শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নবনির্মিত থার্ড টার্মিনালের আধুনিক গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও সিকিউরিটি স্ক্রিনিং সরঞ্জাম পরিচালনায় অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হাজার কোটি টাকার সরঞ্জামাদি ক্রয় করা হয়েছে। এর মধ্যে কেনা-কাটাসহ বিভিন্ন বিষয়ে দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। নতুন স্ক্যানার মেশিন পরিচালনা করা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অনভিজ্ঞদের দিয়ে ২০টি স্ক্যানার মেশিন চালানোর পাঁয়তারা করছে একটি চক্র। আগামী ১৬ ডিসেম্বর টার্মিনালটি উদ্বোধন করার কথা থাকলেও এর প্রস্তুতি নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এ বিষয়ে গত রবিবার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে মেশিন কেনা নিয়ে বৈঠক হয়। স্ক্যানার মেশিন কিনতে কেন দেরি হচ্ছে তা নিয়ে ঊর্ধ্বতনদের তোপের মুখে পড়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তবে কর্মকর্তাদের দাবি একটি গ্রুপ পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ দিতে তোড়জোড় করায় কেনাকাটায় দেরি হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানান, আগামী ১৬ ডিসেম্বর থার্ড টার্মিনাল উদ্বোধন করতে তোড়জোড় চলার মাঝে সুযোগ নিচ্ছে জাপানসহ আরও কয়েকটি দেশ। এই নিয়ে মন্ত্রীদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক হয়েছে। বৈঠকে চূড়ান্ত হয়েছে টার্মিনাল পরিচালনা করবে জাপান। রাজস্বের ৭৩ শতাংশ পাবে জাপান আর বাংলাদেশ পাবে মাত্র ২৭ শতাংশ। রাজস্বের বেশি অংশ ভিনদেশের পকেটে যাওয়া নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে থার্ড টার্মিনাল চালুর বিষয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মোস্তফা মাহমুদ সিদ্দিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, থার্ড টার্মিনাল ডিসেম্বরে উদ্বোধন করতে আপ্রাণ চেষ্টা করছি। ইতিমধ্যে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
কাস্টমসের প্রস্তুতি অসম্পূর্ণ : সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টার্মিনাল চালুর নির্দেশনা থাকলেও কাস্টমসের প্রস্তুতি এখনো অসম্পূর্ণ। বেবিচক থেকে তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও ২০টি স্ক্যানিং মেশিন স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেনি কাস্টম কর্তৃপক্ষ। এ অবস্থায় নির্ধারিত সময়ে থার্ড টার্মিনাল চালুর বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রায় দেড় বছর আগে এনবিআর ২০টি স্ক্যানার মেশিন কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তাতে অংশ নেয়। এক বছর ঝুলে থাকার পর অজ্ঞাত কারণে ওই দরপত্র বাতিল হয়ে যায়। গত ৮ ফেব্রুয়ারি ফের দরপত্র আহ্বান করা হয়। দরপত্রে কয়েকটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। দরপত্র উন্মুক্ত করার তিন মাস পেরিয়ে গেছে। কিন্তু কার্যাদেশ দেওয়ার বিষয়ে এনবিআর এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। টার্মিনালে আন্তর্জাতিক মানের কাস্টমস কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ১৬টি ব্যাগেজ এক্স-রে স্ক্যানিং মেশিন ও ৪টি কার্গো স্ক্যানার দরকার। এসব স্ক্যানার ছাড়া আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী যাত্রী ও পণ্যের নিরাপত্তা যাচাই এবং কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।
