অগ্রণী ব্যাংকের ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা আত্মসাৎ করে খামার

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৬:১২ এএম

চট্টগ্রামে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংক পিএলসির লালদীঘি (পূর্ব) করপোরেট শাখার ভল্ট থেকে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা লোপাটের ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় করা মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য বিপুল পরিমাণ এই অর্থ লোপাটের নেপথ্যে শুধু ক্যাশ ইনচার্জ নয়, আরও কিছু কর্মকর্তা জড়িত থাকার আভাস মিলছে। ব্যাংকের অভ্যন্তরের একটি সিন্ডিকেট টাকা লোপাটের সঙ্গে জড়িত। চক্রটি মামলায় শুধু ক্যাশ ইনচার্জ মো. কামরুল হোসেনকে (৪১) এবং মো. জাফরুল্লাহ তানভীর (২৫) নামে এক ব্যবসায়ীকে জড়িয়ে নিজেদের আড়াল করতে চাইছে।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (দক্ষিণ) হাবীবুর রহমান বলেন, ‘ব্যাংক কর্তৃপক্ষ মামলার পর ভল্ট ও ক্যাশ ইনচার্জ মো. কামরুল হোসেন ও ব্যবসায়ী জাফরুল্লাহ তানভীরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আসামি কামরুল হোসেন ইতিমধ্যে দোষ স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। এ ঘটনায় আর কারা কারা জড়িত তা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হবে।’

অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আনোয়ারুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেভাবে লেনদেন ও অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, সেভাবেই বিষয়টি যাচাই করে টাকা উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। অর্থ উদ্ধারে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ নিয়ে উদ্বিগ্ন বা চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।’

রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের আর্থিক কেলেঙ্কারির এ ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক, চট্টগ্রাম শাখার উচ্চপদস্থ তিন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তারা বলেছেন, ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রম শেষে ভল্ট ও ক্যাশে কত টাকা আছে, কত লেনদেন হয়েছে তা হিসাব করে দেখার সময় ভল্ট ও ক্যাশ ইনচার্জের পাশাপাশি একজন বা দুজন সিনিয়র অফিসার (সাইনিং অথরিটি) থাকেন। শুধু ক্যাশ ইনচার্জকে আসামি করে টাকা লোপাটের দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।

মামলার এজাহারের বর্ণনা অনুযায়ী, গত বছরের ১ জুন থেকে ৯ আগস্টের মধ্যে টাকাগুলো লোপাট হয়। ঘটনার তদন্ত সূত্রের প্রশ্ন ১৪ মাস পর কেন আর্থিক লোপাটের বিষয়টি ধরা পড়ল? শিহাব নামে ব্যাংকের এক স্টাফ মামলার ১নং আসামি ক্যাশ ইনচার্জ মো. কামরুল হোসেনের সঙ্গে ২নং আসামি জাফরুল্লাহ তানভীরকে পরিচয় করিয়ে দেন। এজাহার থেকে শিহাবের নাম বাদ গেল কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতে বৃহস্পতিবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত একাধিক কল করা হলেও মোবাইল ফোন রিসিভ করেননি মামলার বাদী শাখার মহাব্যবস্থাপক মোস্তাক আহমেদ। হোয়াটসঅ্যাপে খুদেবার্তা পাঠালেও সাড়া দেননি তিনি।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, আত্মসাতের কৌশল হিসেবে ভল্টে রাখা টাকার বান্ডিলের ওপরে রাখা হয়েছে একটি এক হাজার টাকার নোট। বান্ডিলের ভেতরে রাখা হয়েছে ১০০ টাকার নোট। বাইরে থেকে দেখে মনে হতো, পুরো বান্ডিলেই এক হাজার টাকার নোট আছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তার প্রশ্ন সাধারণত ভল্টের ভেতর এক হাজার টাকা নোটের এক রিমে (১০০টি বান্ডিল) থাকে এক কোটি টাকা। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ৯ আগস্ট কেন ভল্ট ও ক্যাশের হিসাব মেলাতে গেলেন?

