দাঁত মাজছেন প্লাস্টিকও কি খাচ্ছেন

ডা. সুশান্ত মজুমদার

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

যে টুথপেস্ট দিয়ে আমরা দাঁত মাজি, তার ভেতরেই লুকিয়ে থাকতে পারে অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা মাইক্রোপ্লাস্টিক। খালি চোখে দেখা না গেলেও এই কণাগুলো নিয়মিত আমাদের মুখ ও শরীরে প্রবেশ করছে। সম্প্রতি এক গবেষণায় বাজারের প্রচলিত টুথপেস্টে এই উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যা নিয়ে সাধারণ মানুষ, দাঁতের ডাক্তার ও পরিবেশবিদরা উদিগ্ন।

টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক কেন থাকে

মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণা। টুথপেস্টে এগুলো সাধারণত থাকে ‘মাইক্রোবিড’ আকারে ছোট ছোট রঙিন দানা, যেগুলো দেখতে অনেকটা এক্সফোলিয়েটিং বা ‘স্ক্রাবিং’ কণার মতো মনে হয়। এগুলো ব্যবহার করা হয় তিনটি কারণে। যেমন : দাঁতের গায়ে হালকা ঘষা (স্ক্রাবিং) দিয়ে দাগ তোলার অনুভূতি তৈরি করতে, পেস্টের গঠন ও ঘনত্ব ঠিক রাখতে এবং উৎপাদন খরচ কমায়, এর সস্তা ফিলার।

গবেষণায় বাজারের বিভিন্ন টুথপেস্টে পলিথিলিন, পলিপ্রোপিলিন, পলিভিনাইল ক্লোরাইড, নাইলন ও পলিঅ্যামাইডের মতো উপাদান পাওয়া গেছে <পরঃব রহফবী=”১-১”>, যেখানে প্রধান পলিমারগুলো ছিল সেলোফেন, পলিঅ্যামাইড, পলিভিনাইল ক্লোরাইড ও পলিপ্রোপিলিন</পরঃব>। একটি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পরীক্ষা করা টুথপেস্টের অর্ধেকের মধ্যে থাকা কণার প্রায় অর্ধেকই ছিল মাইক্রোপ্লাস্টিক, যার আকার ছিল ৩.৫ মাইক্রন থেকে ৪০০ মাইক্রন পর্যন্ত।

শরীরে কী প্রভাব ফেলে : মাইক্রোপ্লাস্টিক নিয়ে গবেষণা এখনো চলমান, তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য মোটেও নিরাপদ না। দীর্ঘদিন মাইক্রোবিডযুক্ত টুথপেস্ট ব্যবহারে মাড়ির প্রদাহ বাড়তে পারে গবেষকরা বলছেন। খাদ্যনালি ও অন্ত্রের আবরণে মাইক্রোপ্লাস্টিক প্রবেশ করে অক্সিডেটিভ ক্ষতি ও প্রদাহজনিত ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে পারে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

<পরঃব রহফবী=”৭-১”> প্লাস্টিকে ১৩,০০০-এরও বেশি রাসায়নিক থাকে, যার মধ্যে অন্তত ৩,২০০টি মানবস্বাস্থ্য বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বলে প্রমাণিত । এর মধ্যে রয়েছে ক্যানসার সৃষ্টিকারী পদার্থ, স্নায়ুর ক্ষতিকারক রাসায়নিক ও হরমোন-বিঘœকারী উপাদান</পরঃব>। <পরঃব রহফবী=”৭-১”>মানবদেহের রক্ত, প্লাসেন্টা, ফুসফুসের টিস্যু, মায়ের বুকের দুধ ও মলে মাইক্রো-ন্যানোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে</পরঃব>, যা প্রমাণ করে এই কণা শরীরের ভেতরে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি : <পরঃব রহফবী=”৩-১”>টুথপেস্টে সামান্য পরিমাণ মাইক্রোপ্লাস্টিক সরাসরি দাঁত বা মাড়ির ক্ষতি করেÑ এমন কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ এখনো নেই</পরঃব>, বিজ্ঞানীরা এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে এখনো গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। অর্থাৎ আতঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই, তবে সচেতন থাকা ও এড়িয়ে চলা উচিত।

