নির্দিষ্ট সময় আছে। তার আগে ফল লাভ করা যায় না। তাই যথাযথ পরিশ্রম করার পরও ফল না পেলে ধৈর্যধারণ করে সাধনা চালিয়ে যাওয়াই শ্রেয়।
অতীত অভিজ্ঞতা কাজে লাগান
আমরা সাধারণত অতীত চারণা করি বা অতীত নিয়ে হা-হুতাশ করি। কিন্তু সফল ব্যক্তিরা অতীতকে আঁকড়ে ধরে নয়, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবনযাপন করেন। অতীত ভুলে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং সাফল্যমন্ডিত অতীত থেকে অনুপ্রেরণা এবং ব্যর্থতায় পর্যবসিত অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়াটাই হতে পারে ভবিষ্যৎ সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি। অতীতের কর্মকান্ডের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ করে ভুল-ত্রুটিগুলো চিহ্নিত করুন। তারপর ধাপে ধাপে সেগুলো সংশোধন শুরু করুন। সবশেষে ভবিষ্যতে যেন একই ধরনের ভুল-ত্রুটি না হয়, সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখুন। এক্ষেত্রে ব্যক্তি এবং পেশাগত জীবনে সফল ব্যক্তিদের জীবনী হতে পারে অনুকরণীয় আদর্শ। সফল ব্যক্তিদের জীবনাচরণ জানতে জীবনীগ্রন্থ পড়ার অভ্যাস তৈরি করুন।
নিয়তিনির্ভর হবেন না
অনেকেই নিয়তি কিংবা প্রকৃতিকে দোষারোপ করে থাকেন। অধ্যবসায় না করে শুধু নিয়তির ওপর ভরসা করলে সফল হওয়া যায় না। চেষ্টা, সাধনার পাশাপশি সর্বাবস্থায় ধৈর্য ধরার মানসিকতা থাকতে হবে। পরিশ্রম করলেই সফল হওয়া যায় না। প্রজ্ঞার সঙ্গে পরিশ্রম করলে সাফল্য অবশ্যম্ভাবী। নিজের দক্ষতা, দুর্বলতা, আগ্রহ প্রভৃতির সঙ্গে সঙ্গে পারিপাশির্^ক অবস্থা, সুযোগ, নতুন সম্ভাবনা প্রভৃতি সম্পর্কে বিশদভাবে ভেবে ক্যারিয়ার গড়ার পরিকল্পনা এবং কাজ করতে হবে। মেধা, পরিশ্রমের মানসিকতা ও প্রজ্ঞার যথাযথ সমন্বয়ে যে কেউ সফলতা লাভ করতে পারে। কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি নিয়তি বা ভাগ্যকে দোষ দিয়ে বসে থাকে, নিজের ভুল কোথায় তা খুঁজে বের না করে তাহলে ব্যর্থতা থেকে তার মুক্তি ঘটবে না। তাই নিয়তির দোষ দিয়ে নিজের ব্যর্থতাকে আড়াল না করে ব্যর্থতার কারণ খুঁজে বের করো এবং পুনরায় চেষ্টা করুন।