একাদশে ১৫ লাখ আসন ফাঁকা থাকার শঙ্কা

একদিকে কমছে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার। অন্যদিকে বছরের পর বছর বাড়ছে কলেজের আসন। ফলে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির পরও বিপুলসংখ্যক আসন খালি থাকার চিত্র গত কয়েক বছর ধরে নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এবার সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ ফল হওয়ার কারণে এ সংখ্যা ১৫ লক্ষাধিক হতে পারে। এর ফলে সরকারি-বেসরকারি কলেজগুলোতে নানা সংকট তৈরি হবে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় বেসরকারি কলেজ ও মাদ্রাসাগুলোতে আর্থিক জটিলতাসহ নানামুখী সংকট দেখা দেবে।

এদিকে এবারও একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি ফলের ভিত্তিতেই সম্পন্ন হবে বলে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, একাদশ শ্রেণিতে আগের মতোই এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে শিক্ষার্থী ভর্তি সম্পন্ন হবে। গতকাল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী।

কয়েক বছর আগেও যেখানে পাসের হার ছিল ৮০-৯০ শতাংশের ঘরে, সেখানে টানা দুই বছরের পতনে এবার তা নেমে এসেছে ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্নে। এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১১ শিক্ষা বোর্ডে গড়ে পাস করেছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ৩৮ জনই উত্তীর্ণ হতে পারেনি।

বিগত বছরগুলোয় পাসের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী থাকায় দেশে কলেজের সংখ্যা ও আসন সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু হঠাৎ করে পাসের হার কমতে শুরু করায় বিপাকে পড়বে নবীন ও মানহীন কলেজগুলো। বেশি ঝুঁকিতে পড়বে মফস্বলের এমপিওভুক্ত ও বেসরকারি কলেজগুলো। ২০২১ সালে রেকর্ড ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করলেও এরপর ধারাবাহিকভাবে কমেছে পাসের হার। ২০২৫ সালে তা নেমেছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশে। এবার আরও প্রায় ৬ শতাংশ কমে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে, যা গত ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। ফলে প্রশ্ন উঠছেÑ শিক্ষার্থী সংকটে অস্তিত্বের ঝুঁকিতে কতগুলো কলেজ পড়তে যাচ্ছে।

সারা দেশে কলেজ ও মাদ্রাসাগুলোতে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিযোগ্য আসন ২৬ লাখ ৬৬ হাজার বলে জানিয়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড। অপরদিকে গতকাল সোমবার প্রকাশিত ফল অনুযায়ী, এবার ১১ লাখ ৩৮ হাজার ৮৭৭ জন পাস করেছে, অকৃতকার্য হয়েছে ৬ লাখ ৯০ হাজার ৬০৮ জন। উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জন। ফলে এ বছর সব শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তি হলেও আসন খালি থাকবে ১৫ লাখ ২৭ হাজার ১২৩টি। অর্থাৎ মোট আসনের প্রায় ৫৭ শতাংশ পূরণ হবে না। গত বছর সম্ভাব্য খালি আসন ছিল প্রায় ১৩ লাখ ৬৩ হাজার। ফলে এক বছরের ব্যবধানে খালি আসন সংখ্যা বাড়তে পারে প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার।

সূত্র জানায়, ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীন কলেজগুলোতে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তিযোগ্য আসন ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি। এ ছাড়া কুমিল্লায় প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার, রাজশাহীতে ৩ লাখ ৮৬ হাজার, যশোরে ২ লাখ ২০ হাজার, চট্টগ্রামে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার, বরিশালে ১ লাখ ৭০ হাজার, সিলেট ১ লাখ ৬০ হাজার, দিনাজপুরে ৩ লাখ ৫৭ হাজার, ময়মনসিংহে ১ লাখ ৩৫ হাজার এবং বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীন একাদশ শ্রেণিতে আসন আছে ৩ লাখ ৬২ হাজারের থেকে সামান্য বেশি।

কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে সংকটের আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করেন রাজধানীর উদয়ন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক মোজাম্মেল হক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, আসন খালি থাকলে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়বে বেসরকারি ও এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে। কেননা, এসব কলেজ চলে মূলত শিক্ষার্থীদের বেতন ও ভর্তির টাকা থেকে। এখন শিক্ষার্থী ভর্তি কমে গেলে স্বাভাবিকভাবে আয় কমবে। ফলে নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিত এসব কলেজ আর্থিক সংকটে পড়বে।

শিক্ষাবিদরা মনে করেন, দেশের সব কলেজের ওপর এর প্রভাব সমান হবে না। নামি ও শহরকেন্দ্রিক কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীদের চাপ থাকলেও সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারে মফস্বল, উপজেলা ও অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত কলেজগুলো। বিশেষ করে যেসব কলেজে গত কয়েক বছর ধরে নির্ধারিত আসনের বড় অংশ খালি থাকছে, তাদের জন্য এবার পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। একটি কলেজে যদি ৫০০ আসনের বিপরীতে ২০০-২৫০ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়, তাহলে শুধু শ্রেণিকক্ষ খালি থাকবে না; পুরো প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক কাঠামোতেই চাপ তৈরি হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শিক্ষার্থী কমে যাওয়ায় সরাসরি প্রভাব পড়বে বেসরকারি ও নন-এমপিও কলেজে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোই শিক্ষার্থীদের ভর্তি ফি, বেতনসহ অন্যান্য ফি দিয়ে পরিচালন ব্যয় মেটায়। শিক্ষার্থী কমলে আয় কমবে। এতে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন দিতে হিমশিম হবে প্রতিষ্ঠানগুলোর?

সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যাপক আতিয়ার রাহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিক্ষার্থী কম পাস করায় এবং জিপিএ কমে যাওয়ায় সরকারি কলেজগুলোতে কোনো সমস্যা তৈরি হবে না। এমপিওভুক্ত কলেজগুলোতে শিক্ষার্থী কমে যাবে, এতে কলেজের আয় কমে যাবে। বেশি ঝুঁকিতে পড়বে মানহীন বেসরকারি কলেজগুলো। এতে অনেক কলেজ বন্ধ হয়ে যাওয়া বা শিক্ষক ও কর্মচারী ছাঁটাই করে খরচ কামানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

গত কয়েক বছরের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শিক্ষার্থী সংকটের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য দেখা যেতে পারে কলেজগুলোতে। অনেক ক্ষেত্রে একই এলাকার নামি কলেজে আসন পেতে শিক্ষার্থীদের প্রতিযোগিতা থাকবে। অন্যদিকে মানহীন আরেকটি কলেজে অর্ধেক আসনও পূরণ হবে না। এর কারণ শুধু শিক্ষার্থী সংখ্যা কমে যাওয়া নয়; কলেজের শিক্ষার মান, ফল, শিক্ষক উপস্থিতি, অবকাঠামো ও যাতায়াত ব্যবস্থা ভূমিকা রাখবে।

আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর সৈয়দ আক্তারুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার ঘটনা আমরা খুব কমই দেখি। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান যদি শিক্ষার মান দিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আকৃষ্ট করতে না পারে এবং সেটি বন্ধ হয়ে গেলেও তা খারাপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ভালো।