পুরনো স্ক্যানার মেশিন স্থানান্তরের চেষ্টা : বেবিচক সূত্র জানায়, শাহজালালের পুরনো টার্মিনালে ব্যবহৃত ১৬টি ব্যাগেজ এক্স-রে স্ক্যানিং মেশিন নতুন টার্মিনালে স্থানান্তরের চেষ্টা চললেও সুযোগ নেই। কারণ মেশিনগুলো সরিয়ে নিলে বিদ্যমান টার্মিনালের কাস্টমস কার্যক্রম ব্যাহত হবে। আবার সেগুলো পুরনো টার্মিনালেই রেখে দিলে নতুন টার্মিনালে কাস্টমসের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে না। একই ধরনের জটিলতা রয়েছে কার্গো হ্যান্ডলিং কার্যক্রমেও। বর্তমানে ব্যবহৃত ৪টি প্যালেট (কার্গো) স্ক্যানার পুরনো কার্গো টার্মিনালের জন্য অপরিহার্য। এগুলো নতুন টার্মিনালে স্থানান্তর করলে বিদ্যমান কার্গো হ্যান্ডলিং কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে। বেবিচক ও মন্ত্রণালয়ের একটি গ্রুপ চাচ্ছে আপাতত পুরনো স্ক্যানার দিয়ে চালিয়ে নিতে।
তোপের মুখে কর্মকর্তারা : নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্ক্যানার কেনার দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, এনবিআরের স্ক্যানিং মেশিন কেনার দরপত্র নথির একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে বিভ্রান্তি এড়াতে আমরা সিপিটিইউয়ের লিখিত মতামত নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দরপত্রে সিসি ক্যামেরা, ফিঙ্গারপ্রিন্ট মেশিন বা আন্ডারভেহিক্যাল স্ক্যানার সরবরাহের অভিজ্ঞতা অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে মূল্যায়ন কমিটির অধিকাংশ সদস্যের অস্পষ্টতা রয়েছে। কাজটিতে শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং কমিটির সদস্যরা যেন সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সে জন্য আইনি মতামত চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, রবিবার স্ক্যানিং মেশিন কেনা নিয়ে বৈঠক হয়েছে মন্ত্রণালয়ে। এখনো কেন মেশিন কেনা হয়নি তা নিয়ে তোপের মুখে পড়তে হয়েছে আমাদের। আমরা বলেছি, যারা অভিজ্ঞ তাদের পরিচালনায় দিলেই ভালো। কিন্তু একটি চক্র অনভিজ্ঞদের দিয়ে কাজ করাতে চাচ্ছে। মূলত পছন্দের ব্যক্তিকে কাজ পাইয়ে দিতেই এ পরিস্থিতি হয়েছে। এর পেছনে কলকাঠি নাড়ছেন কয়েকজন প্রভাবশালী। একের পর এক প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করে কার্যাদেশ বিলম্বিত করা হচ্ছে। প্রভাবশালীদের কারণে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছি আমরা। দরপত্র মূল্যায়নের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শেষ হলেও বিভিন্ন অজুহাতে সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে। নির্দিষ্ট কিছু সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা এবং প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপের কারণেই পুরো প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে।
প্রায় ৩০ কোটি টাকায় নতুন স্ক্যানার : বিমানবন্দরের সিকিউরিটি চেকিং ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০টি নতুন অত্যাধুনিক স্ক্যানিং মেশিন কেনার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। এসব স্ক্যানার যুক্ত হলে স্ক্যানিং প্রক্রিয়া দ্রুত ও সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও সুসংহত হবে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু এত টাকা দিয়ে আধুনিক স্ক্যানার বা যন্ত্রপাতি কিনলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। এসব যন্ত্র সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য আন্তর্জাতিক মানের সনদপ্রাপ্ত ও দক্ষ অপারেটর নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করাই মূল চ্যালেঞ্জ। আইকাও নির্দেশনা অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্ক্যানার পরিচালনার জন্য কেবল অপারেটরদের সনদ থাকাই যথেষ্ট নয়, নির্দিষ্ট সময় পরপর তাদের ‘রিক্যারেন্ট ট্রেনিং’ দেওয়া বাধ্যতামূলক। অনভিজ্ঞ বা অনিবন্ধিত লোক দিয়ে স্ক্রিনিং করা হলে সাধারণ ধাতব বস্তুর সঙ্গে বিপজ্জনক বিস্ফোরক রাসায়নিক বা মাদকদ্রব্য শনাক্তে ভুল হওয়ার বড় ঝুঁকি থেকে যায়।
