রেকর্ড দাম, ক্রেতারা ফিরছেন খালি হাতে

রাজধানীর মালিবাগের বেসরকারি চাকরিজীবী জাকির হোসেন এখনো এ মৌসুমে ইলিশের স্বাদ নিতে পারেননি। বাসার কাছের মাছবাজারে দাম বেশি বলে গত বৃহস্পতিবার ভোরে গিয়েছিলেন কারওয়ান বাজারে মাছের পাইকারি আড়তে; তবে কম দামে মাছ কেনার আশায় গুড়েবালি পড়েছে। এ দোকানে সে দোকানে ঘুরে বিক্রেতাদের মুখে দাম শুনেই ইলিশ কেনার সাহস পাননি তিনি। শেষ পর্যন্ত কিছুু চিংড়ি মাছ কিনে বাসায় ফিরতে হয়েছে তাকে।

দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘ইলিশের দাম আমার সাধ্যের মধ্যে নেই। তাই ইলিশ কেনার সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। কারণ বাজেটের বাইরে গিয়ে ইলিশ কিনলে অন্য প্রয়োজনীয় মাছ কিনতে পারব না; খাবারে কাটছাঁট করতে হবে।’ 

একই অবস্থা ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টারের গৃহিনী শামিমা আক্তারেরও। তিনি বাজারে এসে সন্তানের জন্য ছোট্ট একটি ডিমওয়ালা ইলিশ ওজন করেও রেখে যেতে বাধ্য হন।

ঢাকা শহরের সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর জন্য ইলিশ কেনা স্বপ্নের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক মানুষ বাজারে এসে ইলিশ দেখেন, দাম করেন পরে অন্য মাছ কিনে বাড়ি ফেরেন। এটা নিত্য ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ ইলিশের দাম সাধারণের সক্ষমতার বাইরে। গত ৫ বছরের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি দামে এখন ইলিশ বিক্রি হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট বিক্রেতারা ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরবরাহ ঘাটতি ও ইলিশ ধরার খরচ বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করছেন।

ঢাকার কারওয়ান বাজার ও মেরুল বাড্ডার পাইকারি বাজার, বনশ্রী, রামপুরা, সেগুনবাগিচা, মগবাজারসহ কয়েকটি খুচরা বাজার ঘুরে জানা গেছে, ৪ থেকে ৫টি মিলে এক কেজি হয় এমন মাছের দাম এখন ৮শ থেকে ৯শ টাকা। তিনটিতে এককেজি হয় এ ধরনের প্রতি কেজি মাছ মানভেদে ১২শ থেকে ১৪শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আধা কেজি বা তার কাছাকাছি ওজনের ইলিশের দাম হাঁকা হচ্ছে ১৪শ থেকে ১৮শ টাকা।

এছাড়া ৭শ থেকে ৯শ গ্রাম ওজনের মাছ প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮৫০ টাকা থেকে ২২শ টাকায়। এক কেজি বা তার কাছাকাছি ওজনের মাছ বিক্রি করতে দেখা গেছে ২ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ২ হাজার ৫শ টাকায় বা তারও বেশি দামে। এক কেজি থেকে দেড় কেজির ওজনের যেসব মাছ পাওয়া যাচ্ছে সেগুলো ২ হাজার ৬শ থেকে ৩ হাজার একশ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেড় কেজির বেশি ওজনের মাছ ইচ্ছেমতো দামে বিক্রি হচ্ছে। এগুলোর দাম কোথাও ৩ হাজার ৫শ থেকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা। দামের ক্ষেত্রে নদী বা সাগরের মাছ এবং মাছের রঙ গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের গত বছর ইলিশের দাম নিয়ে করা এক সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, ২০২০-২১ সালে ইলিশের সর্বনিম্ন গড় দাম ছিল ৯শ টাকা এবং সর্বোচ্চ দাম ছিল ১ হাজার ৪শ টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দাম ছিল ৭৫০ থেকে ১৮শ টাকা। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ৯শ টাকা থেকে ২২শ টাকায় ইলিশ বিক্রি হয়েছে।

কমিশন জানিয়েছিল, সাধারণত ৪ থেকে ৬ হাত বদলে ইলিশ মাছ খুচরা গ্রাহকের কাছে পৌঁছায়। প্রতিটি ধাপে মাছের দাম ৫৯ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। মাছ ধরার খরচ বেড়ে যাওয়া, হিমাগারে সংরক্ষণ করে চড়া দামে বিক্রি করা, রপ্তানির অনুমতি এবং নদীর মোহনায় ইলিশের পরিমাণ দুই-তৃতীয়াংশ কমে যাওয়াকে দামবৃদ্ধির কারণ বলেছিল প্রতিষ্ঠানটি।

ঢাকার কারওয়ান বাজারের মা-বাবার দোয়া ফিশ-এর বিক্রেতা আব্দুল জলিল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইলিশের সরবরাহ গত বছরের তুলনায় কম এবং দামও বেশি। যেসব অঞ্চল থেকে ইলিশের সরবরাহ আসছে সেখানেই চড়া দাম। যারা ইলিশ ধরছে তাদের খরচ বেড়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বেশি দামের কারণে অনেক মানুষ শুধু দাম জিজ্ঞেস করেন, ইলিশ কিনতে পারছেন না। দাম শুনে মন খারাপ করে তারা যান। আমাদের বিক্রিও সীমিত হয়ে পড়েছে, একটা নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যে এটা সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।’

নদীর ইলিশের স্বাদের জন্য চাঁদপুর দেশজুড়ে পরিচিত। এ পরিচয়ে চড়া দামে অনেকেই ঢাকার ইলিশ বিক্রি করেন। চাঁদপুরের জেলেরাও এখন আশা অনুযায়ী ইলিশ না পেয়ে হতাশ।

হরিণা ফেরিঘাট-সংলগ্ন এলাকার জেলে দিদারুল ইসলাম বলেন, ‘মাছ না পেলে দেনা বাড়ে। অনেক জেলে নৌকা বিক্রি করে অন্য পেশায় চলে গেছেন। নদীতে মাছ না পাওয়ার এ অবস্থা চলতে থাকলে জেলে পরিবারগুলো চলতেই পারবে না।’

ইলিশের সংকটের প্রভাব পড়েছে দেশের অন্যতম বড় পাইকারি বাজার চাঁদপুর বড় স্টেশন মাছঘাটেও। যেখানে মৌসুমে দিন-রাত বেচাবিক্রির ধুম লেগে থাকে সেখানে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। সরবরাহ কম থাকায় দাম বেড়েছে। মাছ-ব্যবসায়ী নবির হোসেন বলেন, ‘মৌসুম শুরু হলেও ঘাটে মাছের সরবরাহ কম। দাম বেশি হওয়ায় ক্রেতাও কমে গেছে।’ 

উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রভাব টের পাওয়া যায় মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবের খাতায়। সংস্থাটির তথ্য বলছে, ২০২০-২১ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৫ লাখ ৬৫ হাজার টন। ২০২১-২২-এ উৎপাদন দাঁড়ায় ৬ লাখ ৬৭ হাজার টনে। ২০২২-২৩-এ উৎপাদন দাঁড়ায় ৫ লাখ ৭১ হাজার টনে। এরপর কমতে শুরু করে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন কমে দাঁড়ায় ৫ লাখ ২৯ হাজার টনে। পরের অর্থবছরে দাঁড়ায় ৫ লাখ ৪ হাজার টনে। সদ্য বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের আনুষ্ঠানিক হিসাব প্রকাশ না করলেও ধারণা করা হচ্ছে এটা ৫ লাখ টনের নিচে নামবে।

গবেষকরা বলছেন, জলবায়ুর পরিবর্তন, নদীদূষণ, নাব্যর সংকট এবং অতিরিক্ত মাছ আহরণের কারণে উৎপাদনে প্রভাব পড়েছে। তবে ইলিশ একেবারে নেই তা নয়।

ইলিশ-গবেষক ও মৎস্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক আনিসুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত দুই বছর সামগ্রিক উৎপাদন কমেছে, ইলিশের গড় আকারও ছোট হয়ে গেছে। এক সময় ইলিশের গড় আকার ছিল ৪০০ থেকে ৪৫০ গ্রাম, যা এখন ৩০০ থেকে সাড়ে ৩৫০ গ্রামে দাঁড়িয়েছে।’

তার মতে, এর কারণ দুটি। একটি মানুষের তৈরি অতিরিক্ত মাছ আহরণ, অবৈধ জালের ব্যবহার, জাটকা নিধন, নিষিদ্ধ সময়ে ডিমওয়ালা ইলিশ ধরা, দূষণ এবং ইলিশের চলাচলের পথে বাধা তৈরি করা।

দ্বিতীয় কারণ প্রাকৃতিক। তিনি বলেন, ‘বৈশি^ক উষ্ণতাবৃদ্ধির কারণে বৃষ্টিপাতের কম-বেশি হওয়া, পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং ইলিশের জীবনচক্র সম্পন্ন করার যথাযথ পরিবেশ না থাকা।’ 

গত সপ্তাহে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ‘ইলিশের উৎপাদনে ও বিচরণে দূষণ একটি বড় বাধা। ইলিশ অত্যন্ত সংবেদনশীল মাছ। নির্দিষ্ট সময়ে সমুদ্র থেকে মিঠা পানির সংস্পর্শে আসে। নদীর পানিতে দূষণ বেড়ে গেলে ইলিশ ওই এলাকা থেকে সরে যেতে থাকে। তাই ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে নদীদূষণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি।’

মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ডিম ছাড়ার মৌসুমে সাগর থেকে নদীপথে উজানে উঠে আসে মা ইলিশ। ডিম ছেড়ে আবার ফিরে যায় সাগরে। সাগর থেকে নদী, আর নদী থেকে সাগরে ইলিশের চলাচলের পথ (মাইগ্রেটরি রুট) ভরাট হচ্ছে পলি জমে। সেখানে সৃষ্টি হচ্ছে ডুবোচর। ইলিশ আর উজানে এগোতে পারছে না। এতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে ইলিশের প্রজনন।

জানা গেছে, ইলিশের জীবনচক্রে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে নদীর বুকে জেগে ওঠা অন্তত ২৫টি চর। চাঁদপুরের মেঘনা-তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় তৈরি হওয়া এসব চরে প্রায় ৮৮ কোটি টন পলি জমেছে। নদীর গভীরতা ৫ থেকে ১০ মিটার (১৫ থেকে ৩০ ফুট) থাকার কথা থাকলেও পলি জমার কারণে তা কমে ২ থেকে ৩ মিটার হয়েছে।

সংকট কাটাতে মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মোহনায় প্রায় ২০ কিলোমিটার নদীখননের জন্য নৌপরিবহন ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়েছে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়।