বরিশাল বিভাগের সঙ্গে সরাসরি বঙ্গোপসাগরে যুক্ত ৯টি প্রধান মোহনা মেঘনা, তেঁতুলিয়া, ভোলা, পটুয়াখালী, আন্ধারমানিক, পায়রা, বিষখালী, গলাচিপা ও বলেশ্বর নদের তলদেশে পলি জমে চ্যানেলগুলো ভরাট হয়ে গেছে। এতে বাধা তৈরি হয়েছে ইলিশের চলাচলে। নদীর নাব্য কমে যাওয়া, দূষণসহ নানা কারণেই দ্রুত কমতে শুরু করেছে ইলিশ উৎপাদন। এতে করে গত ৩ বছরেই এই অঞ্চলে অন্তত এক লাখ টন ইলিশ উৎপাদন কমে গেছে।
জানা গেছে, রুপালি এই মাছের প্রধান বিচরণক্ষেত্র বরিশাল বিভাগের নদ-নদীগুলোয় এখন দেখা দিয়েছে ইলিশের তীব্র আকাল। ফলে দাম বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণ। এতে উপকূলীয় জেলেদের মধ্যে হাহাকার বেড়েছে, ব্যবসায়ীরা পড়েছেন দেউলিয়া দশায়। বিজ্ঞানীরা বলছেন নদীর নাব্য, স্বাভাবিক গভীরতা ও উজানপ্রবাহ না বাঁচালে অদূর ভবিষ্যতে জাতীয় সম্পদ ইলিশ খুঁজে পাওয়া যাবে না।
মৎস্য অধিদপ্তরের বিগত ১৬ বছরের উৎপাদন পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০১০-২০১১ অর্থবছরে বরিশাল বিভাগে ইলিশের মোট উৎপাদন ছিল ১ লাখ ৭০ হাজার ৭৬২ মেট্রিক টন, যা বছর বছর বৃদ্ধি পেয়ে ২০২২-২৩ অর্থবছরে রেকর্ড সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৪৩ মেট্রিক টনে পৌঁছায়। তবে এরপর থেকেই কমতে শুরু করে উৎপাদন। ২০২৩-২৪ সালে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৮৩৪ মেট্রিক টনে, ২০২৪-২৫ সালে ৩ লাখ ৩৪ হাজার ৭৮৩ মেট্রিক টনে এবং সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে মাত্র ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৭ মেট্রিক টনে। অর্থাৎ, গত মাত্র তিন বছরের ব্যবধানেই বরিশালে ইলিশ উৎপাদন কমেছে ১ লাখ ৫ হাজার ৪৪৬ মেট্রিক টন।
জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিজেল ও পেট্রলের বাড়তি দাম, বরফ ও ট্রলার পরিচালনার খরচ বিপুল বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও নদীতে কাক্সিক্ষত ইলিশ মিলছে না। ফলে হাজার হাজার পরিবার আড়তদারের দাদন ও এনজিওর ঋণের জালে পিষ্ট হচ্ছে।
পটুয়াখালীর মহিপুরের জেলে মো. হারুন বলেন, ‘নদীর গভীর চ্যানেলে দুই-তিন দিন ঘুরলেও মাছ মিলছে না। তেল, বরফ আর খাবারের টাকাই উঠছে না। মহাজনের দাদন আর এনজিওর কিস্তির চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’
একইভাবে হতাশার কথা জানান বরগুনার পাথরঘাটার ট্রলারচালক ও জেলে আব্দুস সোবাহান। তিনি বলেন, ‘মোহনাগুলোতে এখন বড় বড় ডুবোচর। আন্ধারমানিক, বিষখালী আর বলেশ্বরের মুখ পলি জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় সাগরের ইলিশ আর নদীতে ঢুকতে পারে না। একদিকে মোহনা ভরাট, অন্যদিকে জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম। জালের দাম, বরফের দাম সবই দ্বিগুণ। কিন্তু নদীতে যে পরিমাণে জেলে ও অবৈধ জাল বাড়ছে, তাতে সাধারণ জেলেরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। সরকার যদি মোহনাগুলো দ্রুত ড্রেজিং না করে এবং জেলেদের জ্বালানি ও ঋণে বিশেষ সাহায্য না দেয়, তবে না খেয়ে মরা ছাড়া উপায় থাকবে না।’
অভিজ্ঞ জেলে সর্দার মো. সেন্টু আধুনিক ‘ট্রলিং বোটের’ তা-বকে ইলিশ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে দায়ী করেন। তিনি বলেন, এই দোতলা আধুনিক ট্রলিং বোটগুলোয় উন্নত যন্ত্রের সাহায্যে জাল ফেলা ও টানা হয়। এরা শুধু বড় মাছ ধরে না, ইলিশের ডিম্বাণুযুক্ত মা-ইলিশ থেকে শুরু করে পোনা মাছ পর্যন্ত সমুদ্রের তলা থেকে ছেঁকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। এই ট্রলিং বোটের দাপটে সাধারণ ট্রলারগুলো খালি হাতে ফিরছে।’