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নগরের কোতোয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ইকবাল হোসেন জানান, গ্রেপ্তার হওয়া প্রধান আসামি মো. কামরুল হোসেন আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। এতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন। তদন্তের স্বার্থে তা বলা যাচ্ছে না। এর আগে মামলার আলামত হিসেবে তাদের কাছ থেকে দুটি মোবাইল ফোন, হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ, তথ্যের রেকর্ডসহ ৬৪ জিবির একটি পেনড্রাইভ জব্দ করা হয়েছে। এতবড় আর্থিক কেলেঙ্কারিতে আর কারা কারা জড়িত তা তদন্ত করে বের করা হবে।’

জানা গেছে, মামলার এজাহারে অভিযুক্ত ১নং আসামি মো. কামরুল হোসেন চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানাধীন ফরহাদাবাদ ইউনিয়নের মন্দাকিনি গ্রামের জহুরুল আলম কোম্পানির বাড়ির মো. জহুরুল আলমের ছেলে। ২নং আসামি মো. জাফরুল্লাহ তানভীর (২৫) একই জেলার কর্ণফুলী থানাধীন চরপাথরঘাটা এলাকার সৈয়দ মাঝিবাড়ির আজিম উল্লাহর ছেলে। তথ্যসূত্র বলছে, টাকা লোপাটের বিষয়টি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের নজরে আসার পর গত ৯ আগস্ট ক্যাশ ইনচার্জ মো. কামরুল হোসেন ও জাফরুল্লাহ তানভীরকে আটক করে পুলিশকে খবর দেওয়া হয়। পরে পুলিশ এসে তাদের গ্রেপ্তার করে। এ ঘটনায় ১০ আগস্ট কেতোয়ালি থানায় মামলা করেন শাখার মহাব্যবস্থাপক মোস্তাক আহমেদ। মামলায় কামরুল হোসেন ও জাফরুল্লাহ তানভীরের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তারের পর গত ১০ আগস্ট ক্যাশ ইনচার্জ মো. কামরুল হোসেন ও জাফরুল্লাহ তানভীরকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, কামরুল হোসেন ওই শাখার ক্যাশ ও ভল্টের দায়িত্বে ছিলেন। ৯ আগস্ট নিয়মিত ব্যাংকিং কার্যক্রম ও লেনদেন শেষে নগদ অর্থের হিসাব মেলানো হচ্ছিল। তখনই হিসাবের সঙ্গে ভল্টে থাকা টাকার গরমিল ধরা পড়ে। পরে রেকর্ডপত্র ও নথি যাচাই করে দেখা যায়, ভল্টে যে পরিমাণ টাকা থাকার কথা, বাস্তবে রয়েছে তার চেয়ে ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা কম। এ বিষয়ে কামরুল হোসেন সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি। এজাহারে আরও বলা হয়েছে, গত বছরের ১ জুন থেকে চলতি বছরের ৯ আগস্ট পর্যন্ত সময়ের মধ্যে এ আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। আত্মসাৎ করা টাকা বিনিয়োগ করে হাটহাজারীর উত্তর বুড়িশ্চর এলাকায় ‘ইশরাত অ্যাগ্রো’ নামে একটি গরুর খামার গড়ে তোলা হয়। মামলার ২ নম্বর আসামি জাফরুল্লাহ তানভীরকে ওই খামার দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। খামারে বিভিন্ন জাতের ৫০ থেকে ৬০টি গরু রয়েছে।

এদিকে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের অভিযোগ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে আসামি জাফরুল্লাহ তানভীরের পরিবার। তানভীরের বাবা আজিম উল্লাহ বলেন, ‘আমার ছেলে ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা বা গ্রাহক নন। আমার ছেলে আগে থেকেই গরুর খামার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তার কাছে ব্যাংকের ৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে, এমন কোনো তথ্য বা রেকর্ড ব্যাংক দেখাতে পারেনি। আমার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে এ মামলায় ফাঁসানো হয়েছে। ব্যাংকে তাকে ডেকে নিয়ে স্ট্যাম্পে জোরপূর্বক স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত