বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে আস্থা সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। একটি ব্যাংকের প্রকৃত শক্তি নির্ধারিত হয় তার ভবন, বিজ্ঞাপন কিংবা প্রচারণা দিয়ে নয়; বরং তার তারল্য, গ্রাহকের আস্থা, সেবার ধারাবাহিকতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিষ্ঠানগত ভিত্তি দিয়ে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের ব্যাংকিং খাত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। কয়েকটি ব্যাংককে ঘিরে সৃষ্ট সংকটের প্রভাব পুরো খাতের ওপরই পড়েছে। আইএফআইসি ব্যাংকও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে। তবে একটি প্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন হওয়া উচিত তার বর্তমান বাস্তবতা, আর্থিক ভিত্তি এবং ভবিষ্যৎ সক্ষমতার আলোকে। সেই বিবেচনায় আইএফআইসি ব্যাংকের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
আইএফআইসি ব্যাংকের ভিত্তিকে আলাদা করে দেখার পেছনে এর মালিকানার কাঠামোও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংকটির ৩২.৭৫ শতাংশ মালিকানা বাংলাদেশ সরকারের হাতে যা দেশের বেসরকারি ব্যাংকিং খাতে একটি ব্যতিক্রমী অবস্থান। এই অংশীদারত্ব ব্যাংকটির সঙ্গে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের একটি সরাসরি যোগসূত্র তৈরি করেছে এবং এর প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থানকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। ফলে প্রায় পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা, বিস্তৃত কার্যক্রম এবং সরকারের উল্লেখযোগ্য অংশীদারত্ব সব মিলিয়ে আইএফআইসি ব্যাংকের ভিত্তি কেবল একটি বেসরকারি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়।
এই দীর্ঘ প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিই সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে ব্যাংকটিকে এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা দিয়েছে। প্রায় পাঁচ দশকের পথচলায় আইএফআইসি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের বিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থেকেছে। নতুন ধারণা, নতুন পণ্য এবং গ্রাহককেন্দ্রিক সেবার মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে ব্যাংকটি পরিবর্তিত বাজারের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। আজকের প্রতিযোগিতামূলক ব্যাংকিং বাস্তবতায় তাই আইএফআইসির শক্তি শুধু তার অতীতের ইতিহাসে নয়; বরং সেই দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে বর্তমান সক্ষমতা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনায় রূপান্তর করার সামর্থ্যওে।
আইএফআইসি ব্যাংকের অন্যতম প্রধান শক্তি হলো এর শক্তিশালী তারল্য ও তহবিল ব্যবস্থাপনা। সাম্প্রতিক সময়ে আমানত-ঋণ অনুপাত (এডিআর) এবং ঋণ-আমানত অনুপাত (এলডিআর) আরও সুসংহত হয়েছে। পাশাপাশি নগদ সংরক্ষণ অনুপাত (সিআরআর), বিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত (এসএলআর), তারল্য কভারেজ অনুপাত (এলসিআর) এবং নেট স্টেবল ফান্ডিং রেশিও (এনএসএফআর) নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্ধারিত মানের চেয়ে নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে। ফলে স্বল্পমেয়াদি তারল্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি তহবিলের স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত হয়েছে। ব্যাংকিং খাতে যখন তারল্য ও তহবিলের স্থিতিশীলতা অন্যতম আলোচিত বিষয়, তখন এসব সূচক আইএফআইসি ব্যাংকের শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি, বিচক্ষণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতারই প্রতিফলন।
এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কঠিন সময়েও ব্যাংকটির কোনো গ্রাহকের চেক তারল্য সংকটের কারণে ফেরত যায়নি এবং বিশেষ তারল্য সহায়তার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের দ্বারস্থ হওয়ার প্রয়োজন হয়নি। একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা মূল্যায়নে এই বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে আইএফআইসি ব্যাংকের শক্তি শুধু আর্থিক সূচকে সীমাবদ্ধ নয়। উদ্ভাবনী ব্যাংকিং পণ্য প্রবর্তনের ক্ষেত্রেও ব্যাংকটির রয়েছে স্বতন্ত্র অবস্থান। ২০১৭ সালে চালু হওয়া ‘আইএফআইসি আমার অ্যাকাউন্ট’ বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে একটি নতুন ধারণার সূচনা করে। একই অ্যাকাউন্টে সঞ্চয়ী হিসাবের মুনাফা, চলতি হিসাবের নমনীয়তা এবং বিভিন্ন ব্যাংকিং সুবিধার সমন্বয় ঘটিয়ে এটি গ্রাহকদের জন্য একটি সমন্বিত ব্যাংকিং সমাধান তৈরি করে। পরবর্তীকালে দেশের অনেক ব্যাংক একই ধরনের পণ্য বাজারে আনলেও এই ধারণার পথিকৃৎ ছিল আইএফআইসি।
