অনুমোদিত ডিলাররা বিদেশ থেকে দেশে আসার সময় নিজের সঙ্গে ১০ কেজি পর্যন্ত সোনা আনতে পারবেন। এজন্য কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনাপত্তিপত্র (এনওসি) লাগবে না; বৈধ কাগজপত্র থাকলেই হবে। তবে এর চেয়ে বেশি সোনা আনতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদনসহ অনাপত্তিপত্র লাগবে। আগে এনওসি পেতে দশ কার্যদিবস লাগত, এখন দুই কার্যদিবসের মধ্যেই পাওয়া যাবে। বৈধ পথে আমদানি সহজ করতে ব্যবসায়ীদের এ সুযোগ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে স্বর্ণ নীতিমালা সংশোধনীর খসড়ায়।
জানা গেছে, স্বর্ণ নীতিমালা-২০১৮ (সংশোধিত)-২০২১ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। চূড়ান্ত অনুমোদনের পর এটি স্বর্ণ নীতিমালা-২০১৮ (সংশোধিত)-২০২৬ নামে পরিচিত হবে। ইতিমধ্যে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বৈঠকও করেছেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়সূত্রে জানা গেছে, ব্যবসায়ীদের দাবি অনুযায়ী স্থানীয় ও রপ্তানি বাণিজ্য সহজ করতে স্বর্ণের বৈধ আমদানির সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে অনানুষ্ঠানিক আমদানি বন্ধের কোনো প্রস্তাব করা হয়নি। বিষয়টিকে আগের মতোই ‘নিরুৎসাহিত’ করার বিধানকে টিকিয়ে রাখা হয়েছে।
খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, দুই ভাবে স্বর্ণ আমদানি করতে পারবেন অনুমোদিত ডিলাররা সরাসরি বহন ও ব্যাংকিং চ্যানেলে। ব্যবসায়ীরা সরাসরি ১০ কেজি পর্যন্ত সোনা এনওসি ছাড়াই আনতে পারবেন। এ প্রক্রিয়া শেষ করতে চার থেকে পাঁচ দিনের বেশি সময় লাগবে না বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। বর্তমান নিয়মে ব্যাংকিং চ্যানেল ও বাংলাদেশ ব্যাংকের এনওসি ছাড়া সোনা আনার সুযোগ নেই। সোনা আনার জন্য সরকার ওয়ান স্টপ সলিউশন নামের একটি অনলাইন পোর্টাল চালু করতে চায়। যেসব আমদানিকারক ১০ কেজি সোনা আনতে চান তারা বৈধ কাগজপত্র যেমন ইনভয়েস, পাসপোর্টের তথ্য, উৎস সনদ, বিশুদ্ধতার সনদ, ব্যাংকিং নথি ও পরিবহনসংক্রান্ত তথ্য বিমানে ওঠার আগেই পোর্টালে আপলোড করবেন, যাতে কাস্টমস দ্রুত খালাসের উদ্যোগ নিতে পারে। এর জন্যও ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে এলসি করে লেনদেন প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে।
যেসব ডিলার ১০ কেজির বেশি সোনা আনতে চান তাদেরও ব্যাংকিং চ্যানেলে আনতে হবে। এর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের এনওসি লাগবে। তবে এনওসির জন্য সময় ১০ কার্যদিবস থেকে কমিয়ে দুই কার্যদিবস করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এজন্য ডিলারকে স্বর্ণালংকার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান বা ব্যবসায়ীর চাহিদার বিপরীতে স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকারের আমদানির চালানভিত্তিক বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ের পরিমাণ বাংলাদেশ ব্যাংককে জানিয়ে অনাপত্তিপত্র নিতে হবে।
নীতিমালা চূড়ান্ত হলে নতুন করে ডিলার নিয়োগ দেবে সরকার। তবে নীতিমালায় এমনভাবে প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে করে স্বর্ণ ব্যবসায়ী ছাড়া কেউ স্বর্ণ আমদানির লাইসেন্স নিতে না পারে।
ব্যবসায়ীদের ১০ কেজি পর্যন্ত সোনা আমদানিতে যেভাবে ছাড় দেওয়া হচ্ছে ঠিক সেভাবেই কঠোর করা হতে পারে ব্যাগেজ রুলস। কারণ ব্যাগেজ রুলসের আওতায় সাধারণ যাত্রীরা কতটুক সোনা আনতে পারবে তা নির্ধারিত হবে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) পরামর্শ অনুযায়ী।
একই সঙ্গে চোরাচালান রোধে প্রস্তাবিত খসড়ায় খুব একটা কড়াকড়ি দেখা না গেলেও ভোক্তার সোনা বিক্রিকে কঠোর করা হচ্ছে। ব্যক্তি-গ্রাহক যখন সোনা বিক্রি করবেন তখন তাকে পুরনো ক্রয়-রসিদ দেখাতে হবে, যাতে উৎস পরিষ্কার থাকে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, চোরাচালানের সোনা যাতে অর্থনীতিতে ঢুকতে ও ব্যবহৃত হতে না পারে তা নিশ্চিত করতেই আগের মূসক চালান বা অর্থগ্রহণের রসিদ দাখিল করতে হবে।
বাজুসের সভাপতি এনামুল হক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্বর্ণের ব্যবসার সঙ্গে স্মাগলিংয়ের ট্যাগ জুড়ে রাখা হয়েছে। এটাকে ধরে রাখতে একটি গোষ্ঠী নীতিমালাটিকে এতদিন কঠোর করে রেখেছিলেন। স্বর্ণের বৈধ ব্যবসা এবং তার প্রসারে ছাড় দেওয়া প্রয়োজন। সে জন্যই সরকার উদ্যোগী হয়েছে নীতিমালা সংশোধনের।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যেসব প্রস্তাব করেছি, আশা করছি সরকার তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করবে। তাহলে আমরা দ্রুত রপ্তানিতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে পারব।’
