সবাই সুখী হতে চায়। মহান আল্লাহ মানুষের হৃদয়ে সুখের প্রতি আকাক্সক্ষা সৃষ্টি করেছেন। সুখ কেবল আকাক্সক্ষা করলেই অর্জিত হয় না। এর জন্য এমন কিছু উপায় অবলম্বন করা প্রয়োজন, যা মানুষকে সেই সুখের কাছে পৌঁছে দেয়। ইসলাম সুখ লাভের বিভিন্ন উপায় ও মাধ্যম সম্পর্কে নির্দেশনা দিয়েছে এবং সেগুলো গ্রহণ করতে উৎসাহিত করেছে। এই সুখ ইমান ও সৎকর্ম ছাড়া অর্জিত হয় না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘শপথ সময়ের! নিশ্চয় মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে তারা ছাড়া, যারা ইমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে এবং পরস্পরকে সত্য ও ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।’ (সুরা আসর)
সুখ এমন এক আকাক্সক্ষা, যা প্রত্যেক মানুষ সবসময় ও সব জায়গায় পেতে চায়। কিন্তু অনেক সময় মানুষ সুখের প্রকৃত অর্থ ও বাস্তবতা বুঝতে ভুল করে। কখনো সে সুখের পথ ও এর উপায় থেকেও বিচ্যুত হয়। সুখের সন্ধানে থেকেও সে ভুল পথে চলে যায়। অথচ ইমান ও সৎকর্ম ছাড়া সুখের কোনো পথ নেই। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে মুমিন অবস্থায় সৎকর্ম করবে, পুরুষ হোক অথবা নারী, আমি অবশ্যই তাকে পবিত্র জীবন দান করব এবং তারা যে উত্তম কাজ করত, তার তুলনায় অবশ্যই তাদের উত্তম প্রতিদান দেব।’ (সুরা নাহল ৯৭)
এর বিপরীতে যে ব্যক্তি আল্লাহর তাকওয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং আল্লাহর আনুগত্যের পথ থেকে সরে যায়, সে দুর্ভাগ্যে পতিত হয়। সে দুশ্চিন্তা, বিষণœতা ও কষ্টে নিমজ্জিত হয়। তাকে গ্রাস করে হতাশা, অস্থিরতা, উদ্বেগ, অস্বস্তি, সংকীর্ণতা, দুঃখ ও মানসিক অশান্তি। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, তার জন্য হবে সংকীর্ণ জীবন। আর কেয়ামতের দিন আমি তাকে অন্ধ অবস্থায় উঠাব।’ (সুরা তাহা ১২৪)
হে আল্লাহর বান্দারা! সুখ হলো মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য এক ধরনের সাহায্য ও তৌফিক। তিনি তার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা তা দান করেন। তখন মানুষ নিজের অন্তরে প্রশস্ততা অনুভব করে। তার মনে আসে তৃপ্তি, প্রশান্তি, স্বস্তি ও শান্তি। সুখের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো ইমান ও সৎকর্ম। কারণ ইমানের ওপরই সুখ, সন্তুষ্টি, সাফল্য ও ভবিষ্যতের নিরাপত্তা নির্ভর করে। এটি দুনিয়া ও আখেরাতে মুক্তির সবচেয়ে বড় উপায়। ইমানের মাধ্যমে বিপদ দূর হয়। দুশ্চিন্তা ও কষ্ট প্রশমিত হয়। এর মাধ্যমে সংকট থেকে মুক্তি আসে। নিরাপত্তা অর্জিত হয়। গুনাহ ক্ষমা করা হয় এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করা হয়। ইমানই মুক্তি ও পরিত্রাণের উপায়। এটিই সফলতা ও বিজয়ের পথ।
আর যখন ইমানের সঙ্গে সৃষ্টির প্রতি সদাচরণ, মানুষের উপকার করা এবং ভালো কাজ করার মানসিকতা যুক্ত হয়, তখন তা সুখ লাভের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এ ছাড়া সুখ লাভের আরও উপায় হলো ফরজ ও আবশ্যক দায়িত্বগুলো যথাযথভাবে পালন করা। আর এসবের মধ্যে সর্বাগ্রে রয়েছে নামাজ। নামাজ বান্দার সঙ্গে তার রবের সম্পর্ক স্থাপন করে। এটি অন্তরে প্রশান্তি ও মানসিক স্বস্তি এনে দেয় এবং অশ্লীলতা ও অন্যায় থেকে বিরত রাখে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় যারা ইমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে, নামাজ আদায় করেছে, জাকাত দিয়েছে, তাদের প্রতিদান তাদের রবের কাছে রয়েছে। তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।’ (সুরা বাকারা ২৭৭)
