গাজায় প্রতি রাতে অন্তত ৪০ ফিলিস্তিনিকে হত্যার আহ্বান ইসরায়েলি মন্ত্রীর

ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির বলেছেন, গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর প্রতি রাতে ৩০ থেকে ৪০ জনকে হত্যা করা উচিত। শুধু ওই মুহূর্তে সরাসরি হুমকি হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের নয়, আরও বিস্তৃতভাবে লক্ষ্যবস্তু হত্যার পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন তিনি।

রবিবার (১৬ আগস্ট) প্রকাশ্যে আসা একটি পডকাস্টের পর্বে এসব মন্তব্য করেন বেন-গভির। ইসরায়েলের সাবেক বন্দী রোম ব্রাসলাভস্কির সঙ্গে ওই আলোচনার ভিডিও ও বক্তব্য ফিলিস্তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

বেন-গভির বলেন, গাজায় এমন মানুষও রয়েছেন, যারা তার ভাষায় ‘বেঁচে থাকার যোগ্য নন’। তিনি তাদের মানুষ হিসেবেও স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানান এবং ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে হত্যাকাণ্ড চালানোর আহ্বান জানান।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য বেন-গভির দেশটির পুলিশ ও কারা পরিষেবার দায়িত্বে রয়েছেন। তবে সামরিক বাহিনীকে সরাসরি হামলার নির্দেশ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা তার নেই। তিনি অবশ্য ইসরায়েলের নিরাপত্তাবিষয়ক মন্ত্রিসভায় রয়েছেন, যেখানে যুদ্ধ ও নিরাপত্তানীতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

গাজায় চলমান বর্তমান ‘যুদ্ধবিরতি’র মধ্যে সামরিক হামলা কমানোর নেতানিয়াহুর সিদ্ধান্তেরও বিরোধিতা করেছেন বেন-গভির। তার মতে, গাজায় আবারও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড চালানো উচিত এবং তা শুধু ওই মুহূর্তে সক্রিয় হুমকি হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়।

আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে দেশটির রাজনীতিতে কট্টর ডানপন্থীদের প্রভাব বাড়ার মধ্যেই বেন-গভিরের এমন বক্তব্য সামনে এলো।

আলোচনায় ফিলিস্তিনি বন্দীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়েও কথা বলেন বেন-গভির। ইসরায়েলে সম্প্রতি সামরিক আদালতে ইসরায়েলিদের হত্যার মতো গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ফিলিস্তিনিদের জন্য মৃত্যুদণ্ডের আইন কার্যকর হয়েছে।

ব্রাসলাভস্কি বেন-গভিরকে বলেন, তিনি যেন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সুযোগ তাকে দেন। তিনি দড়ি ব্যবহার না করে বন্দুকের একটি বোতাম চাপার মাধ্যমে নিজের হাতে ‘প্রতিটি সন্ত্রাসীকে’ হত্যা করার ইচ্ছার কথাও জানান।

জবাবে বেন-গভির বলেন, ব্রাসলাভস্কির এই ইচ্ছা পূরণ করতে তিনি ‘বিশ্ব ওলটপালট’ করে দেবেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য সবকিছু করার প্রতিশ্রুতি দেন।

আলোচনায় গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের স্থায়ীভাবে চলে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করার পক্ষেও কথা বলেন বেন-গভির। একই সঙ্গে গাজায় নতুন করে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের কথাও বলেন তিনি। গাজা পুরোপুরি ইসরায়েলের বলে মনে করেন—এমন অবস্থান তিনি এর আগেও একাধিকবার প্রকাশ করেছেন।

আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের এভাবে ব্যাপকভাবে, জোরপূর্বক বা পরিকল্পিতভাবে গাজা থেকে সরিয়ে দেওয়া হলে তা জাতিগত নিধনের শামিল হতে পারে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে কার্যকর হওয়া কথিত ‘যুদ্ধবিরতি’র পরও ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ১ হাজার ২৫০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

বেন-গভিরের সর্বশেষ বক্তব্য তার দীর্ঘদিনের কট্টর অবস্থানেরই ধারাবাহিকতা। কিশোর বয়সে তিনি নিষিদ্ধ ঘোষিত কাহানিস্ট জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

মন্ত্রী হওয়ার পর ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী হামলায় দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের জন্য মৃত্যুদণ্ডকে নিয়মিত শাস্তি হিসেবে চালুর পক্ষে সক্রিয়ভাবে প্রচার চালিয়েছেন তিনি। ইসরায়েলের কারাগারে আটক ফিলিস্তিনি বন্দীদের পরিস্থিতি ইচ্ছাকৃতভাবে আরও কঠোর করার বিষয়েও অতীতে গর্ব প্রকাশ করেছেন।

বেন-গভিরের এসব কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি দেশ তার ওপর নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপ তার কর্মকাণ্ডে এখন পর্যন্ত বড় কোনো প্রভাব ফেলেনি।

সূত্র: আলজাজিরা