সম্মান আদায় করতে হবে বাংলাদেশকেই

ডারউইনে এখন শীত নেই, আছে ক্রিকেটের অপেক্ষা। অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্বের শহরগুলো যখন শীতের কাঁপুনিতে জড়সড়, নর্দান টেরিটরির রাজধানী তখন ৩০-৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উষ্ণতায়। এই উষ্ণতাই প্রতিবছর টেনে আনে অস্ট্রেলিয়ার ভ্রমণপিপাসু মানুষদের। এবার তার সঙ্গে মিশেছে ক্রিকেটের উত্তাপও। ২২ বছর পর ডারউইনে ফিরছে টেস্ট ক্রিকেট। প্রত্যাবর্তনের সেই মঞ্চে প্রথম অতিথি বাংলাদেশ। আগামীকাল শুরু হবে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজের প্রথমটি। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে দুই দল। অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া মৌসুম এবার আগেভাগেই শুরু হচ্ছে। সাধারণত সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে ঘরের মাঠে ক্রিকেটের আয়োজন শুরু করলেও এবার আগস্টেই সেই দরজা খুলেছে ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া। এই দরজায় প্রথম কড়া নাড়ছে বাংলাদেশ দল।

এ জন্য ডারউইনও প্রস্তুত। বিমানবন্দর থেকে শহরের রাস্তা বড় বড় ব্যানার ও বিলবোর্ডে এখন ক্রিকেটেরই জয়গান। এক মাস আগে থেকেই স্থানীয় মানুষের সঙ্গে প্রচারণায় নেমেছেন অস্ট্রেলিয়ার তারকা ক্রিকেটাররা। সেই প্রচারেরই অংশ হয়ে গত সোমবার অ্যালেক্স ক্যারি ও ডারউইনের ঘরের ছেলে জেক ওয়েদারল্ডের সঙ্গে সমুদ্রে মাছ ধরতে যান তাসকিন আহমেদ। সেখান থেকে ফিরে সামাজিক মাধ্যমে বাংলাদেশি পেসার লেখেন, ‘মাছ ধরতে গিয়েছিলাম। একটাও পাইনি। তবে মুহূর্তটা দারুণ ছিল।’

মাঠের বাইরের সেই উষ্ণতা কাল থেকে বদলে যাবে কঠিন বাস্তবতায়। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট খেলতে নামছে বাংলাদেশ। সর্বশেষ ২০০৩ সালের সেই সফরের কোনো ক্রিকেটার এবার মাঠে নেই। তবে সেই দলের দুই সদস্য হাবিবুল বাশার ও মোহাম্মদ আশরাফুল আছেন নতুন ভূমিকায়। হাবিবুল প্রধান নির্বাচক, আশরাফুল ব্যাটিং কোচ। ডারউইনে সেবার ইনিংস ব্যবধানে হেরেছিল সফরকারীরা। এবার নিশ্চয়ই সে গল্পের পুনরাবৃত্তি চাইবেন না তারা।

অধিনায়ক নাজমুল হোসেনের কথায় বরং অন্য গল্প লেখার আকাক্সক্ষা। দেশ ছাড়ার আগে বলেন, ‘মূল লক্ষ্য থাকবে, ভালো ক্রিকেট খেলে কীভাবে সম্মানটা আনতে পারি। যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে পারি, আবার হয়তো ডাকবে।’ তাসকিনের কণ্ঠেও একই প্রত্যয়, ‘অস্ট্রেলিয়ার মতো দলের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ খেলতে এখানে আসতে পেরে আমরা সম্মানিত। কোনো সন্দেহ নেই যে ওরা বিশ্বের অন্যতম সেরা দল। ওদের মাটিতে এসে ওদের বিপক্ষেই টেস্ট খেলা আমাদের জন্য অনেক বড় এক গর্বের বিষয়। আমরা আমাদের সেরাটাই দেওয়ার চেষ্টা করব। সিরিজটা সহজ হবে না। তবু অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দারুণ কিছু করার ব্যাপারে আমরা আশাবাদী।’

তবে সেই আশার প্রথম পরীক্ষা ভালো যায়নি। ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে দ্বিতীয় ইনিংসে মাত্র ৫৪ রানে অলআউট হয়ে ইনিংস ব্যবধানে হারে সফরকারীরা। টেস্টের আগে এমন ধাক্কা আত্মবিশ্বাসে চাপ ফেলতেই পারে। তবে অস্ট্রেলিয়ার আগ্রাসী ব্যাটার ট্রাভিস হেড মনে করিয়ে দেন, ‘প্রস্তুতি ম্যাচগুলো এমনই হয়। জীবনে আমিও অনেক বাজে ম্যাচ খেলেছি।’

