জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধা

ধ্রুবতারা হয়েই জ্বলে আছেন আইয়ুব বাচ্চু

সুখ, ফেরারী মন, এক আকাশের তারা, ধ্রুবতারা, মন চাইলে মন পাবে, এখন অনেক রাত, নীল সাগরে, অচেনা জীবন, কষ্টসহ অসংখ্য জনপ্রিয় গানের স্রষ্টা আইয়ুব বাচ্চু। বালাদেশের ব্যান্ডসংগীতের শিরোমণি এই রকস্টারকে ব্যান্ড সংগীতের উজ্জ্বল নক্ষত্রও বলা হয়। তিনি দেশসেরা গিটারিস্টও ছিলেন। রক ব্যান্ড এলআরবির গায়ক ও গিটারবাদক হিসেবে পুরো বিশ্বে জনপ্রিয়তা লাভ করেছিলেন তিনি। 

বাংলাদেশের ব্যান্ডসংগীতের অন্যতম দিকপাল, গিটার জাদুকর, এলআরবি’র প্রতিষ্ঠাতা এই রকস্টারের জন্মদিন আজ। ১৯৬২ সালের ১৫ আগস্ট চট্টগ্রাম শহরের এনায়েত বাজারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আইয়ুব বাচ্চৃর ২০টি কালজয়ী গান নতুন সংগীতায়োজনে প্রকাশ পাচ্ছে। ‘উত্তরাধিকার’ নামে বিশেষ অ্যালবামে দেশের ৮টি উদীয়মান ব্যান্ড ও ১২ জন একক শিল্পী গেয়েছেন গানগুলো। অ্যালবামটি ডাবল সিডির পাশাপাশি বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ হবে বলে জানা গেছে। তবে ‘উত্তরাধিকার’ শুধু স্মরণ আয়োজন নয়। অ্যালবাম বিক্রি থেকে পাওয়া পুরো অর্থ ব্যয় করা হবে বহুল প্রতীক্ষিত ‘আইয়ুব বাচ্চু মিউজিয়াম’ নির্মাণের তহবিলে। প্রকল্পের সমন্বয়ক চিশতি ইকবাল জানান, আইয়ুব বাচ্চুর জন্মদিনে বিশেষ কিছু করার ভাবনা থেকেই ২০টি গান নতুন করে প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের ছেলে হয়েও গানকে পেশা হিসেবে বেছে নেন বাচ্চু। বিষয়টি পরিবারের কেউ মেনে না নিলেও ১৯৭৩ সালে আইয়ুব বাচ্চুর বাবা তাকে তার ১১তম জন্মদিনে একটি গিটার উপহার দেন। কৈশোর বয়স থেকেই চট্টগ্রামের ব্যান্ড সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। তার কৈশোর জীবনের শুরুর দিকে সে বিভিন্ন ব্রিটিশ এবং আমেরিকান রক ব্যান্ডের গান শোনা শুরু করেন। যেমন- তৎকালীন সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় রক ব্যান্ড লেড জেপলিন, ডিপ পার্পল, কুইন, দ্য জিমি হেনড্রিক্স এক্সপেরিয়েন্স ইত্যাদি। 

ব্যান্ড দলের দিকপাল জ্যাকব ডায়াসকে এই সংগীতের পথিকৃৎ বলা হয়। আইয়ুব বাচ্চুসহ আজকের জনপ্রিয় শিল্পীদের অনেকেই জ্যাকব ডায়াসের হাতে গড়া। শেফালি ঘোষ, শ্যামসুন্দর বৈষ্ণব, শাক্যমিত্র বড়ুয়া, প্রবাল চৌধুরী, তপন চৌধুরী, নকীব খান, কুমার বিশ্বজিৎ, জেমস, আবদুল মান্নান রানা, সৈকত দাশ, নোয়েল ডি সিলভা, সাইফুদ্দিন মাহমুদ খান, পার্থ বড়ুয়াসহ অনেকেই পেয়েছেন তার সাহচর্য। 

বলা হয়ে থাকে, চট্টগ্রামে এমন কোনো ব্যান্ড নেই, যেখানে জ্যাকবের শিষ্য নেই। সেই শিষ্যদের মধ্যে আইয়ুব বাচ্চু যেন জনপ্রিয়তায় সবাইকে ছাড়িয়ে গেলেন। স্বাধীনতার পরে নকীব খানের ‘সোলস’ এ দেশের ব্যান্ড মিউজিকের জগতে একটা বিপ্লবের সৃষ্টি করে। আইয়ুব বাচ্চু ও নাসিম আলী খান সোলস ব্যান্ডে যোগ দেওয়ার পর ইংরেজি গান পরিবেশনায় একটা আমূল পরিবর্তন আসে। আইয়ুব বাচ্চু এমন নতুন নতুন গান কম্পোজ করেছিলেন যা এখনো ‘সোলস’ ভক্তদের আপ্লুত করে। পরবর্তীতে এই সোলসের সদস্যরাই বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে নতুন নতুন ব্যান্ড গড়ে তোলেন। 

সোলস ছেড়ে নকীব খান তৈরি করেন ‘রেনেসাঁ’। আর আইয়ুব বাচ্চু ‘এলআরবি’। যারা চট্টগ্রামে প্রথম ব্যান্ডসংগীত মাতিয়েছিলেন পরে সারা দেশ পেরিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ মাতিয়েছেন, তাদের মধ্যে রয়েছেন- কুমার বিশ্বজিৎ, তপন চৌধুরী, আইয়ুব বাচ্চু, জেমস অন্যতম। কিন্তু আইয়ুব বাচ্চু ব্যান্ডসংগীতের মঞ্চে এমন একটা প্রাণচাঞ্চল্য এনেছিলেন, যা এখন অনুপস্থিত। তার অবর্তমানে সেই প্রাণটুকুও যেন বাচ্চুর মহাপ্রয়াণের মধ্যদিয়ে চলে গেছে বলা চলে। মাত্র ৫৬ বছর বয়সে ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ব্যান্ড সংগীতের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র। রুপালি গিটার ফেলে চলে গেছেন, কিন্তু আজও তিনি প্রাণবন্ত হয়ে আছেন ভক্তদের হৃদয়ে।