রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সব সড়কে যানজট নিরসন, দুর্ঘটনা হ্রাস এবং ট্রাফিক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর সড়ক আইন রয়েছে। কিন্তু তার প্রয়োগ যথাযথভাবে হচ্ছে না। সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে ম্যানুয়াল পদ্ধিতিতে দিন-রাত ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে কাজ করে পুলিশ। সেখানেও ফলাফল আশাব্যঞ্জক নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কঠোর ও কার্যকরী আইন ও বিধিমালা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) বাক্সেই বন্দি রয়েছে। ২০১৮ সালে করা সড়ক আইনটি বেশ সময়োপযোগী। কিন্তু কোথাও এর প্রয়োগ দৃশ্যমান নেই। এই আইনে এখনো পর্যন্ত কোনো চালকের লাইসেন্স স্থগিত হয়েছে, এমন দৃষ্টান্ত নেই। আইন যতই শক্তিশালী হোক, প্রয়োগ সংস্থা ঢিলেঢালাভাব দেখালেই বিপত্তির সৃষ্টি হবে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগসহ পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট লাইসেন্সবিহীন চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, উল্টোপথে চলাচল, অবৈধ পার্কিং, ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য এবং হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেলের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা ও জরিমানা আদায় করছে। তারপরও সড়কে পুরোপুরি শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব হয়নি পুলিশের পক্ষে।
বিআরটিএর একাধিক উপপরিচালক ও পরিদর্শকসহ মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সড়ক পরিবহন আইন ভঙ্গের দায়ে বিআরটিএ এ যাবৎকাল কখনো কোনো চালককের ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্লক করেছে এমন নজির নেই। কর্তৃপক্ষ শুধু জরিমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। কিন্তু অটোমেশন ট্রাফিক সিগন্যালের যুগে প্রবেশের চেষ্টা থেকে আইন প্রয়োগের চিন্তা করছেন নীতিনির্ধারকরা। এই আইন এতদিন কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ ছিল। এখন সেটা নিয়ে কিছুটা কাজ হচ্ছে।
সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮-এর ১১ ধারায় একজন চালক সড়ক আইন অমান্য করলে কী ধরনের শাস্তির মুখোমুখি হতে পারেন তা স্পষ্ট বলা রয়েছে। আইনের এক নম্বর শর্ত লাল বাতি অমান্য করলে শাস্তি পাবেন একজন চালক। তবে সেই লাল বাতিই রাজধানীর সড়কে এখন জ¦লে না।
পুলিশ সূত্র জানায়, রাজধানীর যানবাহন চলাচল নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল করতে নিয়মিত চেকপোস্ট, মোবাইল কোর্ট, ট্রাফিক আইন সম্পর্কে সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং বিভিন্ন স্থানে বিশেষ নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে স্কুল-কলেজের সামনে, হাসপাতাল এলাকা, বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অতিরিক্ত ট্রাফিক সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন প্রয়োগ করলেই সড়কে শৃঙ্খলা ফিরবে না; চালক, যাত্রী ও পথচারী সবার সম্মিলিত দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে অতিরিক্ত গতি, বেপরোয়া ওভারটেকিং, অদক্ষ চালনা, ট্রাফিক আইন অমান্য এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনকে চিহ্নিত করা হয়। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণাতেও রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় উল্লেখযোগ্য প্রাণহানির তথ্য উঠে এসেছে।
সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮-এর ১১ ধারায় ড্রাইভিং লাইসেন্সের বিপরীতে পয়েন্ট সিস্টেম চালু করে বিআরটিএ। প্রতি লাইসেন্সের জন্য বরাদ্দ ১২ পয়েন্ট। এই পয়েন্ট কাটা পড়লেই বাতিল হবে চালকের লাইসেন্স। পাশাপাশি জেল ও জরিমানার ব্যবস্থাও রাখা হয়। তবে দীর্ঘদিন সেটা শুধু জরিমানা আদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সম্প্রতি রাজধানীতে ডিএমপির স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিস্টেম চালু হওয়ার পর সড়ক আইন আলোচনায় আসে।
চলতি বছরের ৫ মে বিআরটিএ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ঘোষণা দেয়, সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারা অমান্য করার কারণে জরিমানা বা কারাদন্ড কিংবা উভয় দন্ডের পাশাপাশি অতিরিক্ত হিসেবে পয়েন্ট কর্তন করা হবে। যেকোনো ড্রাইভিং লাইসেন্সের (পেশাদার ও অপেশাদার) বিপরীতে বরাদ্দ ১২ পয়েন্ট। আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা পর্যায়ক্রমে লঙ্ঘনের কারণে পয়েন্ট কাটা গেলে সংশ্লিষ্ট ড্রাইভিং লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে।
বিআরটিএ জানায়, ওই ঘোষণার আলোকে পরের মাসে (জুন) মোটরযান চালকদের ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে দোষসূচক পয়েন্ট কর্তন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। আইন ভঙ্গ করলে অর্থদ- বা কারাদ-ের পাশাপাশি এই পয়েন্ট কর্তন শাস্তির মুখে পড়ছেন চালকরা। জুন মাসে ৭৫ জন চালকের লাইসেন্স থেকে ৭৮ পয়েন্ট কাটার তথ্য জানিয়েছে তারা।
মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালনকারী ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা বলছেন, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো কেবল আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একার পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য চালক, মালিক, যাত্রী ও পথচারী সব পক্ষকে ট্রাফিক আইন মেনে চলতে হবে। পথচারীদের ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস ও জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার এবং চালকদের ধৈর্য ও শৃঙ্খলার সঙ্গে যানবাহন চালানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
নগর পরিকল্পনাবিদ ও সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি চালকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা গেলে রাজধানীর সড়কে দীর্ঘমেয়াদে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে গণপরিবহনে শৃঙ্খলা, যাত্রী ওঠানামার নির্ধারিত স্থান নিশ্চিত করা এবং পথচারীদের নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
ডিএমপির সাবেক কমিশনার মো. সরওয়ার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ এবং বিআরটিএ’র সমন্বয় ছাড়া সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব নয়। এর আগে দুই সংস্থার কোনো সমন্বয় ছিল না। যে যার মতো করে কাজ করতেন। ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব ছিল বিআরটিএর কিন্তু তারা সেটি করতেন বলে মনে হয়নি। ডিএমপির দায়িত্ব নেওয়ার পর বিআরটিএর সঙ্গে সমন্বয় করা হচ্ছে। পুলিশ ট্রাফিকের মামলা করার সঙ্গে সঙ্গে সেটা ই-ট্রাফিফ সিস্টেমে দেখছেন তারা। এতে চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুবিধা হচ্ছে।’
ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিআরটিএর সঙ্গে সার্বক্ষণিক সমন্বয় করেই এখন ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। গত ৫-৬ মাস থেকে ট্রাফিক আইন প্রয়োগের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। এখন কোনো চালক আইন অমান্য করলেই মামলা করা হচ্ছে। সেই তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে বিআরটিএ কর্তৃপক্ষ দেখছেন এবং সেই অনুযায়ী চালকের বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার সেটা নিচ্ছেন। তবে এখন পর্যন্ত কেনো চালকের ড্রাভিং লাইসেন্স ব্লক করা হয়েছে কি না জানা নেই। এআই ক্যামেরাসহ পুলিশ সড়ক আইন বাস্তবায়নে যথেষ্ট সর্তক রয়েছে।