চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে ১৭১টি পণ্য চালানে জাল রেকর্ডপত্র ও মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে প্রায় ১৬৩ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগের অনুসন্ধান চলছে প্রায় ১৫ বছর ধরে। দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) আরও দুটি সরকারি সংস্থা তদন্ত করলেও এখনো বিষয়টির সুরাহা হয়নি। প্রাথমিকভাবে ৪২ জন আমদানিকারক, ১২ জন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট এবং কয়েকজন কাস্টমস কর্মকর্তার জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি।
দুদক সূত্রে জানা যায়, একই নম্বরে দুটি বিল অব এন্ট্রি দেখিয়ে এবং ইমপোর্ট জেনারেল ম্যানিফেস্টে (আইজিএম) উচ্চ শুল্কহারের পণ্য ঘোষণা করা হলেও কাস্টমস কর্মকর্তাদের সহায়তায় সেগুলো কম বা শূন্য শুল্কহারে খালাস দেওয়া হয়। এ বিষয়ে চট্টগ্রামের একজন ব্যবসায়ী প্রায় ১৫ বছর আগে দুদকে অভিযোগ করেন। অভিযোগের সঙ্গে ১৭১টি চালানের তালিকাও দেওয়া হয়েছে। এতে দেখা যায়, আমদানিকারক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টসহ কিছু কাস্টমস কর্মকর্তা যোগসাজশ করে ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ১৭১টি চালানের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন। মিথ্যা ঘোষণা ও জাল কাগজপত্রের ভিত্তিতে চালানগুলোর শুল্কায়ন করা হয়।
অভিযোগটি অনুসন্ধানের জন্য ২০১১ সালের ২১ ডিসেম্বর দুদকের প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (বর্তমানে পরিচালক হিসেবে পিআরএল) এসএমএম আখতার হামিদ ভূঞাকে টিম লিডার এবং মো. মুজিবুর রহমানকে সদস্য করে দুই সদস্যের একটি অনুসন্ধান দল গঠন করা হয়। পরে ২০১২ সালে উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলমকেও অনুসন্ধান দলে যুক্ত করা হয়। পরের বছর ২০১৩ সালে উপপরিচালক মো. নাসির উদ্দিনকে টিম লিডার করে চার সদস্যের নতুন দল গঠন করে দুদক। এরপর ২০১৮ সালে আবার উপপরিচালক মো. নাসির উদ্দিনকে টিম লিডার করে পাঁচ সদস্যের দল গঠন করা হয়। অনুসন্ধান দলটি ২০টি মামলার সুপারিশ করে কমিশনে প্রতিবেদন দেয়। তবে এরপর ধামচাপা পড়ে যায় পুরো বিষয়টি। দীর্ঘদিন পর গত বছরের ৮ এপ্রিল দুদকের উপপরিচালক মোজাম্মিল হোসেনকে টিম লিডার করে চার সদস্যের আরেকটি দল করা হয়। এই দলটি এখন ঘটনার অনুসন্ধান করছে।
দুদকের আগে এনবিআরের শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর এবং চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজও অভিযোগ তদন্ত করে। উচ্চ আদালতের আদেশে ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে তখনকার মহাপরিচালক সুলতান মো. ইকবালের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি করা হয়। এই কমিটি পরের বছরের ২৪ জুন তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে ৪০ জন রাজস্ব কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করা হয়েছিল। রাজস্ব ফাঁকি এবং ১৭১টি নথি গায়েবের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে কমিটি। পরে ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের পক্ষ থেকেও একটি তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়। ওই প্রতিবেদনে রাজস্ব ফাঁকির সঙ্গে ৩৬ জন কর্মকর্তার সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজের পক্ষ থেকে এ অভিযোগের তদন্ত করা হয়।
একটি তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংগৃহীত নথিপত্র ও কাগজপত্র পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ১৭১টি চালানের প্রতিটির জন্য আলাদাভাবে রাজস্ব ক্ষতির হিসাব নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য মূল নথি, বিল অব এন্ট্রি, আইজিএম, ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট, বিল অব লেডিং, এলসি, সিআরএফ, ইন্স্যুরেন্স কভার নোটসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাগজপত্র পরীক্ষা করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সময়ে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে বিল অব এন্ট্রি প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্বলতা ছিল। তখনকার নিয়ম অনুযায়ী সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা কাস্টম হাউজের বাইরে থেকে অনলাইনে বিল অব এন্ট্রি দাখিল করে রেজিস্ট্রেশন নম্বর নিতেন। এরপর বিল অব এন্ট্রিসহ আমদানি-সংক্রান্ত মূল কাগজপত্র কাস্টম হাউজের নিচতলার একটি শাখায় জমা দেওয়া হতো। সেখানে দায়িত্ব পালনকারী কর্মচারীরা বিল অব এন্ট্রির ডাটাশিটে ‘আইজিএম চেকড অ্যান্ড ফাউন্ড কারেক্ট’ লিখে সই করতেন। এরপর মূল কাগজপত্রসহ ডেটাশিট পাঠানো হতো রাজস্ব কর্মকর্তার কাছে। রাজস্ব কর্মকর্তারা ইনভয়েস ও প্যাকিং লিস্টে পণ্যের বিবরণ, আমদানিকারকের ঘোষণা, ঘোষিত এইচএস কোড এবং একই সময়ে আমদানি করা একই ধরনের পণ্যের মূল্য বা রেফারেন্স মূল্য যাচাইয়ের জন্য নথি সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তার কাছে পাঠাতেন। সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তারা ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট, বিল অব লেডিং, এলসি, সিআরএফ, ইন্স্যরেন্স কভার নোট বা পলিসিসহ সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র পরীক্ষা করতেন। কোনো সংশোধনের প্রয়োজন হলে তা সংশোধন করে বিল অব এন্ট্রি শুল্কায়নের জন্য পাঠানো হতো।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুল্কায়নের শেষ ধাপে ছিল সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। সাধারণত বিল অব এন্ট্রিতে দেওয়া ঘোষণা ও সংযুক্ত কাগজপত্রের বিবরণ মিলিয়ে দেখা হলেও ঘোষিত পণ্যের প্রকৃত সত্যতা যাচাইয়ের সুযোগ ছিল সীমিত। কোনো গরমিল ধরা পড়লেই কেবল কায়িক পরীক্ষার সুযোগ থাকত। নইলে আমদানিকারকের ঘোষণার ভিত্তিতেই শুল্কায়ন করা হতো।
তবে শুল্ক আইন অনুযায়ী বিল অব এন্ট্রি রেজিস্ট্রেশনের পর আমদানিসংক্রান্ত সব নথিসহ ডাটাশিট সংশ্লিষ্ট কাস্টমস কর্মকর্তার কাছে পাঠানোর বাধ্যবাধকতা ছিল। একই সঙ্গে আইজিএমে ঘোষিত পণ্যের বিবরণ ও পরিমাণ এবং বিল অব এন্ট্রিতে উল্লেখিত পণ্যের বিবরণ ও পরিমাণ সঠিক কি না, তা যাচাই করার দায়িত্ব ছিল সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেও ওপর। আইজিএম গ্রহণ ও সংরক্ষণ করাও ছিল কাস্টমস কর্র্তৃপক্ষের দায়িত্ব। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এসব বাধ্যতামূলক যাচাই-বাছাইয়ের পরও ১৭১টি চালানে কীভাবে মিথ্যা ঘোষণা, জাল কাগজপত্র কিংবা অসঙ্গত তথ্যের ভিত্তিতে শুল্কায়ন করা হয়েছে।
একই নম্বরে দুটি বিল অব এন্ট্রি ব্যবহারের মতে গুরুতর অনিয়মই বা কীভাবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নজর এড়িয়ে গেল সেটিও তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত ১৭১টি চালানের প্রতিটি নথি ধরে আলাদা যাচাই করে প্রকৃত রাজস্ব ক্ষতি এবং সংশ্লিষ্ট আমদানিকারক, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও কাস্টমস কর্মকর্তাদের ভূমিকা নির্ধারণ করা প্রয়োজন।