তালেবান সরকারের আরোপ করা নানা বিধিনিষেধের কারণে আফগানিস্তানের অর্ধেক নারী এখন মাসে মাত্র এক বা দুবার বাড়ির বাইরে বের হন। এসব বিধিনিষেধ তাদের চলাফেরার স্বাধীনতা ও জনজীবনে অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত করে দিয়েছে। বুধবার (১২ আগস্ট) প্রকাশিত জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ইউএন উইমেনের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
এ সপ্তাহে ক্ষমতায় ফেরার পঞ্চম বার্ষিকী পালনের প্রস্তুতি নিচ্ছে তালেবান। এর মধ্যেই জাতিসংঘের সংস্থাটি জানিয়েছে, আফগানিস্তান এখনো বিশ্বের একমাত্র দেশ, যেখানে মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষা এবং নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা নিষিদ্ধ।
এক বিবৃতিতে ইউএন উইমেন বলেছে, '২০২১ সালের আগস্টে তালেবানের ক্ষমতা দখলের পাঁচ বছর পর আফগানিস্তানে জনসংখ্যার অর্ধেক মানুষের অধিকার পরিকল্পিতভাবে খর্ব করা হয়েছে। আধুনিক বিশ্বে এর কোনো নজির নেই।'
নারীদের ওপর সরকারের বিভিন্ন বিধিনিষেধ বাস্তবায়নকারী নৈতিকতা প্রচার ও অনৈতিকতা প্রতিরোধ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সাইফ-উল-ইসলাম খাইবার রয়টার্সকে বলেন, নারীরা বাড়ির বাইরে যেতে নিরাপদ বোধ করেন না—এমন প্রতিবেদন সত্য নয়। তার দাবি, আফগান নারীরা তাদের সব অধিকারই ভোগ করছেন।
তিনি বলেন, 'প্রায় ৫০ বছরের মধ্যে এই প্রথম আফগানিস্তানের সব নাগরিক নিজেদের নিরাপদ ও সুরক্ষিত মনে করছেন।' দেশটিতে নারীর অধিকার পরিস্থিতি 'ইতিবাচক দিকে' এগোচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
মঙ্গলবার জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো জানিয়েছে, ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর থেকে আনুমানিক ২৪ লাখ আফগান মেয়েকে মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।
ইউএন উইমেন বলেছে, ক্ষমতায় আসার পর থেকে তালেবান কর্তৃপক্ষ নারী ও মেয়েদের লক্ষ্য করে ১০০টিরও বেশি ফরমান জারি করেছে। এসব পদক্ষেপ বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে এবং নারী অধিকার পরিস্থিতিকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ সংকটে পরিণত করেছে।
তালেবানের দাবি, তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী ইসলামি আইন ও আফগান সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নারীদের অধিকার নিশ্চিত করা হচ্ছে।
ইউএন উইমেনের জরিপে অংশ নেওয়া অর্ধেকের বেশি নারী জানিয়েছেন, তারা মাসে সর্বোচ্চ দুবার বাড়ির বাইরে বের হন। আর প্রায় তিন-চতুর্থাংশ নারী বলেছেন, মাহরাম বা পুরুষ অভিভাবক ছাড়া বাইরে বের হলে তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।
জাতিসংঘের সংস্থাটির মতে, এসব বিধিনিষেধের কারণে আফগান নারীদের মানসিক স্বাস্থ্যের সংকটও আরও তীব্র হয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রতি ১০ জন নারীর মধ্যে সাতজন তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা ‘খারাপ’ বা ‘খুব খারাপ’ বলে বর্ণনা করেছেন। এর পেছনে তারা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, সুযোগ হারানো এবং সহায়তার নেটওয়ার্কে সীমিত প্রবেশাধিকারের কথা উল্লেখ করেছেন।
ইউএন উইমেন সতর্ক করে বলেছে, সাম্প্রতিক কিছু ফরমান নারীদের আইনি সুরক্ষা আরও দুর্বল করেছে। সংস্থাটির মতে, চলতি বছর নেওয়া কিছু পদক্ষেপ আইনের চোখে নারী ও পুরুষের সমতার নীতি বাতিল করেছে, বৈবাহিক সম্পর্কে পুরুষের কর্তৃত্ব বাড়িয়েছে এবং নারীদের জন্য বিবাহবিচ্ছেদ চাওয়া আরও কঠিন করে তুলেছে।
অর্থনীতিতেও নারীরা এখনো ব্যাপকভাবে পিছিয়ে রয়েছেন। ইউএন উইমেনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফগান নারীদের মাত্র ৭ শতাংশ কর্মরত, যেখানে পুরুষদের কর্মসংস্থানের হার ৮৪ শতাংশ।
সংস্থাটি জানিয়েছে, তাদের এই প্রতিবেদন ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত ২ হাজার ১৯০ জনের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নেওয়া জরিপ এবং ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে মে পর্যন্ত ২ হাজার ৮১১ জনের ওপর পরিচালিত টেলিফোন জরিপের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।