লাইসেন্স দেবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় : আরেকটি বড় পরিবর্তন আসতে পারে সংশোধিত নীতিমালায়। অনুমোদিত আমদানিকারকদের এখন লাইসেন্স নিতে হয় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে। প্রস্তাবে এ ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে, যাতে ব্যবসায়ীরা সহজে সোনা আমদানির লাইসেন্স নিতে পারে।
বর্তমান নীতিমালার ৩ নম্বর ধারায় অনুমোদিত ডিলার নির্বাচন ও লাইসেন্স দেওয়ার কার্যক্রম বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের হাতে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত অনুমোদন বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দিলেও ডিলার নির্বাচনের কাজে সহযোগিতা করবে আমদানি-রপ্তানি নিয়ন্ত্রকের দপ্তর। ডিলার নির্বাচনের গাইডলাইন তৈরির জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারি অন্যান্য সংস্থার সহযোগিতা নেবে বলে প্রস্তাব করা হয়েছে।
বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী, স্বর্ণ আমদানির ডিলার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে লাইসেন্স নেয় এবং পরিশোধনাগার পরিচালনার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে অনুমতি নেয়। সংশোধনের প্রস্তাবে অনুমোদিত ডিলার নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার এবং ওয়ান স্টপ ডিজিটাল সলিউশন নামের পোর্টাল চালুর কথা বলা হয়েছে।
সোনা আমদানির জন্য স্বর্ণালংকার প্রস্তুতকারীর চাহিদা প্রয়োজন পড়ে। আমদানির অন্তত ১৫ দিন আগে এ চাহিদাপত্র দেওয়ার নিয়ম ছিল, সে সময় কমিয়ে ৩ দিন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আমদানিকারকের চালান-মূল্যের বিপরীতে ৫ শতাংশ জামানতের যে বিধান তাতেও পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। একটি স্বর্ণের বস্তুর জন্য একবার মূসক দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমান নীতিমালায় অনুমোদিত ডিলারকে স্বর্ণবার ও স্বর্ণালঙ্কার এবং অপরিশোধিত স্বর্ণ আকরিক আমদানি ও বিক্রির সময়ে শুল্ক কর রাষ্ট্রের কোষাগারে জমা করার বিধান দেওয়া হয়েছে।
সংশোধিত প্রস্তাবে বাজুসকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার মতোই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। স্বর্ণের আমদানিকারকের নিবন্ধন পেতে হলে অবশ্যই তাকে বাজুসের সদস্য হতে হবে এবং সদস্যপদ বহাল থাকতে হবে। বাজুসের সদস্য ছাড়া কেউ সোনার ব্যবসা করতে পারবে না। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বাজুসের সদস্যপদধারী হওয়ার মাধ্যমেই নীতিমালার প্রতিপালন নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় বৈদেশিক মুদ্রার বিদেশে পাচার রোধে বাজুস নজরদারি করতে পারবে না।
অনুমোদিত ডিলারের কাছ থেকে জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের সোনা কেনার ক্ষেত্রে মোট দামের অন্তত ৩০ শতাংশ ব্যাংকিং চ্যানেলে দেওয়ার বাধ্যবাধকতার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যেকোনো জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যবসায়িক ব্যাংক হিসাব খোলার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে বাজুসের বৈধ সনদ দেখাতে হবে। এ ধারার বাস্তবায়ন হলে বাজুসের সদস্য ছাড়া কোনো জুয়েলারি প্রতিষ্ঠান বৈধ উপায়ে ডিলারের কাছ থেকে সোনা কিনতে পারবে না।
গত ৬ আগস্ট বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে এ খসড়ার বিষয়ে বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বাণিজ্যমন্ত্রী খোন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘দেশের স্বর্ণ খাতকে অনানুষ্ঠানিক অবস্থা থেকে বের করে একটি বৈধ, স্বীকৃত ও জবাবদিহিমূলক ব্যবসায়িক খাতে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।’
২০১৮ সালে প্রথম স্বর্ণ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়। সে নীতিমালা ২০২১ সালে সংশোধন করা হয়। তাতে বলা হয়, দেশে সোনার বার্ষিক চাহিদা ২০ থেকে ৪০ মেট্রিক টন। এ চাহিদার মাত্র ১০ শতাংশ আসে তেজাবি স্বর্ণের মাধ্যমে। বাকি সোনার বৈধ আমদানির রেকর্ড নেই। নীতিমালা অনুযায়ী মোট ১৮টি ডিলার লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বেশিরভাগই স্বর্ণ ব্যবসায়ী নয় বলে জানা গেছে।