বাংলাদেশও এই ম্যাচকে কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার শিক্ষা হিসেবে দেখছে। গতকাল বাংলাদেশের ফিল্ডিং কোচ আশিক মজুমদার বলেন, ‘একটা অনুশীলন ম্যাচ খেলায় অনেক ভালো হয়েছে। কন্ডিশন আমাদের মনের ভেতরে। পৃথিবীর যেকোনো জায়গাতেই যত দ্রুত আমি মানিয়ে নিতে পারব ততই ভালো। আমরা অনেক আগে এখানে এসেছি। খেলোয়াড়রা মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। অনেকটা হয়ে গেছে। আমি বলব ৯০ শতাংশ হয়ে গেছে।’

বাকি ১০ শতাংশই হয়তো কাল সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কারণ অভিজ্ঞতার পাল্লায় দুই দলের ব্যবধান বিস্তর। অস্ট্রেলিয়ার ১৩ সদস্যের দলে তিনজন শতাধিক টেস্ট খেলা ক্রিকেটার আছেণ। নাথান লায়ন ১৪১, স্টিভ স্মিথ ১২৩ এবং মিচেল স্টার্ক ১০৫টি। বাংলাদেশের একমাত্র মুশফিকুর রহিমেরই আছে শত টেস্টের অভিজ্ঞতা। স্পিনে লায়নের ১৪১ টেস্টের বিপরীতে তাইজুল ইসলাম ও মেহেদী হাসান মিরাজ মিলে খেলেছেন ১১৮টি ম্যাচ। লায়নের উইকেট ৫৬৭টি, তাইজুল ও মিরাজের সম্মিলিত শিকার ৪৮৯টি। পেস বিভাগে ব্যবধান আরও প্রকট। স্টার্ক একাই নিয়েছেন ৪৩৩ উইকেট। অভিষেকের অপেক্ষায় থাকা মুশফিক হাসানকে বাদ দিলে বাংলাদেশের অন্য চার পেসারের উইকেট ১৬৮টি। তবু বাংলাদেশ নামের ভারকে ভয় পেতে রাজি নয় বলে দাবি আশিকের, ‘নামের পরিচয় বলে আলাদা কিছু নেই। আমাদের খেলোয়াড়রাও বেশ অভিজ্ঞ, অনেক দিন ধরে টেস্ট খেলছে। তারা জানে কাকে কীভাবে মোকাবেলা করতে হয়।’

বাংলাদেশের পরিকল্পনায় অবশ্য বড় ধাক্কা নাহিদ রানা ও শরিফুল ইসলামের চোট। বিশেষ করে নাহিদকে ঘিরে অস্ট্রেলিয়া সফরে বড় স্বপ্ন ছিল। দুই ম্যাচ থেকেই ছিটকে গেছেন এই ডানহাতি পেসার। স্বস্তি হয়ে ফিরেছেন লিটন দাস। গতকাল অনুশীলনে কিপিং ও সিøপে ক্যাচিং করেছেন তিনি। তার খেলার সম্ভাবনা নিয়ে আশিক বন, ‘লিটন কিপিং ও সিøপে ক্যাচ অনুশীলন করেছে। তার মুভমেন্ট অনেক ভালো।’

ডারউইনের পিচও লড়াইয়ের মঞ্চ তৈরি করে রেখেছে। কিউরেটর জ্যাক পি হেড বলেছেন, ‘প্রতিপক্ষ বাংলাদেশও বেশ অভিজ্ঞ দল। তাই আমরা ভারসমপূর্ণ পিচ চাই, যেটা খেলার জন্য ভালো হবে। চতুর্থ ও পঞ্চম দিনে উইকেট চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে। তবে আমরা ভারসাম্যপূর্ণ পিচ তৈরির চেষ্টাই করেছি। পিচে মানিয়ে নেওয়া জরুরি। টিপিক্যাল অস্ট্রেলিয়ান পিচ বলতে যা বোঝায়, আসলে দেশের সব পিচ তেমনই আচরণ করে। তাই এখানেও ব্যতিক্রম হবে না। আমি আশা করছি, কনসিস্টেন্ট গুড ব্যাটিং উইকেট থাকবে। বোলাররা পরিশ্রমের সুফল পাবে।’

দীর্ঘদিন পর অস্ট্রেলিয়ায় খেলতে গিয়ে এরই মধ্যে সম্মান পেয়েছেন বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা। এবার মাঠের লড়াই সম্মান অর্জনের পালা। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্ট খেলা যেমন বড় গর্ব, তেমনি বড় পরীক্ষাও। আগামীকাল ডারউইনে সেই পরীক্ষার প্রথম দিন। ২৩ বছর পর ফিরে বাংলাদেশ তাই শুধু একটি টেস্ট খেলতে নামবে না, নামবে নিজেদের ক্রিকেটের পরিচয়টাও নতুন করে জানান দিতে। জয় এলে ইতিহাস বদলাবে আর শেষ পর্যন্ত লড়াইটা পারলেও হয়তো দৃষ্টিভঙ্গি বদলাবে অজিদের!