শেষ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সমঝোতা 

তবে কি ফের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মুখে মধ্যপ্রাচ্য?

সমঝোতার মেয়াদ শেষ হলেও নতুন করে আলোচনায় বসতে এখনো রাজি নয় ইরান।

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৩৫ এএম

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে করা সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ সোমবার (১৭ আগস্ট) শেষ হচ্ছে। তবে এর মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়ে দুই পক্ষের কোনো আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না। বরং চুক্তি সই হওয়ার পর থেকেই একে অপরের বিরুদ্ধে সমঝোতার শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ করে আসছে দেশ দুটি।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শনিবার (১৫ আগস্ট) টেলিগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা শুরু করার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি তেহরান।

এদিকে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীরা ইরানের সঙ্গে বার্তা আদান-প্রদান অব্যাহত রেখেছেন। আরাগচি জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে নতুন নৌপথ তৈরির বিষয়ে ওমানের সঙ্গে আলাদা একটি চুক্তি নিয়ে কাজ করছে ইরান। তবে রাজনৈতিক সমাধান না হলে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্ভব নয় বলেও তিনি স্পষ্ট করেছেন।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শুক্রবার (১৪ আগস্ট) নিউইয়র্কে সমর্থকদের বলেছেন, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথ খুব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা দিতে পারে।

গত ১৭ জুন ট্রাম্প ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সমঝোতা স্মারকটিতে সই করেন। পাকিস্তানের আয়োজনে অনুষ্ঠিত বিরল উচ্চপর্যায়ের আলোচনার পর এই সমঝোতা হয়।

এর লক্ষ্য ছিল ৩ মাসের বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটানো। ওই যুদ্ধে হাজারো মানুষ নিহত হয় এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক চলাচল মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস রপ্তানি এতে বড় ধরনের সমস্যায় পড়ে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির মতো জটিল বিষয়গুলো পরবর্তী সময়ে আলোচনার জন্য রেখে তাৎক্ষণিকভাবে যুদ্ধ বন্ধের কূটনৈতিক সমাধান খোঁজার চেষ্টা করা হয়। একই সঙ্গে লেবাননের সংঘাতের অবসানের পথও খোঁজার কথা ছিল।

সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সামরিক অভিযান অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে বন্ধ করার ঘোষণা দেয়। পাশাপাশি একটি ‘চূড়ান্ত চুক্তির’ মাধ্যমে সব ফ্রন্টে যুদ্ধ স্থায়ীভাবে শেষ করার কথা বলা হয়। ওই চূড়ান্ত চুক্তি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে অনুমোদিত হওয়ার কথা ছিল এবং সর্বোচ্চ ৬০ দিনের মধ্যে তা সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে দুই পক্ষের সম্মতিতে সময়সীমা বাড়ানোর সুযোগও রাখা হয়েছিল।

সমঝোতা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রকে ৩০ দিনের মধ্যে ইরানের ওপর নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার কথা ছিল। চূড়ান্ত চুক্তি হওয়ার পর ইরানের কাছাকাছি অবস্থান করা মার্কিন বাহিনী সরিয়ে নেওয়া এবং ইরানের পুনর্গঠন ও উন্নয়নে অন্তত ৩০০ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজ নিয়ে কাজ শুরুর কথা ছিল।

এ ছাড়া ওয়াশিংটন ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানের তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানি অর্থ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল।

অন্যদিকে ইরানের দায়িত্ব ছিল হরমুজ প্রণালি থেকে মাইন অপসারণ করা এবং ৬০ দিনের জন্য কোনো ধরনের শুল্ক ছাড়াই জাহাজ চলাচলের সুযোগ দেওয়া।

তেহরান আরও একবার নিশ্চিত করেছিল যে তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির চেষ্টা করবে না। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়েও আলোচনায় বসার কথা ছিল। এসব বিষয়ের বিস্তারিত জাতিসংঘের সমর্থন পাওয়া চূড়ান্ত চুক্তিতে নির্ধারণ করার কথা ছিল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রকাশ করা সমঝোতার ভাষ্যে কিছু পার্থক্য থাকলেও পরবর্তী বিরোধের বড় অংশ ছিল আরও মৌলিক বিষয় নিয়ে। এটি আদৌ যুদ্ধবিরতি, নাকি দীর্ঘমেয়াদি কোনো চুক্তি, আর কোন পক্ষকে ঠিক কী করতে হবে- এসব নিয়েই মতবিরোধ তৈরি হয়।

সমঝোতাটি পুরোপুরি কার্যকর আছে কি না, তা নিয়েও দ্রুত বিতর্ক শুরু হয়। ২৭ জুন ট্রাম্প ওই অঞ্চলে ইরানের হামলাকে সমঝোতার ‘বোকামিপূর্ণ লঙ্ঘন’ বলে মন্তব্য করেন। পাল্টা ইরান দাবি করে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা সমঝোতা স্মারকের প্রথম ধারার লঙ্ঘন।

৭ জুলাই ট্রাম্প ঘোষণা করেন, সমঝোতা ‘শেষ’। এরপরও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালিয়ে যায়। তেহরান যেসব স্থাপনাকে বেসামরিক অবকাঠামো বলে দাবি করেছে, সেগুলোতেও হামলা হয়। এসব হামলায় অন্তত ৫০ জন নিহত হন।

ইরানি কর্মকর্তারা তখন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের সব প্রতিশ্রুতি ‘লঙ্ঘন ও স্থগিত’ করেছে। একই সঙ্গে তেহরানও নিজেদের প্রতিশ্রুতি স্থগিত করেছে বলে জানায়।

এরপর যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার করেনি। এমনকি ইরানের পুনর্গঠনে অর্থ দেওয়ার বিষয়টিকেও ট্রাম্প উপহাস করেছেন। বরং তিনি দাবি করেছেন, ইরানকে গত ৫০ বছরে নিহত বিক্ষোভকারীদের পরিবার এবং ইরানের সড়কপথে পেতে রাখা বোমা ও বিভিন্ন সংঘাতে নিহত ও গুরুতর আহত ব্যক্তিদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

হরমুজ প্রণালিও এখন পর্যন্ত পুনরায় পুরোপুরি খুলে দেওয়া হয়নি। বরং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র উভয় পক্ষই এখনো দাবি করছে, প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে।

চলতি সপ্তাহের শুরুতে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর জানায়, হরমুজ প্রণালিতে পানামার পতাকাবাহী একটি পণ্যবাহী জাহাজে তারা গুলি চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, জাহাজটি ইরানের বিরুদ্ধে তাদের নৌ অবরোধ লঙ্ঘন করেছিল।

তেহরানের ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেসের অধ্যাপক মোস্তফা খোশচেশম আল জাজিরাকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতার শর্ত মেনে না চলায় যুদ্ধবিরতি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে এবং সমঝোতাটিও অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান মনে করছে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের আটকে থাকা সম্পদ ছাড়েনি, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেনি, নৌ অবরোধ তুলে নেয়নি এবং ইসরায়েলকে দক্ষিণ লেবানন থেকে সরানোর প্রতিশ্রুতিও পূরণ করেনি। এখন কাগজে-কলমে সমঝোতার সময়সীমা শেষ হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সোমবার সমঝোতার মেয়াদ শেষ হলেও এর প্রকৃত অর্থ কী হবে, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অবস্থান এক নয়।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি শুক্রবার বলেন, ইসলামাবাদে হওয়া সমঝোতার লক্ষ্য ছিল ‘যুদ্ধের অবসান’, কোনো যুদ্ধবিরতি নয়। ইরানি স্টুডেন্টস নিউজ এজেন্সিকে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা লঙ্ঘন করে হামলা চালিয়ে যাওয়ায় ৬০ দিনের কোনো যুদ্ধবিরতিই কার্যকর ছিল না যে সেটির মেয়াদ বাড়াতে হবে।

এদিকে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোয় সাম্প্রতিক রদবদল ভবিষ্যৎ আলোচনায় তেহরানের আরও কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে ইরান ছাড় দিতে কম আগ্রহী হতে পারে।

চলতি মাসের শুরুতে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সাবেক প্রধান মোহসেন রেজাইকে দেশটির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নতুন প্রধান করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে আরও ভালো সমন্বয় তৈরির লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

খোশচেশমের মতে, রেজাইয়ের নিয়োগসহ সাম্প্রতিক নেতৃত্ব পরিবর্তনগুলো দেখাচ্ছে যে ইরান মনে করছে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের অবস্থান শক্তিশালী।

নতুন করে আলোচনা শুরু হলে ইরান আরও বেশি দাবি নিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে পারে বলেও তিনি মনে করেন। এসব দাবির মধ্যে গাজায় যুদ্ধের অবসান, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইয়েমেনের ওপর অবরোধ তুলে নেওয়া এবং এমনকি ইসরায়েলের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের দাবিও থাকতে পারে।

অন্যদিকে হরমুজ প্রণালি ও অর্থনৈতিক চাপের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন আরও কঠোর বক্তব্য দিচ্ছে।

শুক্রবার ট্রাম্প ঘোষণা করেন, যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে হরমুজ প্রণালিকে নিজেদের ভূখণ্ড হিসেবে দাবি করার পরিকল্পনা করছে।

তিনি বলেন, ইরানকে পরাজিত করার পর খুব শিগগিরই তিনি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করবেন।

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও শুক্রবার বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে এমন কিছু ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।

তবে ওয়াশিংটনের হাতে তেহরানের ওপর আরও চাপ তৈরির সুযোগ খুব বেশি নেই বলে মনে করেন ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক স্টিমসন সেন্টারের বিশিষ্ট ফেলো বারবারা স্লাভিন।

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর মজুত ক্ষেপণাস্ত্র কমে গেছে, দেশটির কৌশলগত তেল মজুতও ফুরিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে বিমানবাহী রণতরিসহ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সরঞ্জাম পরিকল্পিত সময়ের চেয়ে কয়েক মাস বেশি সমুদ্রে মোতায়েন রাখা হয়েছে। ফলে নতুন করে সামরিক চাপ তৈরির সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।

অর্থনৈতিক চাপের ক্ষেত্রেও ইরান পাল্টা ক্ষতি করতে পারে বলে মনে করেন স্লাভিন। তার মতে, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত করে তেহরান নিজেও বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।

স্লাভিন বলেন, জুনে সই হওয়া সমঝোতা ট্রাম্প প্রশাসন নিজেদের প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি বলে মনে করে ইরান ক্ষুব্ধ। তাই তারা আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এবং ট্রাম্প—দুই পক্ষের ওপরই চাপ তৈরি করছে।

তার ধারণা, শেষ পর্যন্ত ইরান যুদ্ধের জন্য ক্ষতিপূরণ পেতে পারে এবং হরমুজ প্রণালির ওপর বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ অর্জন করতে পারে। তাঁর মতে, এই সংঘাতের সমাধান শেষ পর্যন্ত একটি চুক্তির মাধ্যমেই হতে পারে, সম্ভবত যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর। তখন নির্বাচনে এর প্রভাবও তুলনামূলক কম থাকবে।

এদিকে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ গালিবাফ শনিবার তেহরানে সাংবাদিকদের বলেন, সমঝোতা স্মারকের মাধ্যমে ইরান যে ছাড়গুলো আদায় করেছে, তা তাদের জন্য গর্ব ও বিজয়ের বিষয়।

তিনি বলেন, সামরিক ও রাজনৈতিক-উভয় দিক থেকেই ইরান এই যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছে বলে তিনি পুরোপুরি বিশ্বাস করেন।

সূত্র: আলজাজিরা

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত