বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে প্রায় দুই বছর ধরে চলতে থাকা টানাপড়েনের দ্রুত অবসান চায় ভারত। এ কারণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তৎপর হয়েছে দেশটির সরকার। তাকে নয়াদিল্লি সফরের জন্য দুই দফা আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে ভারত যেভাবে এবং যখন তারেক রহমানের সফর চাইছে, ঠিক সেভাবে সাড়া দেওয়ার জন্য প্রস্তুত নয় বাংলাদেশ সরকার।
সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা মনে করেন, দুই নিকট প্রতিবেশী দেশের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে সফর হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। তবে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এখন যে অবস্থায় আছে, তাতে সফর হলে তা থেকে কোন দেশ কী অর্জন করতে চায়, কীভাবে এবং কতটা, সেগুলো নিয়ে বোঝাপড়ার ব্যাপার আছে; আলোচনার দরকার আছে সেই আলোচনাই এখনো শুরু হয়নি।
ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নয়াদিল্লিতে আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক আয়োজনের জন্য ভারত চেষ্টা করছে। সম্ভব হলে দ্রুত চলতি সপ্তাহের শেষ নাগাদ এমন একটি বৈঠকের জন্য ভারত বেশ আগ্রহী। তবে উভয় দেশের চারটি কূটনৈতিক সূত্র দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছে, তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফরের দিনক্ষণ গতকাল শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব সালেহ শিবলী গতকাল সন্ধ্যায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরের আমন্ত্রণ পেয়েছেন। তবে যাওয়া না যাওয়ার বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।’
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, জরুরি পরিস্থিতি না হলে প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ে নিয়মিত সফরের প্রস্তুতির জন্য যে সময় লাগে (প্রিপারেটরি টাইম), তাতে এক সপ্তাহ মোটেই বাস্তবসম্মত নয়। দুই দেশ এমন সফর থেকে বাস্তবসম্মত কী অর্জন করতে চায়, সেসব বিষয়ে নেপথ্যে ধাপে ধাপে বিভিন্ন পর্যায়ে দরকষাকষি করে একমত হতে পারলে, আগামী সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি নাগাদ সফরটি হলেও হতে পারে।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে গতি আনার চেষ্টার অংশ হিসেবে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী গত সপ্তাহে দুই দেশেরই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। ঢাকায় তারেক রহমানের সঙ্গে গত সোমবার সাক্ষাতের পর দিনই তার বার্তা নিয়ে হাইকমিশনার মঙ্গলবার নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে নয়াদিল্লিতে জরুরিভিত্তিতে বৈঠক করেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার জন্য ‘একটি উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির প্রয়োজনীয়তার’ ওপর জোর দেন। অন্যদিকে মোদির সঙ্গে হাইকমিশনারের সাক্ষাতের পর ভারতীয় কূটনৈতিক সূত্র অনানুষ্ঠানিকভাবে জানায়, দেশটি চায় বাংলাদেশের সঙ্গে বহুমুখী সম্পর্ক গঠনমূলক উপায়ে দীর্ঘস্থায়ীভিত্তিতে শক্তিশালী হোক।
হাইকমিশনার ত্রিবেদী নয়াদিল্লি থেকে ঢাকায় ফিরেছেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফর এবং বাংলাদেশের প্রত্যাশার বিষয়ে ভারত সরকারের অবস্থানের কথা সহসা ঢাকায় সরকারকে অবহিত করবেন, এমনটি মনে করেন কূটনীতিকরা।
ত্রিবেদী গতকাল শনিবার ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনে দেশটির ৮০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বলেন, দুই দেশের মধ্যকার বহুমুখী সম্পর্ক উন্নত করার এবং নতুন নতুন খাতে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথগ্রহণের দিন গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে দেওয়া একটি পত্রে নরেন্দ্র মোদি ভারত সফরের আমন্ত্রণ জানান। সম্প্রতি ‘বিমসটেক চেয়ারপারসন’ হিসেবে আগামী সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি ব্রিকস আউটরিচ কর্মসূচিতে অংশ নিতে মোদি আরেকটি চিঠি দেন।
কূটনীতিকরা বলছেন, বাংলাদেশ সরকার যখন দক্ষিণ এশিয়া সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) চাঙা করার কথা বলছে, ভারত একই সময়ে চায় বিমসটেককে এগিয়ে নিতে। এখানে দেশ দুটির অগ্রাধিকারে বৈপরীত্য আছে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের নয়াদিল্লি সফর প্রসঙ্গে কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট এম হুমায়ুন কবির দেশ রূপান্তরকে গতকাল বলেন, দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্কের বর্তমান অবস্থায় নয়াদিল্লিতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘একটি বড় বিবেচ্য বিষয়’। তার বিষয়টি ফয়সালা হলে অন্য দ্বিপক্ষীয় বিষয়গুলো দুই দেশ আলোচনার মাধ্যমে এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ পাবে।
গণঅভ্যুত্থানের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ঢাকায় শেখ হাসিনার সরকারের পতন হলে তিনি সেদিনই ভারতে যান। গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে ঢাকার একটি আদালত তাকে মৃত্যুদ- দেয়। বাংলাদেশ সরকার তাকে ফেরত চেয়ে ভারতকে কয়েক দফা পত্র দিয়েছে। অন্যদিকে ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্যানুযায়ী, তার আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ইচ্ছে আছে। তিনি ভারত থেকে গণমাধ্যমে নানামুখী বক্তব্য দিয়ে চলেছেন, এটি বাংলাদেশে বর্তমান সরকার ও বিরোধী দল ভালোভাবে নেয়নি। তারেক রহমান যাতে এখন ভারতে না যান, সে বিষয়ে বিরোধী দলের চাপ অব্যাহত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক এ রাষ্ট্রদূত বলেন, শেখ হাসিনাকে ফেরত আনার মতো জটিল বিষয়ে প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তৃতা-বিবৃতি যেমনই হোক, দুই সরকারের ভেতরকার অবস্থান ভিন্ন হতে পারে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হলে শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে একটি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্তে দুই সরকারকে আসতে হবে।
হুমায়ুন কবির বলেন, শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে অন্তত তিনটি বিকল্প নিয়ে দুই সরকারের কাজ করার সুযোগ আছে। প্রথমত তিনি দেশে ফিরলে আইনের আশ্রয়ে নেওয়া। এ ক্ষেত্রে তার ফেরার পর দেশের ভেতরকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা বিবেচনায় রাখা দরকার হতে পারে।
দ্বিতীয়ত তিনি রাজি থাকলে তাকে তৃতীয় দেশে, যেমন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন।
তৃতীয়ত শেখ হাসিনা যদি দিল্লিতে অবস্থান অব্যাহত রাখতে চান, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের স্পর্শকাতরতার দিকগুলো কীভাবে সামাল দেওয়া হবে, তাও বিবেচনায় রাখা দরকার হতে পারে।
বিইআই প্রেসিডেন্ট বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরে ইস্যু হিসেবে শেখ হাসিনার বাইরে বাংলাদেশ সরকার ব্যবসা-বাণিজ্য, ভারত থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও জ্বালানি সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং গঙ্গার পানিচুক্তি নবায়নসহ নিয়মিত বিষয়গুলো তুলবে এটাই স্বাভাবিক। অন্যদিকে ভারত নিরাপত্তা ও তার অবস্থান থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ স্পর্শকাতর বিভিন্ন ইস্যু তুলবে। সর্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনায় রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে দুই দেশের এসব প্রত্যাশার বেশিরভাগ মেটানো অসম্ভব নয়।
কূটনৈতিক কয়েকটি সূত্র বলছে, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদী হত্যাকান্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের ভারত থেকে ফেরত আনা বাংলাদেশের দিক থেকে অন্যতম দাবি। রাজনৈতিক সদিচ্ছার অংশ হিসেবে ভারত সরকার বর্তমানে কলকাতার জেলে অবস্থানরত হাদী হত্যাকান্ডে অভিযুক্ত দুই ব্যক্তিকে হস্তান্তর করার সম্ভাবনা আছে।