পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ লোডশেডিং

পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ লোডশেডিং হচ্ছে এখন এই শেষ শ্রাবণে। প্রকৃতি তেতে উঠে বাংলা বছরের উষ্ণতম মাস ভাদ্রের আগমনী বার্তা দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে, বিদ্যুতের যদি এখনই এত বিপর্যস্ত অবস্থা হয়, তাহলে ভাদ্রে কী করবে সরকার! গত পাঁচ বছরে তিন সরকারের একই দিনের বিদ্যুৎ উৎপাদন, বিতরণ এবং লোডশেডিংয়ের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এখন সর্বোচ্চ লোডশেডিং হচ্ছে। দুই বছরের ব্যবধানে লোডশেডিং বেড়ে প্রায় ১৮ গুণ হয়েছে। আর পাঁচ বছরের ব্যবধানে বেড়েছে প্রায় ৪৯.৫ গুণ।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) হিসাবে দেখা যাচ্ছে ২০২২ সালের ১০ আগস্ট দেশে লোডশেডিং ছিল ৫৫ মেগাওয়াট। পরের বছর যা ছিল ১১০ মেগাওয়াট। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দুই দিন পর ১০ আগস্ট লোডশেডিং ছিল ১৫১ মেগাওয়াট, পরের বছর ২০২৫ সালে যা ছিল ৫৯ মেগাওয়াট। আর চলতি বছরের একই দিনে দেশে লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৭২২ মেগাওয়াট। এই হিসাবে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ দুই বছর, অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছর এবং বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস সময়কালের একটি নির্দিষ্ট দিনের হিসাব দেখানো হয়েছে।

গত পাঁচ বছরের ১০ আগস্ট তারিখে দেশে উৎপাদন, চাহিদা এবং লোডশেডিং চিত্র (পিডিবির তথ্য)

বছর      চাহিদা   উৎপাদন            লোডশেডিং

১০/০৮/২০২৬    ১৭,৪০৩            ১৪,৬৮১ ২,৭২২

১০/০৮/২০২৫    ১৪,২৬১ ১৪,২০৪            ৫৯

১০/০৮/২০২৪    ১৩,৬৫৩            ১৩,৫০২            ১৫১

১০/০৮/২০২৩    ১৩,১৮১ ১৩,০৭১ ১১০

১০/০৮/২০২২    ১২,৮৩০            ১২,২৯১ ৫৫

পিডিবি সারা দিনের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও চাহিদা মিটিয়ে পরের দিন একটি গড় লোডশেডিংয়ের চিত্র দেয়। অন্যদিকে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি (পিজিসিবি) ঘণ্টাপ্রতি কতটুকু লোডশেডিং হচ্ছে, তার একটি হিসাব দেয়। এতে দেখা গেছে, গত ১০ আগস্ট রাত ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে। যা এ বছরের সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের সময়।

সরকারের পক্ষ থেকে এর আগে গত জুনে ইরান যুদ্ধের সময় লোডশেডিংয়ের কারণ হিসেবে জ্বালানি তেলের সংকট আর যুদ্ধকে দায়ী করা হয়। এরপর সাগরে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডকে এখন লোডশেডিংয়ের কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। জানতে চাইলে পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, সরকার ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্টে ব্যর্থ হয়েছে বলেই লোডশেডিং হচ্ছে। এর আগেও দেশে গ্যাস, কয়লা এবং তেলের সংকট ছিল। তখন তো এত লোডশেডিং হয়নি। এখন কেন হচ্ছে। জনগণ সরকারের পারফরম্যান্স বিচার করে তার ঘরে বিদ্যুৎ আছে না নেই, সেটা দেখে। কী হয়েছে, কী হবে বা কী হচ্ছে, সেটা দেখে নয় এটা সরকারকে মাথায় রাখতে হবে। যেখানে গ্রামের মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে না, সেখানে সরকার বলছে গ্রামে লোডশেডিং হচ্ছে না। এটা কেমন কথা।

সরকারের তরফ থেকে শুরুতে লোডশেডিংয়ের নানা রকম ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হলেও জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ ও ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা কামনা করছেন সংশ্লিষ্ট দুই মন্ত্রী।

ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন ও ত্রুটির পর গ্যাস সংকটের জন্য ক্ষমা চেয়ে ব্যবসায়ীদের কাছে ‘মোরাল সাপোর্ট’ চেয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। গতকাল বৃহস্পতিবার সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ‘বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট : তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার ও টেকসই জ্বালানি ভবিষ্যতের পথ’ শীর্ষক আলোচনায় অনলাইনে যুক্ত হয়ে এ বিষয়ে কথা বলেন মন্ত্রী। তিনি জানান, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল মেরামত শেষ না হওয়া পর্যন্ত চলমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট কাটবে না। নতুন করে হঠাৎ গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব নয়, আবার এফএসআরইউ সচল না থাকায় বিদ্যমান গ্যাসও জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যাচ্ছে না। তাই বর্তমান সংকটে সরকারের সরাসরি করণীয় সীমিত উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, এই ক্রাইসিসের সময় আসলে এখন আমার কিছু করার নেই।

তার আগে গত বুধবার সচিবালয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি এবং খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ ইসলাম অমিত বলেছেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এ সত্য আমরা অস্বীকার করছি না। এই সংকটের দায় এড়িয়ে যাওয়ারও সুযোগ নেই। কারণ জনগণ ভোট দিয়ে এই সরকারকে নির্বাচিত করেছে। তাই যারা প্রতিনিয়ত বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে ভুগছেন, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের একটি সিদ্ধান্তের কারণে দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট হয়েছে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের মধ্যে থেকে ভবিষ্যতের বিপুল পরিমাণ জ্বালানির চাহিদা পূরণ সম্ভব নয় বিবেচনা করে দুটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল বিগত আওয়ামী লীগ সরকার। এজন্য সামিটের সঙ্গে ২০২৩ সালের মার্চে একটি এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের জন্য চুক্তিও সই করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৪ সালের অক্টোবরে এই চুক্তি বাতিল করে। সামিটের এই টার্মিনালটির উৎপাদনে আসার কথা ছিল চলতি বছরের আগস্টে। এখন যদি আরও ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ ব্যবস্থা থাকত, তাহলে কোনো সংকটই থাকত না। আওয়ামী সংশ্লিষ্টতায় সামিটের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করলেও মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেটের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করেনি অন্তর্বর্তী সরকার। এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরেও কোনো এলএনজি টার্মিনালের কাজ দিয়ে যেতে পারেনি। যে কারণে এখন সংকটে পড়েছে নতুন সরকার। এ প্রসঙ্গে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, সামিটের এলএনজি টার্মিনালের চুক্তি বাতিল করার আগে অবশ্যই দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত ছিল। টার্মিনালটি থাকলে এখন গ্যাস সরবরাহ অন্তত ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট বাড়ানো যেত। যাতে এখনের সংকট সামাল দেওয়া যেত।

গত ১০ আগস্ট দেশের গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৬৯৪ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে। গ্যাস সরবরাহ বাড়ালেও সাধারণত ৯০০ মিলিয়ন ঘনফুটের বেশি গ্যাস বিদ্যুতে দেওয়া হয় না। তবে রমজান ও সেচ মৌসুমে কিছুটা গ্যাস বেশি দেওয়া হয়। আরও ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দিলে উৎপাদন আরও এক হাজার মেগাওয়াট বাড়তে পারে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু গ্যাস সরবরাহ বাড়ালেও একই তাপমাত্রায় লোডশেডিং হবে। যতক্ষণ না কয়লা এবং তরল জ্বালানির বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বৃদ্ধি করা হবে, ততক্ষণ লোডশেডিংমুক্ত হবে না। এ প্রসঙ্গে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, এর আগেও সাবেক সরকারের জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলতেন আমাদের শীতের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। পরিস্থিতি সে রকমই রয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারের অবশ্যই সমস্যা সমাধানে আন্তরিক হতে হবে। সংকটকালীন সময়ে তেলচালিত কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে লোডশেডিং কমাতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের আন্তরিকতার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন এই জ্বালানি বিশেষজ্ঞ।