একটি সমাজকে বুঝতে হলে, বিদেশি ধাঁচে সজ্জিত আলিশান বাড়ি নয় মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমে বসতে হয়। সেখানে থাকে একটি পুরনো বইয়ের আলমারি, দেশীয় শিল্প সামগ্রীর সর্বোচ্চ ব্যবহারের ড্রইংরুম, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠা, মাসের শেষে হিসাবের খাতা, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধের তালিকা এবং যাপিত জীবনের খরচকে কাটছাঁট করে বৃহৎ ও মহৎ স্বপ্ন লালন করে বাঁচার অভ্যাস। রাষ্ট্রের ইতিহাসে যুদ্ধের গল্প যেভাবে গুরুত্ব দিয়ে লেখা থাকে, তেমনি গুরুত্বহীন থাকে মধ্যবিত্তের নিত্যকার যুদ্ধ ইতিহাস। অথচ এই মধ্যবিত্ত শ্রেণিই নীরবে সভ্যতা বহন করে। বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত সমাজ গভীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, অন্যদিকে সীমিত আয়ের কারণে এই শ্রেণি নীরব সংগ্রামের মধ্যে নিপতিত।
দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণি এমন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আয় আছে কিন্তু নিশ্চয়তা নেই; শিক্ষা আছে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা নেই; সম্মান আছে স্বস্তি নেই; স্বপ্ন আছে কিন্তু নাগাল দূরে সরে যাচ্ছে। এই সংকটের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো, এটি উচ্চকণ্ঠ নয় নীরব। এই নীরবতার শব্দ সংবাদপত্রের শিরোনাম হয় না। অথচ প্রতিদিন অসংখ্য পরিবারের ভেতরে প্রতিধ্বনিত হয়। মধ্যবিত্ত বিশ্বাস করে শিক্ষা মানুষকে মুক্তি দেয়, পরিশ্রম মানুষকে সম্মান দেয় এবং সততা সময়মতো মূল্য পায়। কিন্তু একজন মেধাবী তরুণ যখন বছরের পর বছর চাকরির অপেক্ষায় থাকে, যখন একজন সৎ চাকরিজীবী মূল্যস্ফীতির কাছে অসহায় হন, যখন একজন শিক্ষক বা সরকারি কর্মচারী সংসারের ন্যূনতম চাহিদা মেটাতে হিমশিম খান, তখন বিশ্বাসে চিড় ধরে। সমাজের জন্য এটি কেবল অর্থনৈতিক সংকট নয়; এটি নৈতিক সংকটও। মধ্যবিত্তের আরও সামাজিক মর্যাদা ও নীরব সংকট রয়েছে। সাহায্য চাওয়ার সংকোচ তার অন্যতম। নিম্নবিত্তের মতো লাইনে দাঁড়িয়ে টিসিবির পণ্য কেনা বা সাহায্য নেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। পাশাপাশি সন্তানদের মানসম্মত শিক্ষা দিতে গিয়ে আয়ের বড় অংশ চলে যায়। হঠাৎ বড় কোনো অসুখ পুরো পরিবারের আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে। তখন বিনোদন, রেস্টুরেন্টে খাওয়া বা ঘুরতে যাওয়ার মতো খরচ বাদ দিতে হচ্ছে।
মধ্যবিত্তের জীবন যেন অবিরাম সমঝোতার নাম। তারা নিজের চিকিৎসা পিছিয়ে দেয় সন্তানের পড়াশোনার জন্য। বৃদ্ধ মা-বাবার ওষুধ কেনার জন্য, নতুন পোশাক কেনে না। অবকাশযাপন বাদ দেয়, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার কথা ভেবে। এ ত্যাগের হিসাব, জাতীয় আয়-ব্যয়ের পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না। অথচ জাতির মানবিক ভিত্তি, এই অদৃশ্য ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ‘মূল্যস্ফীতি’ মধ্যবিত্তের জীবনে শুধু অর্থের সংকট সৃষ্টি করেনি; এটি মানসিক শান্তি কেড়ে নিয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ঊর্ধ্বগতির ফলে, বাজারে যাওয়া এখন অনেকের কাছে আতঙ্কের বিষয়। যে পরিবার একসময় মাস শেষে কিছু সঞ্চয় হতো, তারা