সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই ও শাল্লা) আসনের সংসদ সদস্য নাছির উদ্দিন চৌধুরীর দিরাইয়ের গ্রামের বাড়িটি ফিরে পেতে চান তার স্ত্রী ও সন্তানরা। তার পৈতৃক সম্পত্তি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ। নাছির উদ্দিন চৌধুরীর অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে গলায় রামদা ঠেকিয়ে সম্পত্তি লিখে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ এনে মামলা করেছেন তার স্ত্রী পারভীন আক্তার। মামলার অন্যতম আসামি নাছির চৌধুরীর সৎভাই, যিনি দিরাই উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক।
গত সোমবার নাছির উদ্দিন চৌধুরীর তিন সৎভাইসহ আটজনের বিরুদ্ধে সুনামগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি করেন। বিচারক মো. জসিম মামলাটি গ্রহণ করে বিষয়টি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দিয়েছে। আদালতের পেশকার মুহিত লাল চন্দ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলার আসামিরা হলেন নাছির উদ্দিন চৌধুরীর সৎভাই মঈন উদ্দিন চৌধুরী মাসুক, মিজানুর রহমান চৌধুরী ও মোসলেহ উদ্দিন চৌধুরী। অন্য আসামিরা হলেন দিরাই উপজেলার মাতারগাঁও গ্রামের মৃত নাজমুল ইসলামের ছেলে আমিরুল ইসলাম, পুরাতন কর্ণগাঁও গ্রামের আব্দুন নুর মিয়ার ছেলে ছয়ফুল চৌধুরী, দলিল লেখক মুজিবুর রহমান, কলিয়ার কাপনের নাজমুল ইসলামের ছেলে তাজুল ইসলাম এবং দিরাইয়ের নুরুল ইসলামের মেয়ে মোহরার মমতাজ বেগম।
মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, নাছির চৌধুরী স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ ছিলেন। এ সুযোগে মৃত্যুর পর নাছির চৌধুরীর বাড়িসহ সম্পত্তি থেকে তার দুই স্ত্রী ও সন্তানকে বঞ্চিত করে আত্মসাতের জন্য সৎভাইয়েরা আগে থেকেই পরিকল্পনা করে আসছিল। এজাহারে বলা হয়, ২০২২ সালের জানুয়ারি মাসে স্ত্রী পারভীন আক্তার স্বামীর নাছির উদ্দিন চৌধুরীকে দেখতে ঢাকা থেকে দিরাইয়ের বাড়িতে গেলে মারপিটের শিকার হন। এরপর তিনি অসুস্থ নাছির চৌধুরীকে সেখানে তার প্রথম স্ত্রী নিঃসন্তান শেলী চৌধুরী ও বোন শামীমা চৌধুরীর কাছে রেখে যান। এই দুজনও তখন অসুস্থ ছিলেন।
ওই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২০২২ সালের ২৫ জানুয়ারি দিরাই এসআর অফিসের দুই কর্মচারীকে কর্মকর্তা পরিচয়ে নাছির উদ্দিন চৌধুরীর বাড়িতে পাঠানো হয়। অসুস্থ ও মানসিকভাবে অবুঝ নাছির উদ্দিন চৌধুরীকে দিয়ে দলিলে স্বাক্ষর করানোর চেষ্টা করা হলে তিনি এতে অসম্মতি জানান। পরে তার গলায় রামদা ধরে স্বাক্ষর না করলে গলা কেটে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। এ সময় স্ত্রী শেলী চৌধুরী বাধা দিলে আাসমিরা তাকেও হত্যার হুমকি দেন। পরে তিনি দলিলে সই করেন।
মামলার আরজিতে পারভীন আক্তার দাবি করেন, পরে তিনি এসে পুলিশের সহায়তায় নাছির চৌধুরীকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যান। সেখানে কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর তিনি জোর করে দলিলে সই নেওয়ার বিষয়টি তাকে জানান। বিষয়টি নিয়ে পরে নানা আলোচনা-সমালোচনা হলে আসামিরা ক্ষমা চান এবং দ্রুত দলিল বাতিলের উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত তারা কোনো উদ্যোগ নেননি। ঘটনার পর শেলী চৌধুরী ও শামীমা চৌধুরী দুজনই মারা গেছেন।
পারভীন আক্তার বলেন, দিরাই পৌরসভার আনোয়ারপুর বালুমাঠের পেছনের বাড়ি মাসুক গং দখলে নিয়েছে। থাকার মতো জায়গা নেই। বর্তমানে আমরা একটি ছোট ঘরে স্বামী ও দুই কন্যা সন্তানকে নিয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছি। আমি আমার স্বামীর বাড়িটি ফেরত পাওয়ার জন্য আইনের আশ্রয় নিয়েছি। আমরা ন্যায়বিচার চাই।
অভিযোগের বিষয়ে মঈন উদ্দিন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পারিবারিকভাবে কিছু ঝামেলা আছে। ভাই নাছির উদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রী মামলা করেছেন বলে শুনেছি। তা কীসের মামলা জানি না, জেনে আইনিভাবে মোকাবিলা করব।’
নাসির উদ্দিন চৌধুরী একজন জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ। তিনি বিগত শতাব্দীর ষাটের দশকে ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৬৬ সালে সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের জিএস নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৬৮ সালে সিলেট এমসি কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি এবং ১৯৭০ সালে মৌলভীবাজার সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৮৫ ও ১৯৮৯ সালে দুবার তিনি দিরাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির হয়ে সুনামগঞ্জ-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বিএনপিতে যোগ দিয়ে ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি দীর্ঘদিন অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে এমপি নির্বাচিত হয়েছেন।
গত নির্বাচনের পর নাছির চৌধুরীর সৎভাইদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। গত ৬ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর উপলক্ষে দিরাই শহরে বিএনপি আয়োজিত এক সমাবেশ নাছির চৌধুরী বলেন, তার কোনো ভাই নেই। তিনি একা। এর একদিন পর মঈন উদ্দিন চৌধুরীর নেতৃত্বে দিরাইয়ে আরেকটি সমাবেশ হয়। এতে মঈন উদ্দিন চৌধুরী বলেন, নাছির চৌধুরীকে একটি লুটেরা সিন্ডিকেট ঘিরে রেখেছে। তারা এদের কবল থেকে তাকে মুক্ত করতে চান।