বাংলাদেশের বাজিমাত

দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব ক্রিকেটে অস্ট্রেলিয়া একটি অত্যন্ত সফল দল হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করে এসেছে। তাদের এ পথচলা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু যদি বর্তমান দলের দিকে আমরা বস্তুনিষ্ঠভাবে তাকাই, তবে কিছু স্পষ্ট ঘাটতি ও দুর্বলতা সহজেই চোখে পড়বে।

ডারউইন টেস্টের আগে আমার ধারণা ছিল, ডারউইনের এই দুটি টেস্ট ম্যাচকে নির্বাচকরা নতুনদের পরখ করে নেওয়ার সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করবেন। কিন্তু তা না করে নির্বাচকরা আবারও তাদের সেই ‘পরিচিত ও পুরনোদের ওপর ভরসা’ রাখার নীতিতেই অটল রইলেন।

গত মৌসুমের শেষেই আমি বলেছিলাম, তরুণ ব্যাটার ক্যাম্পবেল ক্যালোওয়ে এবং অলি পিককে আমার খুব পছন্দ। জাতীয় দলের টপ ও মিডল-অর্ডারে যেসব জায়গা তৈরি হচ্ছিল, এই দুজন তরুণকে সেখানে জায়গা করে দেওয়ার জন্য এটাই ছিল সবচেয়ে উপযুক্ত সময়। কিন্তু নির্বাচকরা সেই সিদ্ধান্ত নিলেন না। আমার মূল চিন্তা ও ভয়টা অন্য জায়গায় যদি ডারউইনের মতো সিরিজে এই তরুণদের সুযোগ না দেওয়া হয়, তবে কবে দেওয়া হবে? তাদের কি সরাসরি দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে নিয়ে গিয়ে কাগিসো রাবাদা কিংবা মার্কো ইয়ানসেনদের মুখোমুখি করানো হবে? সেটা তাদের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও অনেক বেশি কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং হবে। আমার স্পষ্ট মনে হচ্ছে, একটা দারুণ সুযোগ আমরা হাতছাড়া করলাম।

ডারউইনে ম্যাচের প্রথম দিন সকালে যখন অস্ট্রেলিয়া টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নিল, তখন আমরা অনেকেই অবাক হয়েছিলাম। পিচের দিকে তাকালেই বোঝা যাচ্ছিল, উইকেটে ঘাস ছিল এবং সারফেসও বেশ শক্ত ছিল। এ রকম কন্ডিশনে শুরুতে যে পেসাররা সুইং পাবে এবং ব্যাটারদের লড়াই করতে হবে, তা অনুমেয় ছিল। কিন্তু প্রথম সেশনেই আমি যা দেখলাম, তা হলো আমাদের টপ-অর্ডার ব্যাটারদের সেই একই পুরনো ভুলের বারবার পুনরাবৃত্তি।

প্রথমত, বলের মেরিট না বুঝে অতিরিক্ত আক্রমণাত্মক শট খেলতে যাওয়ার প্রবণতা, ঠিক যেভাবে জাক ওয়েদারাল্ড আউট হলো। দ্বিতীয়ত, মার্নাস লাবুশেনের ব্যাটিং পদ্ধতি। তার ভেতরে রান তোলার কোনো সদিচ্ছাই দেখা যাচ্ছে না। এর ফলে নিজের ওপর অযথা চাপ তৈরি হচ্ছে এবং প্রতিপক্ষের বোলাররা ম্যাচে রাজত্ব করার সুযোগ পাচ্ছে। গত দুই বছর ধরে লাবুশেন যেভাবে আউট হয়ে আসছে, আজকেও ঠিক একই ভঙ্গিতে নিজের উইকেট ছুড়ে দিয়ে এলো।

প্রথম দিনে কেবল অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিংই হতাশ করেনি, আমাদের বোলিং পারফরম্যান্স দেখেও আমি সত্যিই অবাক হয়েছি। প্রতিপক্ষের ওপর যে চাপ সৃষ্টি করা বা প্রভাব ফেলার দরকার ছিল, অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের বোলিংয়ে তা একদমই অনুপস্থিত ছিল। অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং চলাকালে আমরা বাংলাদেশের বোলারদের যে নিখুঁত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ লাইন-লেংথ দেখেছি, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। তারা স্টিভ স্মিথকে অন-সাইডে প্রায় কোনো রানই করতে দেয়নি, স্মিথকে বাধ্য করেছে অফ-সাইডে রান তুলতে, যা স্মিথের ব্যাটিংশৈলীর একদম বিপরীত। বাংলাদেশ বলের ওপর যেভাবে নিয়ন্ত্রণ ও এক্সিকিউশন দেখিয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার বোলিংয়ে তা দেখা যায়নি।

টেস্ট ক্রিকেটে এ রকম বড় ও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে আপনাকে সুযোগের শতভাগ সদ্ব্যবহার করতে হবে এবং ম্যাচের লাগাম নিজের হাতে নিতে হবে। ডারউইনের প্রথম দিনে সেই জায়গাটিতে বাংলাদেশই পুরোপুরি বাজিমাত করেছে।