বন্ড লাইসেন্স ছাড়া ব্যাংক গ্যারান্টির বিপরীতে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৩০ শতংশ স্থানীয় মূল্য সংযোজনের (ভ্যালু এডিশন) শর্ত পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছেন তৈরি পোশাক খাতের শিল্প উদ্যোক্তারা। এ সুবিধা বিগত অর্থবছরে থাকলেও চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রত্যাহার করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), যার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল এনবিআর চেয়ারম্যান বরাবর এক চিঠিতে মূল্য সংযোজন সুবিধা পুনর্বহালের দাবি জানান। এতে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএসহ খাত-সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যবসায়ীদের সম্মতি রয়েছে। গতকাল রবিবার এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, এনবিআর একটি বিশেষ প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তৈরি পোশাক, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, প্লাস্টিক, ইস্পাত এবং হালকা প্রকৌশলসহ কয়েকটি নির্দিষ্ট রপ্তানিমুখী খাতের জন্য ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের নিয়মটি বাধ্যতামূলক করে। পরবর্তীতে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে একটি নতুন প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই শর্তটি সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়। আর এই পরিবর্তনের বিপক্ষে ব্যবসায়ীরা তীব্র আপত্তি জানাচ্ছে। বিষয়টি সমাধানে এনবিআরকে চিঠি দিয়েছেন তারা।
ব্যবসায়ীরা জানান, উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, গ্যাস ও বিদ্যুতের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা এবং তারল্য সংকটের এই কঠিন সময়ে দেশের শিল্পায়ন, বিনিয়োগ সুরক্ষা ও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি বজায় রাখতে কাঁচামাল আমদানিতে ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত বজায় রাখা জরুরি।
চিঠিতে সংগঠনগুলো বলেছে, সম্প্রতি বাজেট প্রণয়নের সময় নন-বন্ডেড প্রতিষ্ঠানে আমদানিকৃত কাঁচামালের বিপরীতে মূল্য সংযোজনের শর্তে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় শিল্পের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ, প্রাইমারি টেক্সটাইল খাত বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের প্রধান পশ্চাৎ-সংযোগ হিসেবে কাজ করে। স্থানীয় মিলগুলো যদি পোশাকশিল্পের প্রয়োজনীয় সুতা ও কাপড়ের জোগান দিতে না পারে, তাহলে আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়বে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে। ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজনের শর্ত বজায় থাকলে স্থানীয় উৎপাদন ও শিল্পের বিকাশ নিশ্চিত হবে বলে মনে করছে সংগঠনগুলো।
সংগঠনগুলো জানায়, কাঁচামাল আমদানির বিপরীতে রপ্তানিতব্য পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মূল্য সংযোজনের বাধ্যবাধকতা থাকায় আমদানিকারকরা কী পরিমাণ মূল্য সংযোজন করছেন, তার ওপর নজরদারি রাখা সহজ হয়। এটি কোনো ধরনের কারচুপি বা বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের পথ বন্ধ করতে সহায়তা করে বলেও দাবি তাদের।
বর্তমানে দেশের প্রাইমারি টেক্সটাইল খাতে প্রায় ১ হাজার ৮৮৩টি সদস্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং এ খাতে প্রায় ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ রয়েছে। এই বিশাল বিনিয়োগ রক্ষা এবং বিশ্ববাজারে টেকসই অবস্থান নিশ্চিত করতে মানসম্মত পণ্য উৎপাদন ও স্থানীয় মূল্য সংযোজন অপরিহার্য বলে মনে করছে সংগঠনগুলো।
সংগঠনগুলোর যৌথ প্রস্তাবনায় শুধু মূল্য সংযোজন নয়, বরং পুরো রপ্তানি খাতের ব্যয় কমানোর ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নগদ সহায়তার বিপরীতে বর্তমানে উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হলেও এটিকে চূড়ান্ত করদায় হিসেবে গণ্য করার দাবি।
সংগঠনগুলোর আরও দাবির মধ্যে রয়েছে, গ্রুপভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান ঋণ একটি স্বীকৃত প্রক্রিয়া। এই ঋণের ওপর ১২ শতাংশ ‘কাল্পনিক’ সুদের বিপরীতে কর আরোপ করা হলে প্রতিষ্ঠানের নগদ প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এ ধারা থেকে রপ্তানিমুখী শিল্পকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা।
কর আইন অনুযায়ী উৎসে কর কর্তন বা জমা দিতে ভুল হলে অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ জরিমানার বিধান রয়েছে। ব্যবসায়িক ভুল বা অসাবধানতাকে অপরাধ হিসেবে না দেখে এই জরিমানা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন রপ্তানিকারকরা।
চিঠিতে পোশাকশিল্পের মতোই টেক্সটাইল খাতের আয়কর হার ১২ শতাংশ নির্ধারণ করে তা ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বহাল রাখার দাবি জানানো হয়েছে, যাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা করা যায়। আয়কর আইনের ৭২ক ধারা অনুযায়ী ১২ বছর পর্যন্ত নথিপত্র সংরক্ষণের বিধান অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও জটিল। এটি ভ্যাট ও কাস্টমস আইনের সঙ্গে সমন্বয় করে তিন বছরে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, প্রস্তাবনাগুলো বাস্তবায়িত হলে একদিকে যেমন পোশাকশিল্পের মূল কাঁচামাল সরবরাহকারী মিলগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা বাড়বে, অন্যদিকে তেমনি নতুন বিনিয়োগ উৎসাহিত হবে। বর্তমান তারল্যসংকট, উচ্চ সুদের হার এবং পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এনবিআরের ইতিবাচক পদক্ষেপই দেশের প্রধান রপ্তানি খাতকে তার হারানো প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে পারে।