টানা গ্যাস সংকটে চট্টগ্রামে সর্বস্তরের জনজীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে। বাসাবাড়ির রান্নার চুলা থেকে শুরু করে রাজপথ; সর্বত্রই এর আঁচ লেগেছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পরও গ্যাস না পেয়ে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকরা। লাইনে গ্যাস না পেয়ে বাধ্য হয়ে এলপিজি সিলিন্ডারের দিকে ঝুঁকছেন নগরবাসী। অন্যদিকে পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাবে স্থবির হয়ে পড়েছে পরিবহন ও বাণিজ্যিক খাত।
গককাল শুক্রবার ভোর থেকেই ষোলশহর মোড় সংলগ্ন প্রধান সড়কে অবস্থান নেন কয়েকশ অটোরিকশা চালক। তাদের অভিযোগ, ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ‘ফসিল ফিলিং স্টেশন’-এর সামনে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও রিফুয়েলিং করতে পারছেন না তারা।
চালকদের আকস্মিক এই অবরোধে মুরাদপুর থেকে ২ নম্বর গেটমুখী সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যানজটের সৃষ্টি হয়।
মো. শাহ আলম নামের এক অটোরিকশা চালক বলেন, ‘এক দিনের বেশি সময় গাড়ি নিয়ে লাইনে পড়ে আছি। গ্যাস না থাকলে গাড়ি চলবে কীভাবে? আয়-রোজগার না থাকলে পরিবার নিয়ে কীভাবে বাঁচব, সেই চিন্তায় রাতে ঘুম আসছে না।’
একই ধরনের কষ্টের কথা জানান মনু মিয়াজি নামে আরেক চালক। তিনি বলেন, ‘দুই দিন ধরে এক টাকাও আয় হয়নি। অথচ মালিকের দৈনিক জমা আর ঘরের বাজার তো বন্ধ নেই। এভাবে চললে আমাদের না খেয়ে মরতে হবে।’ অটোরিকশা চালক মুজিবুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, নগরের প্রায় সব পাম্পেই একই চিত্র। তীব্র সংকট থাকা সত্ত্বেও সমাধান না হওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন।
এ বিষয়ে ফসিল ফিলিং স্টেশনের এক প্রতিনিধি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রধান লাইন থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকায় তাদের পক্ষে রিফুয়েলিং সম্ভব হচ্ছে না। সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পাম্প কর্র্তৃপক্ষের নিজস্ব কিছু করার নেই।
পাঁচলাইশ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জহেদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, পুলিশ চালকদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। সাড়ে ৭টার দিকে তারা সড়ক ছেড়ে দেয়। পরে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
এদিকে আবাসিক খাতে টানা সরবরাহ না থাকায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন চট্টগ্রাম নগরীর বাসিন্দারা। জামালখান, হালিশহর, কাজীর দেউড়িসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা রান্নার জন্য ভোর সাড়ে ৪টায় ঘুম থেকে উঠতে বাধ্য হচ্ছেন। গ্যাস কখন আসবে আর কখন যাবে, তার ওপর ভিত্তি করেই বদলে গেছে তাদের খাওয়া ও দৈনন্দিন কাজের সূচি।
গৃহবধূ তামান্না হক বলেন, বুধ ও বৃহস্পতিবার সারা দিন গ্যাস ছিল না। একটু পর পর চুলা জ্বালিয়ে হতাশ হতে হয়েছে। সারা রাত জেগে থেকে ৪টার দিকে একটু গ্যাস পেয়েছি। সেগুলো দিয়েই রান্না সেরেছি।
পাইপলাইনের গ্যাসের চরম অনিশ্চয়তা কাটাতে বিপুলসংখ্যক নগরবাসী বাধ্য হয়ে ঝুঁকছেন এলপিজি সিলিন্ডারের দিকে। এলপি গ্যাস পরিবেশক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে চট্টগ্রামে সিলিন্ডারের বিক্রি প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। তবে নতুন সিলিন্ডার ও উপযোগী চুলা কিনতে গিয়ে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোকে গুনতে হচ্ছে সাড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা বাড়তি খরচ।
চট্টগ্রামে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) তথ্য অনুযায়ী, নগরে দৈনিক প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে শুক্রবার পাওয়া গেছে মাত্র ১৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় মিলছে মাত্র ৪৩ শতাংশ গ্যাস। আর প্রতিদিনের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ২০ কোটি ঘনফুটে।
প্রতিষ্ঠানটির উপমহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ রফিক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্যাস সরবরাহ কম থাকায় গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। আজ শুক্রবার (গতকাল) সকালে চট্টগ্রামে ১৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেছে। সমস্যা কখন সমাধান হবে আমাদের জানা নেই।