রিটেইল ব্যাংকিংয়েও আইএফআইসি দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে। বিশেষ করে গৃহঋণ খাতে ব্যাংকটি বাংলাদেশের বাজারে নেতৃত্বের অবস্থানে পৌঁছে ছিল এবং এখনো এ খাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচিত হয়। শহর, মফস্বল এবং গ্রামীণ সব শ্রেণির গ্রাহকের জন্য গৃহঋণ সহজলভ্য করার ক্ষেত্রে আইএফআইসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
গ্রাহকসেবার ক্ষেত্রেও আইএফআইসি ব্যাংক একসময় দেশের ব্যাংকিং খাতে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ মডেল চালু করে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। একটি শাখাতেই অধিকাংশ ব্যাংকিং সেবা সম্পন্ন করার এই মডেল পরে গ্রাহকসেবার নতুন মানদ- হিসেবে বিবেচিত হয়।
দেশজুড়ে বিস্তৃত উপস্থিতি আইএফআইসি ব্যাংকের আরেকটি বড় শক্তি। বর্তমানে ১,৪০০-এর বেশি শাখা ও উপশাখা নিয়ে এটি বাংলাদেশের বৃহত্তম ব্যাংকিং নেটওয়ার্কগুলোর অন্যতম। মহানগর থেকে জেলা, উপজেলা থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম দেশের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে ব্যাংকটির উপস্থিতি সাধারণ মানুষের জন্য আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং সেবা সহজলভ্য করেছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বিস্তারে এই নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
ব্যাংকের আরেকটি বড় শক্তি তার মানবসম্পদ। ৬,০০০-এর বেশি কর্মীবাহিনীর প্রায় ৭০ শতাংশই ৩০ বছরের নিচে। এই তরুণ কর্মীরা ব্যাংকটিকে দিয়েছে উদ্যম, প্রযুক্তি গ্রহণের সক্ষমতা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে দ্রুত অভিযোজনের ক্ষমতা। তরুণ নেতৃত্ব ও অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কর্মসংস্কৃতি।
আইএফআইসি ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করে। নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পেশাগত উন্নয়ন কর্মসূচি, গ্রাহকসেবা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিং বিষয়ে নিবিড় প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে কর্মীদের প্রস্তুত করা হয়। একটি সেবাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের জন্য দক্ষ মানবসম্পদই যে সবচেয়ে বড় সম্পদ আইএফআইসি সেই দর্শনকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছে।
ডিজিটাল ব্যাংকিংয়েও আইএফআইসি ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ করে চলেছে। ওঋওঈ অধসধৎ ইধহশ অঢ়ঢ়, কিউআর পেমেন্ট, কার্ড সেবা, ডিজিটাল অনবোর্ডিং এবং ২৪ ঘণ্টা গ্রাহকসেবা সব মিলিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যাংকিংকে আরও সহজ ও ব্যবহারবান্ধব করার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক ব্যাংকিং পরিবেশে এই রূপান্তর ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করছে।
এসব উদ্যোগের বাস্তব প্রতিফলনও ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে প্রায় দেড় লাখ নতুন গ্রাহক আইএফআইসি ব্যাংকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। একই সময়ে ব্যাংকটির আমানত বেড়েছে প্রায় ১,৪০০ কোটি টাকা। ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্সে এসেছে ১৩০ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স লেনদেনেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। কোনো ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসছে কি না তার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সূচকই হলো নতুন গ্রাহক, নতুন আমানত এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমের ধারাবাহিক সম্প্রসারণ।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আইএফআইসি ব্যাংক এখন শুধু প্রবৃদ্ধির দিকে নয়, বরং টেকসই প্রবৃদ্ধির দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। শক্তিশালী তারল্য ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং গ্রাহককেন্দ্রিক উদ্ভাবন এই পাঁচটি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে ব্যাংকটি আগামী দিনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করছে।
একটি ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তৈরি হয় না; তৈরি হয় ধারাবাহিক কর্মদক্ষতা, আর্থিক শৃঙ্খলা এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষার মাধ্যমে। প্রায় পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি, দেশের অন্যতম বৃহৎ সেবা নেটওয়ার্ক, উদ্ভাবনী ব্যাংকিং পণ্য, দক্ষ মানবসম্পদ এবং সাম্প্রতিক আর্থিক অগ্রগতি সব মিলিয়ে আইএফআইসি ব্যাংক আবারও সেই আস্থার ভিত্তিকে সুদৃঢ় করার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত সামনে আরও প্রতিযোগিতাপূর্ণ হবে। সেই প্রতিযোগিতায় শেষ পর্যন্ত এগিয়ে থাকবে সেই প্রতিষ্ঠান, যার ভিত্তি শক্তিশালী, যার আর্থিক শৃঙ্খলা সুসংহত এবং যার প্রতি মানুষের আস্থা অটুট। আইএফআইসি ব্যাংক সেই পথেই এগোতে চায় দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা, দায়িত্বশীল ব্যাংকিং এবং কোটি গ্রাহকের আস্থাকে সঙ্গে নিয়ে।
