মান্দার ফুলে কাঠশালিক

আট বছর আগের কথা। দুদিনব্যাপী টাঙ্গুয়া হাওরে পাখি পর্যবেক্ষণ অভিযান শেষে শ্রীমঙ্গল এলাম। বাইক্কা বিলে পাখি পর্যবেক্ষণ করব বলে খুব সকালে বের হলাম। কিন্তু বিলে গিয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। পাখির সংখ্যা খুবই কম। আগে যেখানে দশ হাজার ছোট সরালি দেখা যেত সেখানে মাত্র একটি ঝাঁকে কয়েকশ’ পাখি দেখলাম। সকাল পৌনে ৮ থেকে ১০টা পর্যন্ত আবাসিক ও পরিযায়ী মিলে যদিও ১৯ প্রজাতির পাখির ছবি তুললাম। সংখ্যার বিবেচনায় অন্য বারের চেয়ে একবারেই নগণ্য। তবে মন্দের ভালো অতি বিরল গোলাপি শালিকের দেখা পাওয়া। বাইক্কা বিলে এটাই ওদের প্রথম আগমন। অন্য শালিকের সঙ্গে শিমুলের টকটকে লাল ফুলের রস পান করতে ব্যস্ত ছিল সে।

বাইক্কা বিলে আর কিছুই পাওয়ার আশা নেই। সন্ধ্যায় ঢাকার ফিরতি বাস। তাই দূরে কোথাও যাওয়া সম্ভবও নয়। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিলাম স্বল্প সময়ের জন্য হলেও হবিগঞ্জের সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে যাব। এখনই রওনা দিলে সাতছড়ির টাওয়ারের পাখি দেখা ও হুজুরের হোটেলের মজাদার হাঁসের মাংস খাওয়া হবে।

শায়েস্তাগঞ্জ পৌঁছতে দুপুর ১২টা। একটি অটোরিকশা নিয়ে ৪০ মিনিটে সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে পৌঁছলাম। হুজুরের হোটেলে তিন প্লেট হাঁসের মাংস রাখতে বলে দ্রুত টাওয়ারের দিকে পা বাড়ালাম। টাওয়ারে উঠতেই একটা। এ সময় টাওয়ারে তেমন একটা পাখি থাকার কথা নয়। যদিও বহু বছর এখানে পাখি দেখেছি, কিন্তু তখন টাওয়ার ছিল না। এবারই প্রথম টাওয়ারে উঠলাম। টাওয়ারের পাশে মান্দার গাছ। মান্দারের টকটকে লাল ফুলে যখন পাখি এসে বসে তখন চোখ বরাবরে পাখির ছবি তোলা যায়। যেহেতু প্রথম এসেছি তাই মান্দারের টকটকে লাল ফুলে দু-চারটি পাখির ছবি তুলতে পারলেই খুশি।

টাওয়ারে উঠেই প্রথম যে পাখিটির দেখা পেলাম তার নাম সোনাকপালি হরবোলা। ওর ছবি তুলতে তুলতেই রূপালি-সাদা মাথা, ধূসর পিঠ ও তামাটে বুক-পেটের কটি শালিক এসে হাজির। কয়েক ঘণ্টা আগে বাইক্কা বিলে শিমুলের টকটকে লাল ফুলেও শালিকটির ছবি তুলেছি। কিন্তু মান্দারের ফুলে ওকে আরও সুন্দর লাগছিল। ওরা গাছে থাকতে থাকতেই এলো সিপাহি বুলবুলি ও বাবুনাই বা চশমা টুনি। একটি ছোট প্রজাপতিও মান্দার ফুলের রস পান করতে এলো। আর দূরের শিমুল গাছে বসে থাকল ফিঙে পণ্ডিত বা কেশরাজ। একটিবারের জন্যও মান্দার ফুলে এলো না। প্রায় এক ঘণ্টা ১৮ মিনিটে মাত্র চার প্রজাতির পাখির ছবি তুলে হুজুরের হোটেলে শ্রীমঙ্গলে রওনা হলাম।

বাইক্কা বিলের টকটকে লাল শিমুল ও সাতছড়ির টকটকে লাল মান্দার ফুলে বসা শালিকটি এ দেশের সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখি কাঠ শালিক। ধূসর মাথা ময়না বা বাইনে বউ নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম ঈযবংঃহঁঃ-ঃধরষবফ ঝঃধৎষরহম, এৎবু-যবধফবফ ঝঃধৎষরহম বা এৎবু-যবধফবফ গুহধ। স্টুরনিডি গোত্রের শালিকটির বৈজ্ঞানিক নাম ঝঃঁৎহঁং সধষধনধৎরপঁং। বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই দেখা যায়।

কাঠশালিক ছোট আকারের পাখি। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের দৈর্ঘ্য ২০-২১ সেন্টিমিটার। ওজন ৪০ গ্রাম। দেহের ওপরটা চকচকে ধূসর, নিচের দিকটা লালচে-বাদামি। ডানার প্রাথমিক পালক কালচে। মাথা হালকা ধূসর, ঘাড়-গলা সাদা, মাথার চাঁদি ও ঘাড়ের ওপর সাদাটে রেখা থাকে, যা অনেকটা রূপালি দেখায়। লেজের নিচটা খয়েরি। চোখের মণি সাদা। ঠোঁট হলুদাভ, যার গোড়া ফ্যাকাশে নীল। পা, পায়ের পাতা ও নখর কমলাটে-বাদামি। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম হলেও স্ত্রী কিছুটা ফ্যাকাশে। অপ্রাপ্তবয়স্ক পাখিদের দেহের ওপরটা বালু-ধূসর ও নিচটা ধূসরাভ-সাদাটে।

পুরো দেশের সব ধরনের পরিবেশে এদের দেখা যায়। এরা দিবাচর ও শাখাচারী। সচরাচর ৫-২০টির দলে গাছের ওপরের দিকে বিচরণ করে। এরা সর্বভুক, সচরাচর দলবেঁধে গাছে গাছে পাকা ফল, ফুলের রস ও পোকামাকড় খেয়ে বেড়ায়। বীজ ও শস্যদানাও খেতে পারে। বেশ কোলাহলপ্রিয় ও ঝগড়াটে পাখি এরা। দল বেঁধে শক্ত বন্ধনে উড়ে বেড়ায় এবং প্রায়শই আকাশে একসঙ্গে একই তালে দ্রুত গতিপথ পরিবর্তন করে। ‘ট্র-ট্র-ট্রুই ---’ ধাতব স্বরে ডাকে।

মার্চ থেকে আগস্ট প্রজননকাল। সারা জীবনের জন্য জোড় বাঁধে। মাটি থেকে ১০-১২ মিটার উচ্চতায় গাছের কোটরে বাসা বানায় অথবা কাঠঠোকরা বা বসন্তবাউরির পরিত্যক্ত বাসা ব্যবহার করে। ডিম পাড়ে তিন থেকে পাঁচটি, রঙ হালকা নীল থেকে নীলাভ-সবুজ। স্ত্রী-পুরুষ মিলেমিশে ডিমে তা দেয় ও গড়ে ১৭ দিনে ডিম ফোটে। বাবা-মা মিলেমিশে ছানাদের খাওয়ায় ও লালনপালন করে। ছানারা ১৯-২১ দিনে উড়তে শিখে ও বাসা ছাড়ে। আয়ুষ্কাল প্রায় ১২ বছর।

লেখক : পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