দেশে গ্রাম, শহর-বন্দর ও শিল্প এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। দেশ রূপান্তরে শুক্রবার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী গত পাঁচ বছরে একই দিনের বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ের চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বর্তমানে সর্বোচ্চ লোডশেডিং হচ্ছে। দুই বছরের ব্যবধানে লোডশেডিং বেড়ে প্রায় ১৮ গুণ হয়েছে। আর পাঁচ বছরের ব্যবধানে বেড়েছে প্রায় ৫০ গুণ। পিডিবির হিসাব অনুযায়ী ২০২২ সালের ১০ আগস্ট লোডশেডিং ছিল ৫৫ মেগাওয়াট; পরের বছর একই দিন যা ছিল ১১০ মেগাওয়াট। ২০২৪ সালে ১০ আগস্ট লোডশেডিং ছিল ১৫১ মেগাওয়াট; পরের বছর যা ছিল ৫৯ মেগাওয়াট। আর চলতি বছর একই দিন লোডশেডিং হয়েছে ২ হাজার ৭২২ মেগাওয়াট। ক্রমেই বাড়তে থাকা লোডশেডিংয়ের প্রভাবে মানুষ অনেক বেশি ভুগছে; কারণ এখন একই সঙ্গে গ্যাস ও এলএনজি সংকটও তীব্র হয়েছে। সব মিলিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তার দিক থেকে দেশে বেশ ঝুঁকি বিরাজ করছে।
অনেকদিন ধরে তৈরি হওয়া এই ঝুঁকি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝামেলাও দেখা দিয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে উৎপাদন, পণ্য পরিবহন, মানুষের যাতায়াত, বাসাবাড়ির রান্না এবং জীবনযাপনের ক্ষেত্রে। শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অভাবে বেশির ভাগ কলকারখানা বন্ধ। গ্যাসের অভাবে গ্যাসনির্ভর ব্যবস্থা থেকে বিদ্যুৎ মিলছে না। এতে রপ্তানিমুখী শিল্প ও ভোগ্যপণ্য উৎপাদনে প্রায় অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে। বিকল্প হিসেবে ডিজেল-বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করতে গেলে উৎপাদন খরচ বেশ বেড়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ, এলএনজি ও গ্যাসের বহুমুখী সংকটে শিল্পোৎপাদন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হওয়ায় ব্যবসায়ীরা চিন্তিত হয়ে পড়েছে। তৈরি পোশাক উৎপাদন ও রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী গ্যাস ও বিদ্যুতের অভাবে এ শিল্পের উৎপাদন প্রায় ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এতে রপ্তানি আয় কমতে পারে। শিল্প-কারখানাগুলো শিফট কমাতে, এমনকি বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছে। ছোট কারখানাগুলো শ্রমিক ছাঁটাইয়ের কথা ভাবছে। স্থানীয় পর্যায়ে নিত্যপণ্য সরবরাহব্যবস্থা বিঘ্নিত হতে পারে, এমন হুঁশিয়ারিও দেওয়া হচ্ছে।
বিদ্যুৎ, গ্যাস, এলএনজি ও জ্বালানি তেল সরবরাহের বড় সংকট সামগ্রিক জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুঁকি হয়ে দেখা দিতে পারে এমন হুঁশিয়ারি বিশ্লেষকরা কয়েক বছর ধরেই দিয়ে আসছেন। বিষয়গুলো দলনির্বিশেষে সরকারের নীতিনির্ধারকদের অজানা নয়। জ্বালানি খাতে দেশি-বিদেশি রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি বিনিয়োগ একেবারে আসেনি, তাও নয়। তাহলে, সমস্যা কোথায়? সমস্যা হলো গত কয়েক বছর জ্বালানি খাতে রহস্যজনক কারণে সুদূরপ্রসারী, সাহসী ও দলনিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সৌদি আরব, কাতার ও ইউএইসহ কয়েকটি দেশ থেকে এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণসহ জ্বালানি খাতে বড় বিনিয়োগের প্রস্তাব এসেছে। মৌখিকভাবে স্বাগত জানানো হলেও বাস্তবে প্রস্তাবগুলো তখনকার সরকারের কাছে গুরুত্ব পায়নি। দেশীয় প্রতিষ্ঠান সামিটের এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের অনুমোদন অন্তর্বর্তী সরকার বাতিল করেছে। ২০২৪ সালের আগস্টে দেশে ক্ষমতায় পরিবর্তনের পর থেকেই প্রতিবেশী ভারত থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রায়ই ঝামেলা হচ্ছে। নতুন সরকার এর আগে লোডশেডিংয়ের কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ও জ্বালানি তেলের সংকটকে দায়ী করেছে। এখন বলছে, এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালের অগ্নিকাণ্ডকে লোডশেডিংয়ের কারণ।
বিশ্লেষকরা অবশ্য বহুমুখী এ সংকট গভীরতর হওয়ার জন্য পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও কর্তৃপক্ষের দক্ষতার ঘাটতিকে সামনে আনছেন। শুরুতে লোডশেডিংয়ের নানা ব্যাখ্যা দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হলেও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এরই মধ্যে জনগণের কাছে সরকারের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
আমরা মনে করি, জ্বালানি নিরাপত্তার সংকট টেকসই উপায়ে কাটিয়ে ওঠার বহুমুখী চেষ্টায় সরকারকেই নেতৃত্ব দিতে হবে সঠিক, সুদূরপ্রসারী, সাহসী ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ব্যক্তি-গোষ্ঠীকে লাভবান করার ঊর্ধ্বে উঠে সিদ্ধান্তগুলো হতে হবে পুরোপুরি দলনিরপেক্ষ। ব্যবসায়ীরা সংকটের সুযোগ না নিয়ে এবং লাভ কম করে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন। শিল্পোদ্যোক্তারা একটু অসুবিধা এবং কিছু লোকসান হলেও শ্রমিক-কর্মচারীদের ধরে রাখুন। সবাই দাঁড়াই সবার পাশে।