ইলিশ আহরণ কম হওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়েছে দক্ষিণাঞ্চলের বড় বড় পাইকারি বাজারে। সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে রেকর্ড পরিমাণ, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। বরিশাল পোর্ট রোডে এলসি সাইজের ইলিশ প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে ৯৮ হাজার টাকায়। ১ কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ১ লাখ ৮ হাজার টাকায়। এ ছাড়া ৫০০ গ্রাম সাইজের ইলিশ প্রতি মণ ৮৫ হাজার টাকা, ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম সাইজের ইলিশ প্রতি মণ ৫৫ হাজার থেকে ৬৫ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
বরিশাল জেলা মৎস্য আড়তদার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জহির সিকদার উদ্বেগ প্রকাশ করে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভরা মৌসুমে আগস্টের এই সময়ে বরিশাল পোর্ট রোডের আড়তগুলোয় প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই হাজার মণ ইলিশ আসার কথা। অথচ এখন সারা দিনে সব আড়ত মিলিয়ে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ মণ মাছও আসছে না! পটুয়াখালীর মহিপুর কিংবা দক্ষিণাঞ্চলের বড় বড় আড়তের অবস্থাও একই; কোথাও মাছ নেই।’
নদীতে ইলিশ না আসার কারণ তুলে ধরে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞান অনুষদের ডিন ডক্টর হাফিজ আশরাফুল বলেন, ‘ইলিশ হচ্ছে গভীর পানির মাছ, তীব্র স্রোতের মাছ। এদের অবাধ বিচরণের জন্য নদীর গভীরতা এবং শক্তিশালী পানির স্রোত বা নেভিগেশন প্রয়োজন, যা শুধু অগভীর বা পানিশূন্য নদীতে পাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত উজান থেকে আসা সবগুলো নদীতে বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছে। বাংলাদেশের যত নদী ছিল, তার মূল চ্যানেলগুলো আজ শুকিয়ে প্রায় মরে গেছে। পানির তীব্র স্রোত যেখানে নেই, সেখানে সাগর থেকে ইলিশ নদীতে আসার কোনো কারণই নেই।’
তিনি বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে উজান থেকে পানির যে প্রবল স্রোত নদীবাহিত পলি ও সিল্টেশন বয়ে নিয়ে বঙ্গোপসাগরে ফেলার কথা ছিল, পানিপ্রবাহ না থাকায় সেই পলি আর সাগরে পৌঁছাতে পারছে না। ফলে সেই পলি এখন নদীর বুকেই জমা হচ্ছে। এতে বঙ্গোপসাগরে যুক্ত প্রধান মোহনাগুলোর তলদেশ ভরাট হয়ে নদীর বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্য সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে। ফলে সাগর থেকে ইলিশ নদীতে প্রবেশে বাধা পাচ্ছে।’
বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য দপ্তরের উপপরিচালক মো. মহসীন জানান, ইলিশ না পাওয়ার পেছনে নাব্য সংকট এবং নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত জেলের অস্বাভাবিক উপস্থিতি বড় ভূমিকা রাখছে।
তিনি আরও জানান, বরিশাল বিভাগের সঙ্গে সরাসরি বঙ্গোপসাগরে যুক্ত ৯টি প্রধান মোহনা মেঘনা, তেঁতুলিয়া, ভোলা, পটুয়াখালী, আন্ধারমানিক, পায়রা, বিষখালী, গলাচিপা ও বলেশ্বর নদের তলদেশে পলি জমে চ্যানেলগুলো ভরাট হয়ে গেছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) মাধ্যমে এসব মোহনা ড্রেজিং (খনন) করা দরকার। একই সঙ্গে অবৈধ ট্রলিং বোট ও নিষিদ্ধ জাল নিয়ন্ত্রণে নৌপুলিশ ও কোস্ট গার্ডের সমন্বয়ে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকা দরকার।’