ডা. নুসরাত মাহজাবীন
ল্যাপারোস্কপিক ও হিস্টেরোস্কোপিক সার্জন
সহযোগী অধ্যাপক ও কনসালট্যান্ট, প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগ, ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হসপিটাল
একজন প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি প্রায়ই একটি বিষয় জোর দিয়ে বলি, একটি শিশুর সুস্থ জীবনের ভিত্তি তৈরি হয় মায়ের গর্ভেই। তাই গর্ভাবস্থায় মায়ের যতœ, পুষ্টি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং পরিবারের সচেতনতা শুধু মায়ের সুস্থতার জন্য নয়, ভবিষ্যৎ সন্তানের সুস্থ জন্ম নিশ্চিত করতেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতি বছর জুলাই মাসে বিশ্বজুড়ে জাতীয় ক্লেফট ও ক্র্যানিওফেসিয়াল সচেতনতা ও প্রতিরোধ মাস পালন করা হয়। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো জন্মগত ঠোঁট ও তালু কাটা এবং অন্যান্য ক্র্যানিওফেসিয়াল ত্রুটি সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং মানুষকে জানানো যে, অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক গর্ভকালীন পরিচর্যার মাধ্যমে এসব জন্মগত সমস্যার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব।
বিশ^ব্যাপী প্রতি ৭০০টি নবজাতকের মধ্যে আনুমানিক একটি শিশু ঠোঁট বা কাটা তালু নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এটি এমন একটি জন্মগত অবস্থা, যা গর্ভাবস্থার প্রথম কয়েক সপ্তাহে ভ্রƒণের মুখম-ল ও মুখগহ্বরের টিস্যু স্বাভাবিকভাবে একত্রিত না হলে সৃষ্টি হয়। অনেক ক্ষেত্রে এর পেছনে জিনগত কারণ কাজ করলেও পরিবেশগত ও মাতৃস্বাস্থ্যের বিভিন্ন বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আমাদের সমাজে এখনো অনেক পরিবার মনে করেন, গর্ভাবস্থায় কোনো সমস্যা না থাকলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বাস্তবে এই ধারণা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, নির্ধারিত সময়ে প্রসবপূর্ব পরীক্ষা সম্পন্ন করা এবং মায়ের শরীরে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি রয়েছে কি না তা মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি।
বিশেষ করে ফলিক অ্যাসিড, ভিটামিন বি১২, আয়রনসহ গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি সময়মতো শনাক্ত ও পূরণ করা প্রয়োজন। গর্ভধারণের পরিকল্পনা করার সময় থেকেই প্রতিদিন অন্তত ৪০০ মাইক্রোগ্রাম এবং গর্ভাবস্থায় ৬০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিড গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, এটি শুধু নিউরাল টিউব ডিফেক্ট নয়, মুখম-লের কিছু জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকিও কমাতে সহায়ক হতে পারে।
এ ছাড়া গর্ভাবস্থায় ধূমপান, অ্যালকোহল, মাদক গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ সেবন থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। যেসব মা ডায়াবেটিস, মৃগীরোগ বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছেন, তাদের গর্ভধারণের আগেই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোগ নিয়ন্ত্রণে আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এসব বিষয় ভ্রƒণের স্বাভাবিক বিকাশে প্রভাব ফেলতে পারে।
এখানে শুধু মায়ের নয়, পুরো পরিবারেরও দায়িত্ব রয়েছে। অনেক সময় পরিবার থেকেই গর্ভবতী মায়ের নিয়মিত চেকআপ, পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ বা ওষুধ সেবনের গুরুত্ব যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না। অথচ একটি সচেতন পরিবারই মাকে নিরাপদ গর্ভাবস্থা নিশ্চিত করতে সবচেয়ে বড় সহায়তা দিতে পারে। তাই গর্ভকালীন পরিচর্যা কেবল মায়ের একার বিষয় নয়, এটি পুরো পরিবারের একটি যৌথ দায়িত্ব।
আমার পেশাগত অভিজ্ঞতায় প্রতিদিনই বিভিন্ন উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থার রোগী দেখি। সময়মতো চিকিৎসা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে অনেক জটিল পরিস্থিতিও সফলভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়েছে। এমনকি সঠিক পরিকল্পনা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অনেক উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থায় নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসবও করানো সম্ভব হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়, নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।
যদি কোনো শিশু জন্মগতভাবে ঠোঁট বা তালু কাটা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে, তাহলে হতাশ হওয়ার কারণ নেই। বর্তমানে আধুনিক চিকিৎসার মাধ্যমে অধিকাংশ শিশুই সফল অস্ত্রোপচার, স্পিচ থেরাপি, দন্ত চিকিৎসা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমন্বিত পরিচর্যার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন দ্রুত রোগ নির্ণয় এবং যথাসময়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা শুরু করা।
ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হসপিটালে নিয়মিত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ গর্ভাবস্থার রোগীদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা প্রদান করা হয়। পাশাপাশি হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগে জন্মগত ঠোঁট ও তালু কাটা রোগীদের সফলভাবে অস্ত্রোপচার এবং পরবর্তী সমন্বিত চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। একজন প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে আমি সবসময়ই প্রত্যাশা করি, প্রতিটি মা যেন গর্ভধারণের শুরু থেকেই নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেন, প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি পরীক্ষা করেন এবং সুস্থ সন্তান জন্মদানে নিজের পাশাপাশি পরিবারেরও সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেন।
একটি সুস্থ শিশুর জন্ম কেবল ভাগ্যের বিষয় নয়, এটি সচেতনতা, নিয়মিত চিকিৎসা, সঠিক পুষ্টি এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের সমন্বিত ফল। তাই আজই সচেতন হোন, নিয়মিত প্রসবপূর্ব সেবা গ্রহণ করুন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ জীবনের ভিত্তি গড়ে তুলুন।