আপনার টুথপেস্ট খারাপ না ভালো

টুথপেস্টের প্যাকেটের গায়ে থাকা উপাদান তালিকা (ওহমৎবফরবহঃং ষরংঃ) খেয়াল করলেই বোঝা যায় তাতে মাইক্রোপ্লাস্টিক আছে কিনা। নিচের নামগুলো দেখলে বুঝবেন সেটি ক্ষতিকর : চড়ষুবঃযুষবহব (চঊ), চড়ষুঢ়ৎড়ঢ়ুষবহব (চচ), চড়ষুারহুষ ঈযষড়ৎরফব (চঠঈ), ঘুষড়হ ও চড়ষুধসরফব এই উপাদানগুলোর যেকোনো একটি তালিকায় থাকলে বুঝবেন টুথপেস্টে প্লাস্টিক কণা মেশানো আছে। সাধারণত রঙিন, চকচকে ‘স্ট্রাইপ’ বা ঝলমলে দানাযুক্ত জেল-টাইপ টুথপেস্টে এই উপাদান বেশি পাওয়া যায়, বিশেষ করে যেগুলো ‘হোয়াইটেনিং’ বা বেশি চকচকে দেখানোর দাবি করে।

কোন টুথপেস্ট ভালো : ভালো টুথপেস্ট বাছাইয়ের সময় শুধু ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক নেই’ দেখলেই চলবে না। দাঁতের প্রকৃত সুরক্ষার দিকটাও দেখতে হবে। দন্তচিকিৎসকদের মতে, ভালো টুথপেস্টে থাকা উচিত : ফ্লোরাইড দাঁতের ক্ষয় (পধারঃ) রোধে এখনো সবচেয়ে কার্যকর ও প্রমাণিত উপাদান। <পরঃব রহফবী=”৩-১”>‘প্রাকৃতিক’ বা মাইক্রোপ্লাস্টিক-মুক্ত বলে বাজারজাত করা কিছু বিকল্প টুথপেস্টে ফ্লোরাইড না থাকতে পারে। যা দাঁতের ক্ষয় ঠেকানোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান</পরঃব> Ñ তাই শুধু ‘ন্যাচারাল’ লেখা দেখে কিনবেন না, ফ্লোরাইড আছে কিনা যাচাই করুন। মাইক্রোবিড বা প্লাস্টিক-জাতীয় স্ক্রাবিং এজেন্টের বদলে সিলিকা বা ক্যালসিয়াম কার্বনেট-ভিত্তিক প্রাকৃতিক অ্যাব্রেসিভ থাকা পেস্ট। প্রয়োজনে দাঁতের ডাক্তারের পরামর্শ নিন। বিশেষত সংবেদনশীল দাঁত, মাড়ির সমস্যা বা শিশুদের জন্য আলাদা ধরনের টুথপেস্ট দরকার হতে পারে।

দাঁত মাজার সঠিক নিয়ম : শুধু ভালো পেস্ট হলেই হবে না, মাজার পদ্ধতিও ঠিক না হলে দাঁত ও মাড়ি দুটোরই ক্ষতি হয়।

দিনে কতবার : সকালে নাশতার পর এবং রাতে ঘুমানোর আগে দাঁত মাজা উচিত। রাতে দাঁত মাজা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ঘুমের সময় মুখে লালার প্রবাহ কমে যায় বলে ব্যাকটেরিয়া বেশি সক্রিয় থাকে।

কতক্ষণ মাজবেন : প্রতিবার অন্তত ২ মিনিট। মুখকে চারটি ভাগে (উপরের ডান-বাম, নিচের ডান-বাম) কল্পনা করে প্রতিটি অংশে অন্তত ৩০ সেকেন্ড সময় দিন।

কীভাবে মাজবেন : নরম ব্রিসলের টুথব্রাশ ব্যবহার করুন। শক্ত ব্রাশ মাড়ি ও দাঁতের এনামেল ক্ষয় করে। ব্রাশটি মাড়ির সঙ্গে ৪৫ ডিগ্রি কোণে ধরুন। জোরে ঘষার বদলে ছোট ছোট বৃত্তাকার ভঙ্গিতে ব্রাশ করুন। দাঁতের বাইরের পাশ, ভেতরের পাশ ও চিবানোর  তল তিন দিকই মাজুন। জিভও আলতোভাবে পরিষ্কার করুন, কারণ এখানে ব্যাকটেরিয়া জমে দুর্গন্ধ হয়। মাজার পর পেস্ট থুতু ফেলে দিন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কুলি করে মুখ পুরোপুরি ধুয়ে ফেলবেন না।  ফ্লোরাইড দাঁতে কাজ করার সময় দিন।

এড়িয়ে চলুন : টুথব্রাশ দিয়ে জোরে ঘষে দাঁত মাজা যাবে না।  খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্রাশ করা, বিশেষত টক বা অ্যাসিডযুক্ত খাবারের পর (৩০ মিনিট অপেক্ষা করুন)। ৩-৪ মাস পরপর ব্রাশ বদলানো উচিত।

কেনার আগে : প্যাকেটের উপাদান তালিকায় চড়ষুবঃযুষবহব, চড়ষুঢ়ৎড়ঢ়ুষবহব, চঠঈ, ঘুষড়হ আছে কিনা দেখুন। ফ্লোরাইডযুক্ত, সিলিকা-ভিত্তিক টুথপেস্ট বেছে নিন।