সুখের আরও উপায় হলো সর্বদা আল্লাহর জিকির করা এবং কোরআন তেলাওয়াত করা। কারণ আল্লাহর জিকির ছাড়া অন্তর প্রকৃত প্রশান্তি ও স্বস্তি লাভ করতে পারে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা ইমান এনেছে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়। জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তরগুলো প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাদ ২৮)
এর পরের আয়াতে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা ইমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্য রয়েছে সৌভাগ্য এবং উত্তম প্রত্যাবর্তনস্থল।’ (সুরা রাদ ২৯)
কোরআন মহান আল্লাহর বাণী। এটি হেদায়াত ও সুখের উৎস। এতে অন্তরের ব্যাধির নিরাময় রয়েছে। এতে মুমিনদের জন্য রয়েছে হেদায়াত ও রহমত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর আমার পক্ষ থেকে যখন তোমাদের কাছে হেদায়াত আসবে, তখন যে ব্যক্তি আমার হেদায়াত অনুসরণ করবে, সে পথভ্রষ্ট হবে না এবং দুর্ভাগ্যেও পতিত হবে না।’ (সুরা তাহা ১২৩)
সুখ লাভের অন্যতম উপায় হলো তকদির বা আল্লাহর ফয়সালার প্রতি ইমান রাখা। এটি ইমানের অন্যতম স্তম্ভ এবং ইসলামি আকিদার মৌলিক বিষয়গুলোর একটি। এর ফল হলো বিপদের সময় ধৈর্য ধারণ করা, আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন তাতে সন্তুষ্ট থাকা, অসন্তুষ্টি ও অস্থিরতা থেকে বিরত থাকা এবং অন্তর ও মনে প্রশান্তি অর্জন করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যাতে তোমরা যা হারিয়েছ তার জন্য দুঃখিত না হও এবং যা তিনি তোমাদের দিয়েছেন তার জন্য অতিরিক্ত আনন্দিত না হও।’ (সুরা হাদিদ ২৩)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যা তোমার উপকারে আসে, তার প্রতি আগ্রহী হও। আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও এবং অক্ষম হয়ে পড়ো না। আর যদি তোমার কোনো বিপদ ঘটে, তাহলে এ কথা বলো না, ‘আমি যদি এমন করতাম, তাহলে এমন এমন হতো।’ বরং বলো, ‘আল্লাহ তকদিরে যা রেখেছেন, তিনি যা চেয়েছেন, তাই হয়েছে।’ কারণ ‘যদি’ শব্দটি শয়তানের কাজের দরজা খুলে দেয়।’ (সহিহ মুসলিম ২৬৬৪)
মহান আল্লাহ বলেন, ‘পৃথিবীতে অথবা তোমাদের নিজেদের ওপর যে বিপদই আসে, তা সংঘটিত করার আগেই কিতাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। নিশ্চয়ই এটি আল্লাহর জন্য সহজ।’ (সুরা হাদিদ ২২)
হে আল্লাহর বান্দারা! সম্পদ ও ভোগবিলাসের মধ্যে সুখ নিহিত নয়। প্রবৃত্তির কামনা চরিতার্থ করা, আনন্দ উপভোগে ডুবে থাকা কিংবা শরীরের আরামে সুখ নেই। প্রকৃত সুখ হলো অন্তরের প্রশান্তি, আত্মার স্থিরতা এবং অন্তরের পরিশুদ্ধতা। এই সুখের প্রভাব দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জীবনেই বিস্তৃত হয়।