ভিনদেশের পকেটেই যাবে অর্থ : রাজস্ব আদায়ের বেশিরভাগ অংশ পাচ্ছে জাপানি কনসোর্টিয়াম। প্রস্তাবিত সমঝোতা অনুযায়ী পরিচালনাসংশ্লিষ্ট চারটি প্রধান খাত থেকে আদায় করা রাজস্বের ৭৩ শতাংশ পাবে জাপান এবং মাত্র ২৭ শতাংশ পাবে বাংলাদেশ। তা হলো এমবার্কেশন ফি আদায়, দোকানপাট ও লাউঞ্জ ভাড়া, কার্গো হ্যান্ডলিং চার্জ এবং কার পার্কিং ভাড়া থেকে রাজস্ব আয়। ইতিমধ্যে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ে আলোচনায় চূড়ান্ত হয়েছে। গত ১৭ মে রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (আরএফপি) জমা দিয়েছে বেবিচক। যেকোনো সময় জাপানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি সম্পন্ন হবে। তবে বিমানবন্দরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাত সরাসরি বেবিচকের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। এরমধ্যে আছে ওভারফ্লাইং চার্জ এবং বিমান অবতরণ ফি আদায়, কাস্টম, নিরাপত্তা ও ইমিগ্রেশন কার্যক্রম।
কৌশলে ‘রাজস্ব হইজ্যাক’ হচ্ছে : এই প্রসঙ্গে বেবিচকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, থার্ড টার্মিনাল নির্মাণের সিংহভাগ অর্থায়ন এসেছে জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা থেকে। স্বাভাবিকভাবেই টার্মিনাল পরিচালনা ও গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ে জাপানি কনসোর্টিয়াম অগ্রাধিকার দাবি করছে। জাপান কৌশলে আমাদের রাজস্ব ‘হাইজ্যাক’ করেছে। গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং নিয়েও আমরা পিছিয়ে পড়েছি। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ৫০ শতাংশ গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং করতে পারবে। অথচ বিমানের সব ইক্যুইপমেন্ট আছে।
বের হতে পারছে না সমস্যা থেকে : ২০২৩ সালের অক্টোবরে ‘সফট ওপেনিং’ হওয়ার পর ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ এটিকে পুরোদমে যাত্রীসেবার জন্য উন্মুক্ত করার কথা ছিল। কিন্তু নানা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক জটিলতার কারণে সেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব হয়নি। ভবনটির নকশা করেছেন বিখ্যাত স্থপতি রোহানি বাহারিন। তারপরও সমস্যা কাটছেই না।
টার্মিনালের ভেতরে যা থাকছে : থার্ড টার্মিনালে আছে কেবিন এক্সরে মেশিন ৪০টি, বোর্ডিং ব্রিজ ১২টি, কনভেয়ার বেল্ট ১৬টি, বডি স্ক্যানার ১১টি, টানেলসহ বহুতলবিশিষ্ট কার পার্কিং ৫৪ হাজার বর্গমিটার, ইমপোর্ট ও এক্সপোর্ট কার্গো কমপ্লেক্স ৬৩ হাজার বর্গমিটার, ভূমি উন্নয়ন, কানেক্টিং টেক্সিওয়ে (উত্তর) ২৪ হাজার বর্গমিটার ও কানেক্টিং টেক্সিওয়ে (অন্যান্য) ৪২ হাজার ৫শ বর্গমিটার; র্যাপিড এক্সিট টেক্সিওয়ে (উত্তর) ২২ হাজার বর্গমিটার ও দক্ষিণ ১৯ হাজার ৫শ বর্গমিটার; শোল্ডার ৯৬ হাজার ৫০০ বর্গমিটার, জিএসই রোড ৮৩ হাজার ৮শ বর্গমিটার, সার্ভিস রোড ৩৩ হাজার বর্গমিটার ইত্যাদি। টার্মিনালের অন্যতম আকর্ষণ ফানেল টানেল। ৫ লাখ ৪২ হাজার বর্গমিটারে ৩৭টি উড়োজাহাজ রাখার অ্যাপ্রোন ও ১ হাজার ২৩০টি গাড়ি রাখার সুবিধা; ১১৫টি চেক-ইন কাউন্টার। সব মিলিয়ে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিমানবন্দরের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে থার্ড টার্মিনালে।