আজ সঞ্চয় ভেঙে বেঁচে আছে। আর যে পরিবার একসময় নিম্নবিত্তে নামার কথা কল্পনা করেনি, তারাও এখন সেই আশঙ্কা অনুভব করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে, শিক্ষা ও চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান ব্যয়। শিক্ষা যদি বিনিয়োগ হয়, তবে সেই বিনিয়োগের ফল পাওয়ার নিশ্চয়তা কোথায়? চিকিৎসা যদি অধিকার হয়, তবে কেন একটি বড় অসুস্থতা একটি পরিবারকে নিঃস্ব করে? প্রশ্নগুলোর উত্তর কেবল ব্যক্তির কাছে নয়, রাষ্ট্রের কাছেও প্রাপ্য। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, মধ্যবিত্তের মানসিক ক্লান্তি। তারা প্রতিবাদ করতে পারে না, আবার নীরবতাও ভাঙতে পারে না। বাইরে হাসিমুখে চললেও ভেতরে ভেতরে অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ এবং ভবিষ্যৎ-ভীতির সঙ্গে তারা লড়াই করে। তবু মধ্যবিত্ত সম্পূর্ণ পরাজিত হয় না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় এই শ্রেণিই ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, শিক্ষা বিস্তার, সংস্কৃতি চর্চা এবং সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রধান শক্তি ছিল। কারণ মধ্যবিত্তের শক্তি তার সম্পদে নয়; তার বিবেকে। সেই বিবেককে টিকিয়ে রাখতে হলে রাষ্ট্রকে এমন একটি পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে যেখানে সততা, যোগ্যতা এবং পরিশ্রমের মূল্য নিশ্চিত হয়। উত্তরণের পথ শুধু অর্থনৈতিক নয়; এটি নীতিগত। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, মানসম্মত সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থসেবা, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন, সাশ্রয়ী আবাসন এবং ন্যায্য করব্যবস্থা এসব কেবল অর্থনৈতিক কর্মসূচি নয়, এগুলো সামাজিক স্থিতিশীলতার শর্ত। একই সঙ্গে মধ্যবিত্তকে পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নতুন দক্ষতা অর্জন, সঞ্চয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং অপ্রয়োজনীয় সামাজিক প্রতিযোগিতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
একটি জাতি তখনই এগিয়ে যায় যখন মধ্যবিত্ত শুধু বেঁচে থাকে না, মর্যাদার সঙ্গে বাঁচে। কারণ মধ্যবিত্তের স্বপ্ন ভেঙে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ নিস্তেজ হয়, বইয়ের দোকান ফাঁকা হয়, শিল্প-সাহিত্য দুর্বল হয়, নাগরিক মূল্যবোধ ক্ষয়ে যায়। কিন্তু মধ্যবিত্তের আত্মবিশ্বাস ফিরে এলে রাষ্ট্রও নতুন শক্তি পায়। আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন মধ্যবিত্তকে করুণা করা নয়, তাদের প্রাপ্য মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একটি দেশের উন্নয়ন কেবল উঁচু সেতু, প্রশস্ত মহাসড়ক কিংবা উঁচু অট্টালিকায় মাপা যায় না; মাপা হয় দেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের রাতের ঘুম কতটা নির্ভার, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের বিশ্বাস কতটা অটুট এবং আগামীকাল তারা কতটা আশাবাদ নিয়ে স্বাগত জানাতে পারে। মধ্যবিত্তের দীর্ঘশ্বাস যেন জাতির নিয়তি না হয়। তাদের মুখের হাসিই হোক, উন্নয়নের নির্ভরযোগ্য সূচক।
লেখক : সাবেক চেয়ারম্যান প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্র