স্তন ক্যানসার ও প্লাস্টিক সার্জারি

অধ্যাপক ডা. আইয়ুব আলী

সাবেক বিভাগীয় প্রধান, প্লাস্টিক সার্জারি বিএমইউ, ঢাকা

স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় অনেক নতুন পথ তৈরি হয়েছে। দ্রুত রোগ নির্ণয়, উন্নত সার্জারি, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, হরমোনথেরাপি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে বহু নারী স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাচ্ছেন।

তবে চিকিৎসার এই দীর্ঘযাত্রায় একটি বিষয় আড়ালে থেকে যায়।

স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় অনেক রোগীর ক্ষেত্রে স্তন অপসারণের প্রয়োজন হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় যাকে বলা হয় মাস্টেকটমি। প্রধান লক্ষ্য থাকে একটাই, ক্যানসার থেকে জীবনকে রক্ষা করা। স্তন হারানোর অভিজ্ঞতা তাই অনেক নারীর জন্য শুধু শারীরিক পরিবর্তন নয়। মানসিকভাবেও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। এখানেই আসে প্লাস্টিক সার্জারির ভূমিকা। প্লাস্টিক সার্জারি মানেই শুধু সৌন্দর্যচর্চা এই ধারণা বদলাতে হবে।

পুনর্গঠন আসলে কী : ক্যানসারের কারণে স্তনের যে অংশ বা পুরো স্তন অপসারণ করা হয়েছে, তার আকৃতি পুনরায় তৈরি করাই স্তন পুনর্গঠন। যা পরিকল্পিত ও সূক্ষ্ম চিকিৎসা প্রক্রিয়া। কারণ প্রত্যেক রোগী এক রকম নন। কারও বয়স কম। কারও বয়স বেশি। কারও শরীরের গঠন এক রকম। কারও আরেক রকম। কারও ক্যানসারের চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি প্রয়োজন হয়েছে। কারও হয়নি। কারও ক্ষেত্রে শুধু স্তনের কিছু অংশ অপসারণ করা হয়েছে। কারও ক্ষেত্রে পুরো স্তন। তাই একই পদ্ধতি সবার জন্য উপযুক্ত নয়।  কোন পদ্ধতিতে পুনর্গঠন করা হবে, তা নির্ভর করে রোগীর শারীরিক অবস্থা, ক্যানসারের ধরন ও চিকিৎসা পরিকল্পনা, পূর্বের অস্ত্রোপচার, রেডিওথেরাপি হয়েছে কিনা এবং রোগীর নিজের ইচ্ছার ওপর।

কখন করা হয় স্তন পুনর্গঠন

এখানেও রয়েছে একাধিক পথ। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে ক্যানসারের অপারেশনের সময়ই স্তন পুনর্গঠন করা সম্ভব। একে বলা হয় ইমিডিয়েট বা তাৎক্ষণিক রিকনস্ট্রাকশন। আবার অনেক রোগীর ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক পুনর্গঠন উপযুক্ত নাও হতে পারে। তখন ক্যানসারের মূল চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর কিছু সময় অপেক্ষা করে পুনর্গঠন করা হয়। এটি ডিলেইড রিকনস্ট্রাকশন।

কোনটি ভালো : রোগীভেদে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষ করে যেসব রোগীর রেডিওথেরাপি প্রয়োজন হতে পারে, তাদের ক্ষেত্রে পুনর্গঠনের সময় ও পদ্ধতি খুব সতর্কভাবে নির্ধারণ করতে হয়। তাই সিদ্ধান্তটি হওয়া উচিত সমন্বিত চিকিৎসা পরিকল্পনার অংশ। ব্রেস্ট সার্জন, প্লাস্টিক সার্জন, অনকোলজিস্ট, রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, প্রয়োজনে অন্যান্য বিশেষজ্ঞ। সবাই মিলে রোগীর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ ও উপযুক্ত পথটি ঠিক করবেন।

কী দিয়ে পুনর্গঠন করা হয় : স্তন পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে সাধারণভাবে ইমপ্ল্যান্ট ব্যবহার করা যেতে পারে। রোগীর নিজের শরীরের টিস্যু ব্যবহার করেও পুনর্গঠন করা সম্ভব। কিছু ক্ষেত্রে ইমপ্ল্যান্ট ও নিজের টিস্যুর সমন্বয়ও করা হয়। কোন পদ্ধতিটি নির্বাচন করা হবে, সেটি বাহ্যিক আকৃতির ওপর নির্ভর করে না। রোগীর শারীরিক গঠন। পূর্বের চিকিৎসা। রেডিওথেরাপির ইতিহাস। অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা। রোগীর প্রত্যাশা। সবকিছু বিবেচনায় নিতে হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রোগীকে পুরো বিষয়টি বুঝিয়ে বলতে হবে। কারণ অপারেশন শুধু চিকিৎসকের সিদ্ধান্তে নয়। রোগীর সম্মতিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।

পুনর্গঠন কি ক্যানসার ফিরিয়ে আনে : ক্যানসারের চিকিৎসা এবং পুনর্গঠন দুটি আলাদা, কিন্তু পরস্পর সম্পর্কিত চিকিৎসা পরিকল্পনার অংশ হতে পারে। তাই রোগীর ক্যানসারের অবস্থা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বুঝেই পুনর্গঠনের সময় নির্ধারণ করা হয়। এখানে তাড়াহুড়ার কোনো জায়গা নেই। জীবন রক্ষা প্রথম। তারপর জীবনকে সুন্দর ও স্বাভাবিক করে তোলার চেষ্টা। ক্যানসারের চিকিৎসা শেষ হওয়ার পর অনেকেই ভাবেন, রোগী তো সুস্থ হয়ে গেছেন। কিন্তু চিকিৎসা শেষ হলেও ভয় থেকে যেতে পারে। আবার ক্যানসার হবে কি নাÑ এই দুশ্চিন্তা থাকতে পারে। অপারেশনের দাগ চোখে পড়তে পারে। শরীরের পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লাগতে পারে। তাই ক্যানসার চিকিৎসার পর পুনর্বাসনও চিকিৎসার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রয়োজনে কাউন্সেলিং। পরিবারের সহযোগিতা। সামাজিক সমর্থন। নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ। সবকিছুর প্রয়োজন হতে পারে। আর পুনর্গঠনমূলক প্লাস্টিক সার্জারি সেই পুনর্বাসনের একটি অংশ হতে পারে। একটি অপারেশন কখনো শুধু শরীরের পরিবর্তন নয়। কখনো সেটি একজন মানুষের আত্মবিশ^াসে ফিরে আসার দরজা। তাই স্তন ক্যানসারের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই শুধু রোগের বিরুদ্ধে লড়াই নয়। এ লড়াই ভয়, লজ্জা, কুসংস্কার ও অজ্ঞতার বিরুদ্ধেও। নিজের শরীর সম্পর্কে সচেতন হোন। অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন হলে অবহেলা করবেন না। চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।