মানুষ সামাজিক জীব। একা জীবনযাপন করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। জীবনের পথচলায় পরিবার, আত্মীয়-স্বজনের পাশাপাশি বন্ধুরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুখের দিনে বন্ধু পাওয়া সহজ, কিন্তু দুঃসময়ে পাশে দাঁড়ানোর মতো বন্ধু খুবই বিরল। তাই বলা হয়, বিপদই মানুষকে প্রকৃত বন্ধু চিনতে শেখায়। যে বন্ধু সুখে-দুখে, স্বাচ্ছন্দ্যে-কষ্টে, সাফল্যে-ব্যর্থতায় পাশে থাকে, সেই প্রকৃত বন্ধু। ইসলামও এমন বন্ধুত্বের শিক্ষা দেয়, যা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং বিপদের সময় আন্তরিক সহযোগিতার মাধ্যমে প্রকাশ পায়।
বিপদ মানুষের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ করে : সাধারণ সময়ে অনেকেই বন্ধুত্বের দাবি করে। একসঙ্গে চলাফেরা, আড্ডা, আনন্দ-উৎসবে অংশগ্রহণ, এসবের মাধ্যমে অনেক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কিন্তু যখন মানুষের ওপর বিপদ নেমে আসে, তখন অনেকেই দূরে সরে যায়। কেউ ব্যস্ততার অজুহাত দেয়, কেউ স্বার্থের কারণে সম্পর্ক ছিন্ন করে। তখন যে ব্যক্তি নিঃস্বার্থভাবে পাশে দাঁড়ায়, সান্ত্বনা দেয়, সহযোগিতা করে এবং কষ্ট ভাগ করে নেয়, সেই প্রকৃত বন্ধু।
আরবিতে একটি প্রবাদ রয়েছে, ‘সংকটের সময়ই প্রকৃত বন্ধুর পরিচয় পাওয়া যায়।’ এই ছোট্ট বাক্যটি মানুষের জীবনের এক গভীর বাস্তবতাকে তুলে ধরে।
ইসলামে বন্ধুত্বের গুরুত্ব : ইসলামে বন্ধুত্ব একটি মহান সম্পর্ক। তবে সেই বন্ধুত্ব হতে হবে তাকওয়া, নেক আমল ও আল্লাহভীতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত। আল্লাহ বলেন, ‘সেদিন (কেয়ামতের দিন) ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা একে অপরের শত্রু হয়ে যাবে, তবে মুত্তাকিরা ব্যতীত।’ (সুরা যুখরুফ ৬৭) এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, যে বন্ধুত্ব আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়, তা দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতেই কল্যাণ বয়ে আনে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকের উচিত, সে কাকে বন্ধু বানাচ্ছে তা লক্ষ্য করা।’ (সুনানে আবু দাউদ) অতএব, প্রকৃত বন্ধু শুধু দুনিয়াবি প্রয়োজনে নয়, ইমান ও আমলের ক্ষেত্রেও সহায়ক হয়।
বিপদের সময় বন্ধুর করণীয় : প্রকৃত বন্ধু কখনো বন্ধুকে একা ফেলে যায় না। সে আর্থিক সাহায্য করতে না পারলেও মানসিক সাহস জোগায়। অসুস্থ হলে দেখতে যায়, বিপদে পরামর্শ দেয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সমর্থন দেয় এবং প্রয়োজনে নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়েও বন্ধুর উপকার করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুমিন মুমিনের জন্য একটি অট্টালিকার মতো, যার এক অংশ অন্য অংশকে শক্তিশালী করে।’ (সহিহ বুখারি) এই হাদিসে মুসলমানদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও বন্ধুত্বের আদর্শ তুলে ধরা হয়েছে।
সাহাবিদের জীবনে বন্ধুত্বের দৃষ্টান্ত : রাসুলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের জীবন প্রকৃত বন্ধুত্বের উজ্জ্বল উদাহরণে ভরপুর। হিজরতের সময় হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.) নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে রেখে নবীজি (সা.)-এর সঙ্গে সাওর পর্বতে অবস্থান করেছিলেন। তিনি নিজের নিরাপত্তার কথা না ভেবে প্রিয় বন্ধুর নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।
আবার মুহাজির ও আনসারদের ভ্রাতৃত্ব ছিল ত্যাগ ও ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আনসাররা নিজেদের সম্পদ, ঘরবাড়ি ও জীবিকার অংশ মুহাজির ভাইদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছিলেন। এটি ছিল নিঃস্বার্থ বন্ধুত্ব ও ইমানি ভ্রাতৃত্বের সর্বোচ্চ প্রকাশ।
স্বার্থের বন্ধুত্বের পরিণতি : আজকের সমাজে অনেক সম্পর্ক স্বার্থের ওপর প্রতিষ্ঠিত। অর্থ, ক্ষমতা বা ব্যক্তিগত লাভের জন্য বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। যতক্ষণ লাভ থাকে, ততক্ষণ সম্পর্ক থাকে। লাভ শেষ হলে বন্ধুত্বও শেষ হয়ে যায়। এ ধরনের সম্পর্ক মানুষকে হতাশ করে এবং বিপদের সময় অসহায় করে তোলে।
তাই বন্ধুত্ব করার আগে মানুষের চরিত্র, দ্বীনদারিতা, সততা ও দায়িত্ববোধ যাচাই করা জরুরি। যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, মানুষের হক আদায় করে এবং বিশ্বস্ত, তার বন্ধুত্বই দীর্ঘস্থায়ী ও কল্যাণকর হয়।
প্রকৃত বন্ধুর বৈশিষ্ট্য : প্রকৃত বন্ধুর কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো, সে সত্য কথা বলতে দ্বিধা করে না। অন্যায়ে সহযোগিতা করে না, বরং সংশোধন করে। বিপদে পাশে দাঁড়ায় এবং সান্ত্বনা দেয়। বন্ধুর গোপনীয়তা রক্ষা করে। হিংসা না করে বন্ধুর সাফল্যে আনন্দিত হয়। বন্ধুর জন্য দোয়া করে এবং তার কল্যাণ কামনা করে। দুনিয়ার পাশাপাশি আখেরাতের সফলতার পথেও উদ্বুদ্ধ করে। এমন বন্ধুই মানুষের জীবনের প্রকৃত সম্পদ।
লেখক : মুহাদ্দিস ও শিক্ষা সচিব, জামিয়া দারুল হিকমাহ, কেওয়া, শ্রীপুর, গাজীপুর