বান্দাকে সুখ থেকে বঞ্চিত করার অন্যতম বড় কারণ হলো অন্তরের ব্যাধি। এর মধ্যে রয়েছে হিংসা, বিদ্বেষ, শত্রুতা, ঘৃণা, অহংকার ও লোকদেখানো ইবাদত। কারণ হৃদয়ই মানুষের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের অধিপতি। এটি ইমানের স্থান এবং সুখের উৎস। হৃদয় সঠিক থাকলে পুরো শরীর সঠিক থাকে। আর হৃদয় নষ্ট হলে পুরো শরীরই নষ্ট হয়ে যায়।
নুমান ইবনে বশির (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘সাবধান! শরীরের মধ্যে একটি মাংসপিণ্ড রয়েছে। সেটি সঠিক হলে পুরো শরীর সঠিক থাকে। আর সেটি নষ্ট হলে পুরো শরীর নষ্ট হয়ে যায়। জেনে রাখো, সেটিই হলো হৃদয়।’ (সহিহ বুখারি ৫২)
সুখের পথে অন্যতম বাধা হলো দায়িত্ব ও কর্তব্যে অবহেলা করা, হারাম কাজে ডুবে থাকা এবং প্রবৃত্তির কামনা ও সংশয়ের পেছনে ছুটে চলা। এসব কাজ অন্তরে পর্দা ও কঠোরতা সৃষ্টি করে। ফলে মানুষ সব ধরনের কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হয়। তার জীবনে নেমে আসে দুশ্চিন্তা, বিষণœতা, একাকিত্ব ও অনুশোচনা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যারা মন্দ কাজ করেছে, তারা কি মনে করে যে, আমি তাদের ইমানদার ও সৎকর্মশীলদের মতো করে দেব, তাদের জীবন ও মৃত্যু সমান করে দেব? তারা যে সিদ্ধান্ত নেয়, তা কতই না নিকৃষ্ট!’ (সুরা জাছিয়া ২১)
সুখ থেকে বঞ্চিত হওয়ার অন্যতম বড় কারণ হলো আল্লাহ সম্পর্কে মন্দ ধারণা পোষণ করা। এর ফলে মানুষ আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়, তার অনুগ্রহ থেকে হতাশ হয়ে পড়ে এবং নানা কুমন্ত্রণা, অশুভ আশঙ্কা, ভয় ও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগের কাছে আত্মসমর্পণ করে। সে মনে করতে থাকে, তার নেয়ামতগুলো হয়তো চলে যাবে এবং সামনে কোনো বিপদ ও শাস্তি আসতে পারে।
সুখ থেকে বঞ্চিত হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো সময় নষ্ট করা, দায়িত্ব পালনে অবহেলা করা, অনর্থক কাজে ডুবে থাকা এবং মোবাইল ফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার করা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন কনটেন্ট ও ছোট ছোট ভিডিও দেখার নেশাও মানুষের সময় নষ্ট করে।
এগুলো মানুষের মনোযোগ বিক্ষিপ্ত করে দেয়। মনোযোগ ধরে রাখার সক্ষমতা দুর্বল করে। দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ ও বিষণœতা সৃষ্টি করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যদের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করার কারণে মানসিক স্বাস্থ্যেরও অবনতি ঘটে। ফলে হৃদয় তার প্রশান্তি হারায় এবং সন্তুষ্টি ও আত্মতৃপ্তির স্বাদ থেকে বঞ্চিত হয়।
সুতরাং আপনারা মহান আল্লাহকে ভয় করুন। সুখ যে পথে পাওয়া যায় না, সেই পথে সুখের সন্ধান করবেন না। এমন দরজায় সুখ খুঁজবেন না, যে দরজা আপনাকে সুখের কাছে পৌঁছাবে না। কারণ এর ফলে সুখ থেকে আপনাদের দূরত্বই কেবল বাড়বে এবং প্রকৃত সুখ থেকে আরও বঞ্চিত হবেন।
সুখের প্রকৃত পথ হলো আল্লাহর কিতাবকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শের অনুসরণ করা। কারণ কোরআন ও সুন্নাহর মধ্যেই রয়েছে হেদায়াত, রহমত ও চিরস্থায়ী সুখের দিকনির্দেশনা।
৭ আগস্ট শুক্রবার, মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবা। অনুবাদ করেছেন মুফতি আতিকুর রহমান